ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দক্ষ জনশক্তিই হোক বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শক্তি

দক্ষ জনশক্তিই হোক বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শক্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী কর্মীদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, গ্রামীণ অর্থনীতির সচলতা এবং লাখো পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। চলতি অর্থবছরেও রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই বাস্তবতায় অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে চাহিদাভিত্তিক দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বৈচিত্র্যময় শ্রমবাজারে তাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ সময়োপযোগী।

সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার সফল বাস্তবায়ন দেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শ্রমবাজার মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন, বিভিন্ন দেশের জনমিতিক বাস্তবতা এবং দক্ষ কর্মীর ক্রমবর্ধমান চাহিদা নতুন নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করেছে। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতার বিকল্প নেই।

এ ক্ষেত্রে দেশের ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও আতিথেয়তাসহ বিভিন্ন পেশায় তরুণদের দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। একই সঙ্গে ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরিয়ান, জার্মান ও আরবি ভাষার প্রশিক্ষণ কর্মীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে সহায়ক হবে। তবে শুধু প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ালেই চলবে না; প্রশিক্ষণের মান, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে এর সরাসরি সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্নকে পুঁজি করে দালালচক্রের প্রতারণা বহু বছর ধরে একটি বড় সমস্যা। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং বিদেশে গিয়ে চুক্তির বাইরে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা এখনও উদ্বেগজনক। তাই সরকারি ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির জবাবদিহি এবং কর্মীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

মালয়েশিয়ায় জিরো-কস্ট কর্মী নিয়োগের উদ্যোগ এবং জাপানে নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাঠানোর সুযোগ এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানোর উদ্যোগও সম্ভাবনাময়। তবে নতুন বাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, কর্মপরিবেশ এবং প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সম্পর্কে যথাযথ যাচাই জরুরি। বিদেশে কর্মসংস্থান শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না; কাজের মর্যাদা, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় গড়ে তুলতে পারলে তারা শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানই পাবেন না, দেশে ফিরে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার নতুন ভাণ্ডারও তৈরি করবেন।

তাই সরকারের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, মানসম্মত প্রশিক্ষণ, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় পূর্ণ স্বচ্ছতা।

দক্ষতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারলেই জনশক্তি দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত