ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

শিশু বিভাগের বেহাল অবস্থা

দুর্ভোগে রোগী ও স্বজনরা

মো. রুহুল আমীন খান
দুর্ভোগে রোগী ও স্বজনরা

কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের অবস্থা দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। শয্যাসংকট, অতিরিক্ত রোগীর চাপ, অপরিচ্ছন্ন টয়লেট, ওয়ার্ডে হকারদের অবাধ বিচরণ এবং কতিপয় চিকিৎসকের উদ্ধত আচরণ— সব মিলিয়ে চরম ভোগান্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে শিশু বিভাগে। শিশু রোগী ও তার স্বজনরা আছেন চরম বিড়ম্বনায়। ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণের পরিবেশ।

হাসপাতালে শিশু বিভাগে সিটের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, কোনো কোনো শয্যায় দুজন রোগীকে থাকতে হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন রোগীকে ওয়ার্ডের প্রবেশপথে বিছানা পেতে থাকতে হয়। শিশুদের মতো সংবেদনশীল রোগীদের জন্য এমন পরিবেশ কতটা উপযোগী, তা ভাবার বিষয়। অথচ বিশাল হাসপাতালের অনেক কক্ষ অব্যবহৃত পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় জনবল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে এসব কক্ষ ব্যবহার করে শিশু বিভাগের পরিধি বাড়ানো সম্ভব। তাতে রোগীদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে।

কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে শিশু রোগীর সামান্য সমস্যা হলেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কোনো প্রকারের ঝুঁকি নেওয়া হয় না। ফলে এ হাসপাতালের শিশু বিভাগে রোগীর চাপ বাড়ছে। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের সক্ষমতা বিবেচনা করে রোগীকে এ হাসপাতালে পাঠানো প্রয়োজন। শুধু দায়মুক্তির জন্য রেফার কাম্য নয়। অপ্রয়োজনীয় রেফার কমিয়ে কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালেও শিশুদের জন্য যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চিকিৎসা করাতে এসে রোগীর স্বজনরা যে সব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তার মধ্যে অন্যতম হলো কতিপয় চিকিৎসকের অসহযোগিতামূলক আচরণ। একজন নারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, রোগীর অভিভাবক কোনো সমস্যার কথা জানাতে চাইলে তিনি তাদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করেন। সমস্যার কথা না শুনে সিস্টারের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। চিকিৎসকরা ব্যস্ত থাকেন, রোগীর চাপও অনেক। কিন্তু একজন উদ্বিগ্ন অভিভাবকের কথা শোনা, রোগীর অবস্থা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া এবং দায়িত্বশীল আচরণ করা চিকিৎসাসেবারই অংশ। চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের তা বুঝা দরকার।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে হকারদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। ওয়ার্ডের ভেতরে ঢুকে হকাররা চা, বাদাম ও ফলের ভর্তাসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি করেন। এতে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে অভিভাবকদের মনে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। একজন হকারকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, তারা দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালে আসেন। তার মতো আরও অনেকে সেখানে পণ্য বিক্রি করেন, অথচ কেউ তাদের বাধা দেন না।

শিশুদের চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল স্থানে এভাবে অবাধে খাবার বিক্রি করা কতটা স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ, তা বিবেচনা করা দরকার। একইভাবে শিশু বিভাগে ভিক্ষুকদের প্রবেশও উদ্বেগজনক। হাসপাতাল কোনো হাটবাজার নয় যে এখানে হকার, ভিক্ষুক অবাধে বিচরণ করবে।

হাসপাতালের ওয়াশরুম ও টয়লেটের অবস্থা আরও শোচনীয়। টয়লেটগুলো অপরিষ্কার, দুর্গন্ধযুক্ত ও আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকে। কোন টয়লেট পুরুষদের জন্য আর কোনটি নারীদের জন্য নির্ধারিত, তা বোঝার জন্য কোনো নেমপ্লেট লাগানো নেই। পর্যাপ্ত ময়লার ঝুড়ি ও নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান না থাকায় মেঝেতেই আবর্জনা জমে থাকে। পরে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াশরুমের বেসিনগুলোর অবস্থাও আরও শোচনীয়, ফলে সেগুলো ব্যবহার করতেও অনীহা তৈরি হয়।

হাসপাতালের মতো স্থানে পরিচ্ছন্নতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে শিশু, নবজাতক রোগীদের জন্য অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ময়লার ঝুড়ি ও নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা রাখা এবং নারী ও পুরুষের টয়লেটগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা। পাশাপাশি, বেসিন ও টয়লেট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেখে রোগী ও স্বজনদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ গড়ে তোলা।

পরিশেষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আশা করি তিনি শিশু বিভাগ মাঝেমধ্যে পরিদর্শন করবেন। এ সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। শিশু বিভাগের শয্যাসংখ্যা ও পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করবেন এবং ওয়ার্ডে হকারদের প্রবেশ বন্ধ করবেন। এটাই আমজনতার প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত