ঢাকা রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

নারী ও শিশু সুরক্ষা

মুহাম্মদ হারিসুল ইসলাম হিরো
নারী ও শিশু সুরক্ষা

রাষ্ট্র যখন কোনো আইন প্রণয়ন করে, তখন তার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে সমাজের সাধারণ মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আইন কখনও কোনো বিশেষ আইনজ্ঞ, প্রাজ্ঞ আইনজীবী কিংবা বিচারকের বুদ্ধিবৃত্তিক কূটতর্ক ও জটিল ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ফাঁদ তৈরির জন্য রচিত হয় না। ফৌজদারি আইনতত্ত্বের এক অবিতর্কিত মৌলিক সূত্র হলো Ignorantia juris non excusat বা আইনের অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ধরে নেয় দেশের প্রত্যেক নাগরিক আইন জানে এবং তা মেনে চলে। কিন্তু এই কঠোর সর্বজনীন নীতির ভেতরেই একটি অলিখিত ও বাধ্যতামূলক শর্ত রয়েছে: রাষ্ট্রকে আইনটি এমন সহজ, স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় লিখতে হবে যাতে একজন সাধারণ প্রজ্ঞাবান নাগরিক আইনজীবী বা আদালতের দ্বারস্থ না হয়েও অনায়াসে বুঝতে পারে তার কোন কাজটি আইনসম্মত আর কোনটি অপরাধ।

আইন যখন ভাষা ও কাঠামোর দিক থেকে অস্পষ্ট, অতিনিয়ন্ত্রণমূলক এবং পরস্পরবিরোধী দ্বৈত শাস্তির ধারায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন তা আইনের শাসনের মৌলিক ভিত্তি আইনি নিশ্চয়তা ও বৈধতার তত্ত্বকে চরমভাবে আঘাত করে। বাংলাদেশের বহুল আলোচিত 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০' পর্যালোচনা করলে এই জুরিসপ্রুডেনশিয়াল সংকটের সবচেয়ে করুণ রূপ চোখে পড়ে। নিপীড়িতের ঢাল হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও গত আড়াই দশক ধরে এটি বিচারিক অঙ্গনে বিতর্ক, অপব্যবহার আর বিভ্রান্তির এক স্থায়ী উৎসে পরিণত হয়েছে।

একটি সুস্থ আইনের জন্ম হয় সুদূরপ্রসারী আইনি দর্শন থেকে। কিন্তু আমাদের এই বিশেষ আইনটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি মূলত বিভিন্ন সামাজিক আলোড়ন ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে দেওয়া সাময়িক 'প্রতিক্রিয়াশীল' পদক্ষেপের ফসল। ১৯৮৩ সালের 'নারী নির্যাতন (বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ' থেকে শুরু করে ১৯৯৫, ২০০০, ২০০৩, ২০২০ এবং সবশেষ ২০২৫-২৬ সালের সংশোধনী পর্যন্ত আইনটিকে বারবার কাটাছেঁড়া করা হয়েছে।

২০২০ সালে 'ধর্ষিতা' শব্দের জায়গায় 'ধর্ষণের শিকার' প্রতিস্থাপন ছিল একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আর ২০২৫-২৬ সালের সংশোধনে জরিমানার অঙ্ক বহুগুণ বাড়ানো, 'বলাৎকার'-এর সংজ্ঞা সংযোজন, ধর্ষণের চেষ্টাকালে অঙ্গহানির শাস্তি নির্ধারণ এবং বহু বছর ধরে অকার্যকর থাকা ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে দুই বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড ও ক্ষতিপূরণের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। তবে এই ঘন ঘন সংস্কারই প্রমাণ করে, আইনটির মূল কাঠামো ও খসড়াতেই মৌলিক গলদ রয়ে গেছে। পঁচিশ বছরে অর্ধ ডজনবারের বেশি সংশোধনের পরও কেন সাধারণ মানুষ কিংবা আদালত এই আইনের হাত থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার পাচ্ছে না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আইনটির ধারাভিত্তিক অসঙ্গতির ভেতর।

আইনটির সর্বাধিক ব্যবহৃত ধারাগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, কীভাবে অপরাধের সংজ্ঞা ও দণ্ড নির্ধারণে মৌলিক নীতিগুলো লঙ্ঘিত হয়েছে।

প্রথমত, ধারা ৭-এ মানব পাচার-বহির্ভূত অপরহরণের শাস্তি সর্বনিম্ন ১৪ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অথচ ধারা ২(খ)-এ অপরহরণের সংজ্ঞায় প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির স্পষ্ট কোনো ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। আইনবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি চরম 'অতি-প্রসারতা' বা Doctrine of Overbreadth। এর ফলে সামাজিকভাবে অনুমোদিত বিয়ে বা প্রেমঘটিত পালায়নের ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক নারী স্বেচ্ছায় ঘর ছাড়লেও পরিবার অনায়াসে প্রেমিকের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন শাস্তির ফাঁদ পেতে 'অপরহরণ' মামলা ঠুকে দিতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ধারা ৮-এর 'মুক্তিপণ'-এর সংজ্ঞায় 'অন্য যে কোনো প্রকারের সুবিধা' কথাটি এত অনির্দিষ্ট যে এটি সাধারণ দণ্ডবিধির অপরহরণ ধারার সঙ্গে এখতিয়ারগত সংঘাত তৈরি করে। একই ঘটনায় কোন আইনে মামলা হবে তা চলে যায় তদন্তকারী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মর্জি ও বিবেচনার ওপর। তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে মারাত্মক অসংগতি দৃশ্যমান ধারা ৯(১) এবং ধারা ৯খ-এর মুখোমুখি অবস্থানে। ধারা ৯ (১)-এর ব্যাখ্যা মতে, বিয়ের প্রলোভনমূলক প্রলোভন দেখিয়ে সম্মতি নিয়ে যৌনকর্ম করলে তা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডযোগ্য 'ধর্ষণ'। অথচ ধারা ৯খ বলছে, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আশ্বাসভাজন সম্পর্কের মধ্যে যৌনকর্ম করলে তার শাস্তি সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড। একই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই প্রতারণার কোনো অপরাধমূলক অভিপ্রায় ছিল কিনা; অর্থাৎ ফৌজদারি আইনের অপরিহার্য শর্ত বা প্রারম্ভিক অসৎ উদ্দেশ্য নির্ণয়ের কোনো স্পষ্ট মানদণ্ড আইনে নেই। ফলে পুলিশ ও প্রসিকিউশন তাদের মর্জিমাফিক যেকোনো আসামিকে হয় ফাঁসির মুখে ঠেলে দিতে পারে, নয়তো লঘুদণ্ডে ফেলে দিতে পারে। এটি সমতা ও ন্যায়ের চরম পরিহাস। চতুর্থত, ধারা ৯(২)-(৪)-এ সমানুপাতিকতার নীতি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত। এখানে বিচারকের বাস্তবসম্মত বিবেচনার কোনো গ্রেডেড শাস্তির পরিসর বা ধাপ নেই; শাস্তি শুধু দুটি চরম বিন্দুতে বিভক্ত: যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ড। উপরন্তু, ৯(৪)(ক) ধারায় ধর্ষণের চেষ্টাকালে হত্যা বা আঘাতের চেষ্টার জন্য পূর্ণাঙ্গ ধর্ষণের সমান সাজা দিয়ে 'চেষ্টা' (Attempt) ও 'সম্পন্ন অপরাধ' (Full Offence)-এর মধ্যকার স্বাভাবিক নীতিগত সীমারেখা মুছে ফেলা হয়েছে। পঞ্চমত, ধারা ৯(৫)-এ হেফাজতে ধর্ষণের ক্ষেত্রে বিপরীত প্রমাণভার চাপিয়ে প্রথাগত নির্দোষিতার অনুমানকে তুচ্ছ করা হয়েছে। আর ধারা ১০-এ ব্যবহৃত ১৮৬০ সালের ও ঔপনিবেশিক পরিভাষা 'শীলতাহানি' অ-সুনির্দিষ্ট এবং শুধু দৈহিক স্পর্শেই সীমাবদ্ধ; আধুনিক যুগের ডিজিটাল, মৌখিক কিংবা স্পর্শবিহীন যৌন হয়রানিকে বিশেষ আইনের বাইরে রেখে ভুক্তভোগীকে বিভিন্ন আদালতের জটিল গোলকধাঁধায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের ঔপনিবেশিক আমলের দণ্ডবিধি সম্পূর্ণ বাতিল করে প্রণয়ন করেছে আধুনিক 'ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩'। তারা কোনো খণ্ডিত বা বিচ্ছিন্ন বিশেষ আইনের পথ বেছে নেয়নি, বরং মূল সংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোকে এক ছাতার নিচে সংহত করেছে। সর্বপরি, আইন প্রণীত হয় একজন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পথ সুগম করার জন্য। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-কে টিকিয়ে রাখতে আর কোনো সাময়িক প্রসাধন বা দায়সারা সংশোধনী যথেষ্ট নয়। জাতীয় স্বার্থে আজ প্রয়োজন একটি আধুনিক, মানবিক এবং জুরিসপ্রুডেনশিয়ালি ভারসাম্যপূর্ণ 'নারী ও শিশু সুরক্ষা সংহিতা' প্রণয়ন, যা প্রকৃত অপরাধীকে নিশ্চিত সাজার আওতায় আনবে এবং সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে রক্ষা করবে আইনি জটিলতার অভিশাপ থেকে।

লেখক : শিক্ষানবিশ আইনজীবী

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত