ঢাকা শনিবার, ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৬ পৌষ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইরানে বিক্ষোভ, টিভি ভবন ও গভর্নর অফিসে আগুন

* ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নের পর বন্ধের পথে মোবাইল ফোন সেবা * নিহত বেড়ে ৪৫ * নরক দেখানোর হুমকি ট্রাম্পের * আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ নির্বাসিত পাহলভির * ট্রাম্পের হুমকির মুখে অনড় খামেনি
ইরানে বিক্ষোভ, টিভি ভবন ও গভর্নর অফিসে আগুন

ইরানে চলমান বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। তার্কিস সংবাদমাধ্যম ইয়েনেত নিউজ জানিয়েছে বিক্ষোভকারীর পুলিশের মোটরসাইকেল, রাষ্ট্রীয় টিভি সংশ্লিষ্ট ভবন, গভর্নর অফিস ও সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। ইরানের শেষ শাহ শাসকের ছেলে রেজা পেহলেভির আহ্বানে বৃহস্পতিবার রাস্তায় নেমে আসেন মানুষ। এ সময় তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। দেশটির বিরোধী দলীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা।

রাজধানী তেহরানে পুলিশের মোটরসাইকেল ছাড়াও ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অতর্কিত হামলায় নিহত হওয়া ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের কুদস ফোর্সের সাবেক প্রধান কাসেম সোলাইমানির ছবি সম্বলিত বিশাল একটি বিলবোর্ডে আগুন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবিতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের ‘স্বৈরশাসকের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। এমন বিক্ষোভের মুখে ইরানে ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। যদিও দেশটির সরকার এ নিয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে প্রথমে আন্দোলন শুরু করেন। যা টানা ১২দিন ধরে চলছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র হচ্ছে।

ইরানে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নের পর বন্ধের পথে মোবাইল ফোন সেবা : ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পর সেখানে এখন মোবাইল ফোন সেবাও বন্ধের পথে রয়েছে।

তার্কিস সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড শুক্রবার জানিয়েছে, অনেক জায়গায় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইন্টারনেট বন্ধ হওয়ার পরই মোবাইল সেবা ব্যহত হওয়া শুরু করে। যদিও ইরান সরকার এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো ঘোষণা দেয়নি। গত ২৮ ডিসেম্বর ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে প্রথমে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা নতুন করে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর এতে সব ধরনের মানুষ যুক্ত হন। যা গত ১২দিন ধরে টানা চলছে। এরমধ্যে বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভের মাত্র বেড়ে যায়। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন।

১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মাধ্যমে বর্তমান ইরানে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই সরকার হুমকির মুখে পড়েছে। এরমধ্যে দেশটিতে শুরু হলো বড় ধরনের বিক্ষোভ। গত ১২ দিনের এ বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে একটি মানবাধিকার সংস্থা। এসবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন ইরান সরকার যদি বিক্ষোভকারীরদের হত্যা করে তাহলে তারা সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং শক্তিশালী হামলা চালাবেন।

বিক্ষুব্ধ ইরানে নিহত বেড়ে ৪৫ : ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এ পর্যন্ত মোট ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্তত ৮ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। নরওয়ে ভিত্তিক ইরানি মানবাধিকার সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে এ তথ্য।

আইএইচআরের বৃহস্পতিবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগের দিন বুধবার ছিল বিক্ষোভের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিন। সেদিন দেশটির বিভিন্ন শহরে আইনশৃঙ্কলা বাহিনী ও বিক্ষুব্ধ জনতার সংঘাতে নিহত হয়েছেন মোট ১৩ জন, আহত হয়েছেন শতাধিক এবং গ্রেপ্তার হয়েছেন ২ হাজারেরও বেশি বিক্ষোভকারী।

প্রসঙ্গত, বছরের পর বছর ধরে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়েলের অবনতি, তার জেরে অসহনীয় মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকায় নাভিশ্বাস উঠছিল ইরানের সাধারণ জনগণের। এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচারা ব্যবসায়ীরা। সেই ধর্মঘট থেকেই বিক্ষোভের সূত্রপাত। এরপর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সবগুলো শহর-গ্রামে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ এবং দিনকে দিন বিক্ষোভের তীব্রতা বাড়তে থাকে।

ইরানকে নরক দেখানোর হুমকি দিলেন ট্রাম্প : ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে সহিংস অভিযান চলার মধ্যে আবারও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তিনি বলেছেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের হত্যা করে, তাহলে দেশটিকে নরক দেখতে হবে। সাম্প্রতিক সহিংস দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ?্যম দ্য টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তায় নামা মানুষের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করলে তার ভয়াবহ পরিণতি হবে। দ্য টাইমস অব ইসরায়েল-এর প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সম্প্রতি ইরানের বিভিন্ন শহরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভ জোরালো আকার নিয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সংকট এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর আচরণে ক্ষুব্ধ জনগণ রাস্তায় নেমে স্বাধীনতা ও শাসন পরিবর্তনের দাবিতে স্লোগান দিচ্ছেন।

ইরানের জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স পাহলভির : ব্যাপক বিক্ষোভে কার্যত অচল ইরানের বিক্ষুব্ধ জনগণকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির নির্বাসিত ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি। সেই সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীকে জনগণের পাশে থাকার নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ভিডিওবার্তা পোস্ট করেন ক্রাউন প্রিন্স পাহলভি। সেই বার্তায় ইরানের বিক্ষুব্ধ জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘আমার প্রিয় দেশবাসী, গত এক সপ্তাহ ধরে আমি আপনাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি, বিশেষ করে তেহরানের বাজারগুলোতে আপনারা যেসব কর্মসূচি পালন করেছেন- সেগুলো।

বর্তমান সরকারের ভয়াবহ দমন-পীড়ন সত্ত্বেও যেভাবে আপনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যে কোনো দেশের সরকার যতই শক্তিশালী হোক না কেন- জনগণ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুললে এক পর্যায়ে সরকারের সমর্থকরাও তাতে যোগ দেয় এবং সরকার তারা ক্ষমতা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।’ ‘এ কারণে আপনাদের আন্দোলন-বিক্ষোভ কর্মসূচিকে একটি লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে হলে একে সুশৃঙ্খল রাখা জরুরি।’ ‘আমি প্রথমবারের মতো আপনাদের একটি আহ্বান জানাচ্ছি।

গত বৃহস্পতিবার এবং গতকাল শুক্রবার রাত ৮টায় সড়কে কিংবা বাড়িতে যে যেখানেই থাকুন- সরকারের বিরুদ্ধে সজোরে স্লোগান দিন। আপনারা স্লোগান দেওয়ার পর আমি পরবর্তী নির্দেশনা দেবো।’ ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশ্য করে ক্রাউন প্রিন্স বলেন, ‘ইরানের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে সরাসরি বলছি, আপনারা ইরানের জনগণকে রক্ষা করার জন্য সামরিক ইউনিফর্ম পরেছেন এবং ইরানের সাহসী ও ঐক্যবদ্ধ জনগণ আজ এক ঐতিহাসিক মূহূর্তের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেদের ইতিহাস লিখছে, তৈরি করছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি আমার প্রশ্ন— আপনারা এই নতুন ইতিহাসের কোন পক্ষে থাকবেন? অপরাধীদের পক্ষে না কি জনগণের পক্ষে?’

ট্রাম্পের উৎখাতের হুমকির মুখেও অনড় খামেনি বললেন, পিছু হটবো না : ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছেন, বিক্ষোভের মুখে পিছু হটবে না ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া প্রায় দুই সপ্তাহের চলমান বিক্ষোভণ্ডআন্দোলনের মাঝে নিজের অনড় অবস্থানের বিষয়ে ওই মন্তব্য করেছেন তিনি। দেশটির ৩১টি প্রদেশের শতাধিক শহরে ছড়িয়ে ভয়াবহ বিক্ষোভ থেকে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সরকারি ভবন ও রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে অগ্নিসংযোগ করেছেন বিক্ষোভকারীরা।

এ সময় ‘স্বৈরাচারের মৃত্যু’, ‘খামেনির মৃত্যু’ চাইসহ বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের। বৃহস্পতিবার রাতভর দেশটির বড় বড় সব শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেছেন হাজার হাজার মানুষ। খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ‘এক হাজারের বেশি ইরানির রক্তে রঞ্জিত’। তিনি বলেন, ইসরায়েলের জুনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দিয়েছে এবং নিজেও হামলায় অংশ নিয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত