ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ইলিশের পেছনের ট্র্যাজেডি

সাইয়্যিদ মঞ্জু
ইলিশের পেছনের ট্র্যাজেডি

পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই ইদানিং ইলিশ নিয়ে বড় বড় খবরের শিরোনাম দেখা যায়— নাব্য সংকট, প্লাস্টিক দূষণ, পদ্মার ইলিশের আকাশচুম্বী দাম কিংবা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়া তিন হাজার টাকা দরে কেজি মাছ। এ চকচকে খবরগুলোর পেছনে ঢাকা পড়ে থাকে সাগরের নোনা জলে জীবন বাজি রাখা মানুষের নিঃশব্দ হাহাকার। সংবাদমাধ্যমের খবর পড়ে সাধারণ ভোক্তা মনে করেন, ফিশিং বোটের মালিকরা বোধহয় ইলিশের দরদামে কোটি কোটি টাকা লাভ করছেন। বাস্তবতা যে কতটা নির্মম, সাগরের উত্তাল তরঙ্গ পেরিয়ে ঘাটে নোঙর করা একজন বোট মালিকের চোখে না দেখলে তা বোঝা অসম্ভব।

?একটি ফিশিং ট্রলার সমুদ্রে ভাসানোর প্রস্তুতি মোটেও কোনো সস্তা রোমাঞ্চ নয়। একটি বড় ও মজবুত ফিশিং বোট তৈরি করা, সুনির্দিষ্ট জাল কেনা এবং দক্ষ মাঝিমাল্লাদের বায়না করা বাবদ শুরুতেই মূলধন ঢালতে হয় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা। এ বিরাট অঙ্কের অর্থ কোনো বিলাসিতা নয়; গভীর সাগরের প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকার ন্যূনতম রসদ। এত বড় বিনিয়োগের পর যখন একটি ট্রলার সাগরে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তখন প্রতি ট্রিপেই নতুন করে গুনতে হয় আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা।

ট্রলারের ডিজেলের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৫ থেকে ২০ জন মাঝিমাল্লার ১২ থেকে ১৫ দিনের খাবার খরচ, পানীয় জল, জরুরি ওষুধপত্র এবং আহরিত মাছ তাজা রাখার বরফ। সাগরে জাল ফেলার আগেই বোট মালিকের ঘাড়ের ওপর চেপে বসে এ তিন থেকে চার লাখ টাকার নগদ খরচের বোঝা। এ টাকা জোগাড় করতে হয় নিজের শেষ সম্বলটুকু বেঁচে, চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কিংবা আড়তদার ও মহাজনদের দোরগোড়ায় ধরনা দিয়ে। এরপর থাকে প্রকৃতির চরম অনিশ্চয়তা। মাঝসমুদ্রে আচমকা ঝড়-ঝঞ্ঝা শুরু হলে মাছ ধরা তো দূরের কথা, জীবন বাঁচাতে খালি হাতে ঘাটে ফিরতে হয়। সেই লোকসানের খতিয়ান কোনো খবরের কাগজে ছাপা হয় না।

?সব শঙ্কা, ক্লান্তি আর ঢেউয়ের ঝাপটা সামলে ট্রলার যখন ঘাটে এসে নোঙর করে, ঠিক তখনই শুরু হয় বোট মালিকের মানসিক যন্ত্রণার আসল অধ্যায়। ঘাটে পা রাখার সঙ্গেই বোট মালিক মুখোমুখি হন মধ্যস্বত্বভোগী অশুভ সিন্ডিকেটের। পত্রিকায় যখন ছাপা হয় বাজারে ইলিশের চরম সংকট, ঘাটে তখন শুনি উল্টো গান। আড়তদার ও ব্যাপারিরা মুখে কৃত্রিম দুশ্চিন্তার হাসি ফুটিয়ে সুর তোলে— 'ধুর মিয়া! দেশের সব বাজারে নাকি ইলিশে ভেসে যাচ্ছে! বাজারে এখন ইলিশের একদম দাম নাই। কোনোমতে বিক্রি করতে পারলেই বাঁচেন, নাইলে বরফ গলে মাছ নষ্ট হবে!'

যে ইলিশের কেজি শহরের বাজারে তিন হাজার টাকায় বিক্রি হয়, ঘাটের সিন্ডিকেট সেই সুস্বাদু দেশি ইলিশের দর হাঁকায় তার অর্ধেকেরও কম। ট্রলারে রাখা বরফ গলতে থাকে, পারিশ্রমিকের আশায় বুক বেঁধে থাকা মাঝিমাল্লারা কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে, আর ওদিকে পাওনাদারদের ফোনের ঘনঘন রিং বাজতে থাকে। এক চরম মানসিক জিম্মিদশার মধ্যে পড়ে বোট মালিক বাধ্য হন কম দামে নিজের রক্ত পানি করা সম্পদ তুলে দিতে। ঘাটে মাছ বুঝিয়ে দিয়ে যখন বোট মালিক খালি পকেটে নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, তখন মনে হয়— লাভ তো দূরের কথা, শুধু জীবনটা নিয়ে কোনোমতে বেঁচে ফিরলাম।

এখন ঘাটের সিন্ডিকেটের এ লুটপাটের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা নিম্নমানের ও সস্তা ইলিশ। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কেন ভারত থেকে এসব নিম্নমানের ইলিশ আনা হচ্ছে? এর পেছনে কাজ করছে অসাধু আমদানিকারক ও আড়তদারদের অধিক মুনাফা লাভের লোভ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের এক পরিকল্পিত কারসাজি। ভারতের গুজরাট, মহারাষ্ট্র বা ওড়িশা উপকূল এবং নর্মদা নদীর মোহনা থেকে যেসব ইলিশ আসে, সেগুলোর চর্বি ও স্বাদের মান আমাদের পদ্মা-মেঘনার বঙ্গোপসাগরীয় ইলিশের তুলনায় অত্যন্ত নিম্নমানের। সেখানে এ মাছের চাহিদাও কম, ফলে অতি সস্তা দামে তা সংগ্রহ করা যায়।

অসাধু সিন্ডিকেট এ সস্তা মাছ দেশে নিয়ে আসে। এতে তাদের বিনিয়োগ কম হলেও মুনফা হয় বহুগুণ। বাজারে কৃত্রিমভাবে সরবরাহ বাড়িয়ে দেশি তাজা ইলিশের দরপতন ঘটানোই থাকে এদের মূল উদ্দেশ্য। সস্তা ভারতীয় মাছ ঘাটে নামিয়ে আড়তদাররা স্থানীয় বোট মালিকদের ভয় দেখায় যে বাজারে প্রচুর মাছ এসেছে, তাই পদ্মার তাজা মাছের দামও কমানো ছাড়া উপায় নেই। পরবর্তীতে এ নিম্নমানের হিমায়িত মাছগুলো শহরের অভিজাত বাজারগুলোতে 'পদ্মা বা বরিশালের তাজা ইলিশ' বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে একদিকে সাধারণ ভোক্তা সস্তা ও স্বাদহীন মাছ চড়া দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশি মৎস্য খাত চরম হুমকির মুখে পড়ছে।

পত্রিকার তথাকথিত বিশ্লেষণে প্রায়ই দাবি করা হয় যে নদী ও সাগরে বড় ইলিশের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। কিন্তু একজন বোট মালিক হিসেবে এ দাবি শতভাগ সত্য নয় মনে করি। আমরা গত চার বছর ধরে সঠিক নিয়ম মেনে বড় ইলিশ ধরার জাল ব্যবহার করে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ বড় ইলিশ আহরণ করে আনছি। অর্থাৎ মাছ সাগরে আছে, কিন্তু সমস্যাটা সাগরে নয়; সমস্যা ঘাটের কারসাজিতে এবং সঠিক বিপণন কাঠামোর অভাব।

বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের শীর্ষস্থানে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ঢালাওভাবে ইলিশ রপ্তানি করে না। সাধারণ মানুষের যুক্তি ছিল, রপ্তানি বন্ধ থাকলে দেশের বাজারে মাছের সরবরাহ বাড়বে এবং জাতীয় মাছ ইলিশের স্বাদ অন্তত নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি উল্টো।

প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ রাখা এবং কোস্টগার্ড ও মৎস্য বিভাগের কঠোর তদারকির কারণে প্রতি বছর ইলিশের রেকর্ড উৎপাদন হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই উৎপাদনের কোনো ইতিবাচক প্রভাব সাধারণ ক্রেতার মানিব্যাগে পড়ছে না। দেশীয় বাজারে ইলিশের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে। চাঁদাবাজি, কোল্ড স্টোরেজে অবৈধ মজুতদারী, পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া এবং হাতবদলের নামে আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে যে বিপুল মুনাফা বাড়ানো হয়, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। ফলে বিশ্বের সর্বোচ্চ ইলিশ উৎপাদনকারী দেশের খেতাবটি শুধু পরিসংখ্যানেই শোভা পায়, কিন্তু খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের পাতে দুবেলা এক টুকরো ইলিশ ওঠা আজ স্বপ্নের অগোচর।

?এর ওপর দুর্গাপূজা বা বিশেষ মওসুম এলেই শুরু হয় ইলিশ কূটনীতি। সীমান্ত পেরিয়ে শত শত টন সেরা মানের ইলিশ চালান হয়ে যায়, আর দেশের মানুষ ভেজাল মাছের ভীড়ে আসল ইলিশের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের মৎস্য খাত ও ইলিশের বাজার আজ পুরোপুরি সিন্ডিকেট এবং ভুল নীতির শিকলে বন্দি।

?প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ভরা মৌসুমে ইলিশ সস্তা হয়ে সাধারণ মানুষের পাতে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ঘাটের সিন্ডিকেট আর কৃত্রিম সংকটের কারণে জাতীয় মাছের স্বাদ নেওয়া তো দূরের কথা, আড়তের চড়া দামের কথা শুনেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের চোখ কপালে ওঠে। দামের এই আকাশচুম্বী প্রাচীরই প্রমাণ করে, সাগরে রুপালি ফসল যতই ফলুক না কেন, তা শুধু শৌখিন ধনী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের উদরপূর্তির রসদ জোগায়; আর মেহনতি গরিবের পাতে তা অধরাই থেকে যায়।

?একজন ফিশিং বোটের মালিক ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে, প্রতি ট্রিপে আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচের ঝুকি নিয়ে, উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে দেশবাসীকে ইলিশ উপহার দেন। কিন্তু দিনশেষে লাভের পুরো গুঁড় খেয়ে ফেলে মধ্যস্বত্বভোগীরা। যদি ভারতীয় নিম্নমানের মাছের জালিয়াতি বন্ধ করা না হয়, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য না ভাঙা হয় এবং প্রান্তিক বোট মালিকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা না যায়, তবে অচিরেই সাগরে ট্রলার পাঠানো বন্ধ হয়ে যাবে। কাগজ-কলমে ইলিশের চড়া দামের খবরে হয়তো পত্রিকার বিক্রি বাড়ে, কিন্তু সেই চকচকে খবরের আড়ালেই ঢাকা পড়ে থাকে শত শত ফিশিং বোট মালিকের নিঃশব্দে দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার ট্র্যাজেডি।

লেখক : কবি ও লেখক, কক্সবাজার

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত