প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
মোস্তফা সেলিম (ছদ্মনাম)। লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ বাজারের পূর্ব দিকের খোয়া মিয়া কান্দির বাসিন্দা। নতুন কাজ শুরু হওয়া চার লেন সড়কের দক্ষিণ পাশের খানিক দূরত্বেই তার ঝুপড়ি ঘর। পেশায় রাজমিস্ত্রি মোস্তফার সংসারে স্ত্রীসহ সদস্য সংখ্যা চারজন। এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক লোকটির স্ত্রীর নাম বেনু খাতুন। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে কোনো মতে চলে তার সংসার। টানাপোড়েনের এ সময়ে সম্প্রতি গভীর নলকূপ থেকে পানি তুলতে গিয়ে মাথায় আঘাত পান লোকটির সহধর্মিণী বেনু খাতুন। দিনভর কাজে থাকায় এ বিষয়ে মোস্তফাকে কিছুই জানাননি বেনু। রাতে বাসায় ফিরলে স্বামী নিজেই আঁচ করেন কিছুটা। দুর্ঘটনার বিষয়ে পুরোপুরি জানায় দুই ছেলে মেয়ে। এরপর চন্দ্রগঞ্জ থেকে ওষুধ আনতে সাইকেলযোগে বেরিয়ে পড়েন শ্রমজীবী মানুষটি। স্ত্রীর জন্য হাফ কেজি আঙুর আর ওষুধ নিয়ে ফেরার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন মোস্তফাও।
রাতের আঁধারে রাস্তার মাঝে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে ধাক্কা লেগে দুমড়ে মুচড়ে যায় তার বছর দশ পুরোনো শখের সাইকেলটি। মাথা, চোয়াল আর হাঁটুতে আঘাত পান তিনি। রক্তক্ষরণ শুরু হলে স্থানীয় পথচারীরা তাকে নিয়ে যান চন্দ্রগঞ্জ বাজারের সেই ফার্মেসিতে যেখান থেকে তিনি প্রিয়তমা স্ত্রীর জন্য ওষুধ কিনেছিলেন।
রাস্তায় পড়ে থাকা আঙুরের পোটলা আর ওষুধগুলোর হদিস মেলেনি। সড়কবাতি না থাকায় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় নয় দিন কাজে যেতে পারেননি তিনি। এমন মর্মান্তিক ঘটনা বাস্তবেও ঘটছে চন্দ্রগঞ্জ হয়ে জেলা শহর পর্যন্ত সংস্কার চলমান এ সড়কে। স্বপ্নের এ সড়ক এখনও স্বস্তির সড়ক হয়ে ওঠেনি বরং নির্মাণের মাঝেই এতে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থেকে জেলার পৌর বাস টার্মিনাল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণ কাজ চলছে। ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কের মাঝে রয়েছে অসংখ্য বৈদ্যুতিক খাম্বা। এতে হরহামেশা ঘটছে দুর্ঘটনা, পাশাপাশি বাড়ছে সড়কে যাতায়াতের ঝুঁকি। সড়কের পাশে ও মাঝে থাকা অন্তত শতাধিক বৈদ্যুতিক খুঁটি বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে। নিয়মিত কাজ চললেও খুঁটিগুলো এখনও সরানো হয়নি। যার দরুন অনেক স্থানে খুঁটি রেখেই পিচ ঢালাই ও নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে তাহের ব্রাদার্স ও এম এইচ রহমান নামের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
নতুন কাজে রাস্তা ক্রমেই সুন্দর হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেই বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরোনো বৈদ্যুতিক খাম্বা। এতে যানবাহন চলতে হচ্ছে খাম্বাকে অতি সতর্ক অবস্থায় পাশ কাটিয়ে। একটি সড়ক সংস্কারের আগে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে নেই সেই সমন্বয়ের দেখা।
বৈদ্যুতিক খাম্বাগুলো হয়তো ছোট সমস্যা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা, কিন্তু এটি যদি সরকারি উন্নয়নকাজে সমন্বয়হীনতার প্রতীক হয়, তাহলে বিষয়টি কোনো ভাবেই ছোট থাকে না। সড়ক নির্মাণের শুরুতেই ড্রেন, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ- এমন কাজের একটির সঙ্গে আরেকটির সমন্বয় না থাকলে একই জায়গায় বারবার খোঁড়াখুঁড়ি হয়। এতে সময়, অর্থ এবং জনভোগান্তি তিনটিই বাড়ে। এমন দশায় প্রশ্ন জাগে, জনগণের টাকায় করা কাজ কি আবার জনগণের অর্থেই ভাঙতে হবে? যদি তাই হয় তবে এমন উন্নয়নের কোনো মানে নেই। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে কাজের সমন্বয় না থাকায় দুর্ঘটনা ঝুঁকি এখন চরমে।
উন্নয়নের এ হিসাব-নিকাশের মধ্যে মোস্তফা সেলিমের মতো মানুষের কথা খুব সহজেই হারিয়ে যায়। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বৈদ্যুতিক খাম্বাটি তার কাছে কোনো পরিসংখ্যান নয়। সেটিই তার নয় দিন কর্মহীন থাকার কারণ, মাথা-চোয়াল ও হাঁটুর আঘাতের স্মৃতি। সড়কটির উন্নয়ন কাজ একদিন নিশ্চয়ই শেষ হবে। পিচের ওপর দিয়ে যানবাহনও ছুটবে দ্রুত গতিতে। হয়তো তখন এ খাম্বাগুলোও আর থাকবে না। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে, একটি নিরাপদ সড়ক নির্মাণের পথে সেলিমের মতো আরও কতজনকে আহত হতে হবে?
লেখক : শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি