ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

অতীতের ভুল শুধরে ফিরে আসুক স্বস্তির ঈদযাত্রা

আমানুর রহমান
অতীতের ভুল শুধরে ফিরে আসুক স্বস্তির ঈদযাত্রা

বাঙালির জীবনে ঈদ মানেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। আর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে শেকড়ের টানে ছুটে চলা আমাদের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু গভীর পরিতাপের বিষয় হলো, উৎসবের এই আনন্দঘন যাত্রার সঙ্গে প্রায়ই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে চরম অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির চিত্র। সদ্য সমাপ্ত ঈদুল ফিতরের যাত্রায় দেশবাসী যে সীমাহীন অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তির শিকার হয়েছে এবং প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষকে যে অবর্ণনীয় দুর্গতি পোহাতে হয়েছে, তা যেন এক অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। গত ঈদে ফিরে আসা পুরোনো নৈরাজ্য, প্রাণহানি ও চরম অব্যবস্থাপনার স্মৃতি মানুষের মন থেকে এখনও মুছে যায়নি। সামনেই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। কোরবানির পশু পরিবহন এবং মহাসড়কের আশপাশে বসা পশুর হাটের কারণে এবারের ঈদযাত্রায় সড়কের পরিস্থিতি আরও বেশি জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই গত ঈদের সেই দুঃসহ অবস্থার পুনরাবৃত্তি যেন আসন্ন কোরবানির ঈদে না ঘটে, সে জন্য এখনই গতবারের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রশাসনকে অত্যন্ত কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বিগত ঈদে আমরা অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে দেখেছি, পরিকল্পনার যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে মানুষের বাড়ি ফেরা কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বিশেষ করে, এ বছর ১৮ মার্চ থেকে পোশাক কারখানাগুলোতে একসঙ্গে ছুটি শুরু হওয়ার ফলে এবং একই সঙ্গে আকস্মিক ঝড়-বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছিল চন্দ্রা ও যমুনা সেতু হয়ে উত্তরবঙ্গগামী মহাসড়কে, যেখানে তৈরি হয়েছিল মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট এবং তা ১৯ মার্চ চরম আকার ধারণ করেছিল। ঈদুল আজহায় পশুবাহী ট্রাকের কারণে এই যানজট আরও ভয়াবহ হতে পারে। এই পরিস্থিতি এড়াতে পোশাক কারখানা ও অন্যান্য বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ছুটি ধাপে ধাপে নির্ধারণ করা এখন সময়ের অন্যতম দাবি। পাশাপাশি মহাসড়কে যানজট ও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে ২০২৫ সালের সেই সফল মডেলটি অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে ঈদের আগে ও পরে কয়েক দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, সার ও জ্বালানিবাহী গাড়ি ছাড়া সব ধরনের ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল।

যোগাযোগব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা গত ঈদে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল, যা আসন্ন ঈদুল আজহায় কোনোভাবেই কাম্য নয়। গত ঈদে নির্ধারিত সময়ে বাস না আসায় এবং বাসে উঠতে ব্যর্থ হয়ে অনেক মানুষ চরম ঝুঁকি নিয়ে খোলা ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে চড়ে বাড়ির পথে রওনা দিতে বাধ্য হয়েছিল, যা মানবিকতার চরম অবক্ষয় এবং পরিবহন ব্যবস্থাপনার চূড়ান্ত ব্যর্থতার প্রমাণ। তা ছাড়া, সড়কপথে একাধিক বাস দুর্ঘটনা ছাড়াও রাজধানীর সদরঘাটে লঞ্চের ভয়াবহ সংঘর্ষে দুজনের মৃত্যু এবং বগুড়ার আদমদীঘিতে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত হয়ে অনেক যাত্রী আহত হওয়ার ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আমাদের যোগাযোগব্যবস্থায় কতটা অবহেলা রয়েছে। তাই আসন্ন ঈদুল আজহায় মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি যানবাহনের ফিটনেস সঠিকভাবে যাচাই করা এবং নৌপথ ও রেলপথে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

ঈদযাত্রায় ঘরমুখী সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা হলো ট্রেন। কিন্তু গত ঈদুল ফিতরে রেল ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনা দৃশ্যমান হয়েছে। অথচ এর ঠিক এক বছর আগে, ২০২৫ সালে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রতিটি ট্রেন নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়েছিল, যা ছিল বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এক স্বস্তিদায়ক ঘটনা। সেবার যাত্রীদের বিপুল চাপ সামলাতে পাঁচ জোড়া ‘ঈদ স্পেশাল’ ট্রেনের পাশাপাশি আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে ৪৪টি নতুন কোচ যুক্ত করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, টিকিট ছাড়া প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ ঠেকাতে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছিল। আসন্ন ঈদুল আজহায় রেলের সেই হারানো শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সিসিটিভি ক্যামেরার সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং পর্যাপ্ত পুলিশি পাহারায় স্টেশনগুলোতে সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

গত ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বড় ও প্রকট নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে, যা সাধারণ যাত্রীদের চরম অর্থনৈতিক শোষণের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, পরিবহন সিন্ডিকেটগুলো যাত্রীদের জিম্মি করে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা বাড়তি ভাড়া হাতিয়ে নিয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, যা গত ২০ বছরের সব রেকর্ড ভঙ্গ করার মতো ঘটনা। আসন্ন ঈদুল আজহায় এই লাগামহীন চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য যেকোনো মূল্যে বন্ধ করা একান্ত প্রয়োজন। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি, ট্রেনের পাশাপাশি বাসের টিকিট অনলাইনে সহজলভ্য থাকায় এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকায় টিকিট কালোবাজারি বা বাড়তি ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ পরিবহন মালিকেরা পাননি। প্রযুক্তি ও সদিচ্ছার সমন্বয়ে সাধারণ মানুষের পকেট রক্ষার সেই ব্যবস্থাটি এবারও ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।

পরিবহন মালিকদের সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি না থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র যদি সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে প্রত্যেক ঈদযাত্রাকেই নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করা সম্ভব। বর্তমান সরকারকে জনদুর্ভোগ লাঘবে আরও অনেক বেশি তৎপর ও দূরদর্শী হতে হবে। উৎসবের সময় লাখো মানুষের জীবনের ঝুঁকি, পথে পথে অন্তহীন ভোগান্তি এবং অর্থনৈতিক শোষণ কোনোভাবেই একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের উদাহরণ হতে পারে না। ভবিষ্যৎ ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই আগের সফল ব্যবস্থাপনাগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে পরিবহন সিন্ডিকেটের নৈরাজ্য কঠোর হস্তে দমন করবে এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে বলে আমরা আশা করি। তবেই সাধারণ মানুষের আসন্ন ঈদুল আজহার যাত্রা হয়ে উঠবে সত্যিকার অর্থেই আনন্দদায়ক ও নিরাপদ।

আমানুর রহমান

শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত