ঢাকা শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

কাঁপছে ভোটের মাঠ

১২ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতিবাজদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন

বললেন ডা. শফিকুর রহমান
১২ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতিবাজদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন

১২ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতিবাজদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি ৫৪ বছর ধরে যারা মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে, তাদের লাল কার্ড দেখানোর নির্বাচন। গতকাল বুধবার নীলফামারী ও লালমনিরহাটের যৌথ আয়োজনে নির্বাচনি জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেবে। মুখ দিয়ে হাত ঢুকিয়ে পেট থেকে চুরির মাল বের করে আনা হবে। উত্তরবঙ্গকে অবহেলিত রাখার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গ কোনো ‘সৎ মায়ের সন্তান’ নয়। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে উন্নয়নের যাত্রা শুরু হবে এই বঞ্চিত অঞ্চল থেকেই। বিশেষ করে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতির চিত্র বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

যেকোনো মূল্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব : যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব এমন মন্তব্য করে জামায়াত আমির বলেন, তিস্তা এ অঞ্চলের মানুষের অহংকার, এখন তিস্তার নাম এক সাগর দুঃখ। আমরা কথা দিচ্ছি, যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব।

তিনি আরও বলেন, তিস্তা নদীর পানি সারা উত্তরবঙ্গকে উর্বর করে তুলবে। আর নদীভাঙনের কবলে হাজার হাজার পরিবারকে নিঃস্ব হতে হবে না। তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করব। কারণ আমার দেশ আগে, এদেশের জনগণের স্বার্থ আগে। আমরা কারো স্বার্থে আঘাত দেবো না কিন্তু কেউ আগে আমাদের স্বার্থে আঘাত করলে সেটা মেনে নেবো না। এখন অনেক যৌক্তিক দাবি রয়েছে, তাদের মধ্যে বুড়িমারি স্থলবন্দর আধুনিকায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, তিস্তা পাড় থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন শুরু হবে ইনশাআল্লাহ। যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলের মানুষকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনেকে বসন্তের কোকিলের মতো একবার দেখা দেয়। আমরা বসন্তের কোকিল না, দুঃখের সময়েও আছি ভালো সময়েও আছি। আমরা বিপদের সময়ে দেশ ছেড়ে চলে যাই না, মাটি কামড়ে ধরে থাকি। আমরা দেশবাসীর বুকে আশ্রয় চাই।

ক্ষমতায় গেলে আর কোনো ফেলানিকে কাঁটাতারে ঝুলে থাকতে হবে না : বুধবার কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে ১১ দলীয় জোটে?র নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে আর কোনো ফেলানিকে কাঁটাতারে ঝুলে থাকতে হবে না। তিনি বলেছেন, অতীতে সীমান্তে আমাদের দেশের মানুষকে পাখির মতো গুলি করে মারা হয়েছে। কোনো বিচার পাইনি। আমি ফেলানির বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার বাবা-মায়ের চোখে পানি নয়, রক্ত দেখে এসেছি। আমরা ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের প্রতিবেশী বন্ধু থাকবে কিন্তু আমরা কোথাও কাউকে প্রভু মানব না, কোথাও কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করব না।

জামায়াতের আমির বলেন, কুড়িগ্রাম জেলার দুঃখ হলো প্রধান তিনটি নদী। বর্ষা আসলেই নদীপাড়ের মানুষের চিন্তা শুরু হয়ে যায়, কখন কার বসতবাড়ি ভেসে যায়। এই নদীগুলোকে দিনের পর দিন একটি সুবিধাবাদী শ্রেণি হত্যা করেছে। নদীগুলোকে কঙ্কাল বানানো হয়েছে। নদী ভাঙন রোধে যত বাজেট হয়েছে সবগুলো তাদের পেটের ভেতরে গেছে। আমরা ক্ষমতায় আসলে ওই চোরদের মুখে হাত ঢুকিয়ে পেট থেকে সব টাকা বের করে নিয়ে আসবো। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা চাই এ দেশের আঠারো কোটি মানুষের বিজয়। তিস্তাপারের উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এখানে সবাই কাজ পাবে। কেউ বেকার থাকবে না।

নারী শ্রমিকদের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, কর্মক্ষেত্রে বিশেষ করে মায়েদের প্রতি বৈষম্য ও অসম্মান রয়েছে। সমান কাজ করেও নারী শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে কম মজুরি পান। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কর্মস্থল থেকে আবাসস্থলে নারীরা শতভাগ নিরাপত্তা ও সম্মান পাবে। এটি মায়েদের কাছে আমাদের প্রথম ওয়াদা। তি?নি আরও বলেন, আবরার ফাহাদ প্রথমে শাহাদাদ বরণ করেছিলেন। তার রাস্তা ধরে আবু সাঈদ, মুগ্ধ শহীদ হন। সর্বশেষ শরীফ ওসমান হাদিসহ ১৪০০ জন শহীদ হয়েছেন। এই ১৪০০ বীরের লাশ এখন এই জাতির ঘাড়ে। শহীদদের রক্তে তারা আমাদের নদীগুলো? লাল করে দিয়েছে। আমরা কথা দি?চ্ছি, আমরা এই শহীদদের সঙ্গে বেঈমানি করব না। তাদের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করব না, তাদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমরা লড়ে যাবো ইনশাল্লাহ।

জাতিকে নিয়ে পেছনে যেতে চাই না : বুধবার বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের শহীদ স্মৃতি পৌর উদ্যানে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমরা জাতিকে নিয়ে পেছনে যেতে চাই না, সামনে যেতে চাই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যে দেশে একটি শিশু উপযুক্ত শিক্ষা পাবে। উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে সুস্থ হয়ে বড় হওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাবে। নিরাপদ রাস্তা পাবে, নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পাবে। এরপর যখন বড় হবে হাতে কাজ পাবে। যখন আরও বড় হবে দেশটাকে গড়ে তুলতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘যে যার যার অবস্থা হিসেবে মূল্যায়ন হবে। সবাইকে সমান দেওয়ার নাম ন্যায় বিচার নয়। যার যেটা ন্যায্য পাওনা তাকে সেটাই দিতে হবে- এর নাম ন্যায়বিচার। আমরা সেই বাংলাদেশ চাই যে বাংলাদেশে আইন হবে সবার জন্য সমান। একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে তার যে নির্দিষ্ট শাস্তি হবে দেশের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী একই অপরাধ করলে তাদের ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না।’ জামায়াত আমির বলেন, ‘যারা নির্বাচন করেছেন, সুন্দর সুন্দর কথা শুনিয়েছেন। কিন্তু ওয়াদা ওয়াদার জায়গায় রয়ে গেছে, ওয়াদা তারা বাস্তবায়ন করেননি। যার কারণে সমাজে বৈষম্য দেখা দিয়েছিল, অপরাধ চরম যাত্রা ধারণ করেছিল, দুর্নীতি গোটা সমাজকে ডুবিয়ে দিয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আমাদের যুব সমাজ ফুঁসে উঠেছিল। একটা মাত্র শ্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। আমরা ন্যায় বিচার চাই।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমার বাঁচার জন্য অধিকার চাই। শিশুর জন্য শিক্ষা চাই। যুবক-যুবতীর জন্য কাজ চাই। মা-বোনদের জন্য নিরাপত্তা চাই। ব্যবসায়ীদের জন্য নির্ভেজাল শান্তিতে ব্যবসা করার পরিবেশ চাই। কৃষকের জন্য জমিতে উন্নতমানের ফসল ফলানোর জন্য সরঞ্জাম চাই। শ্রমিকের জন্য ন্যায্য বিনিময় চাই। কর্ম পরিবেশ চাই।’

তিনি বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে সবচেয়ে মজলুম। আর কোনো সংগঠনের শীর্ষ ১১ জনকে শেখ হাসিনা গুম করে নাই। আর কোনো সংগঠনের নিবন্ধন কেড়ে নেয় নাই। আর কোনো সংগঠনের প্রতীক কেড়ে নেয় নাই। আর কোনো সংগঠনের অফিসগুলো তালাবদ্ধ করে রাখে নাই। আর কোনো সংগঠনের নেতাদের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয় নাই। আর কোনো সংগঠনকে শেষ পর্যন্ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় নাই। এটা একমাত্র সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।’

জামায়াত আমির বলেন, ‘শুধু বিরোধীদলীয় নেতারাই এতোদিন মজলুম ছিলেন না। এদেশের ১৮ কোটি মানুষ মজলুম ছিল। ৫ তারিখের পর যখন জামায়াতে ইসলামী মুক্ত হলো তখন তারা কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে নাই। নির্বাচন দেওয়ার দাবি করে নাই। হাজার হাজার মামলা বাণিজ্য করে মানুষকে হয়রানি করার সিদ্ধান্ত নেয় নাই। বরং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে সেজদায় পড়েছে। আমরা সে রাতেই ঘোষণা করেছিলাম, আমরা কারো বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধ নেবো না। আমাদের নেতা কর্মীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু হারাম পথে উপার্জনের জন্য চাঁন্দাবাজি করবো না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা সিজনাল পলিটিশিয়ান না। আমরা বসন্তের কোকিল না। যখন নির্বাচন আসবে, নতুন রঙ ধারণ করে সুন্দর সুন্দর কথা নিয়ে আমরা হাজির হবো। না, আমরা তাই না। আপনারা সাক্ষী, সাড়ে ১৫ বছর আমাদের ওপর এতো জুলুম হওয়ার পরও আমরা একদিনের জন্যও জনগণকে ছেড়ে যাইনি। এ মাটি কামড় দিয়েই আমরা ছিলাম। আল্লাহ আমাদের এখানে রেখেছিলেন।

দফায় দফায় জেলে গিয়েছি, ঘর-বাড়ি ছাড়া হয়েছি, অফিসে ঢুকতে পারি নাই। কিন্তু বাংলাদেশে ছিলাম। ভবিষ্যতে দুর্দিন, সুদিন আসবে-আল্লাহ জানেন, কথা দিচ্ছি আপনাদের ছেড়ে কোথাও যাবো নাই ইনশা আল্লাহ।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত