ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

বগুড়ায় ট্রেন লাইনচ্যুত, আহত ৬৬

* লাল পতাকা দেখানো হলেও ট্রেন থামাননি চালক * ঢাকা থেকে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হতে পারে * তিন স্টেশনে আটকা পড়ে পাঁচ ট্রেন
বগুড়ায় ট্রেন লাইনচ্যুত, আহত ৬৬

ঈদযাত্রার পথে ঢাকা থেকে নীলফামারীর চিলাহাটিগামী নীলসাগর এক্সপ্রেস বগুড়ায় লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ৬৬ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। গতকাল বুধবার দুপুর ২টার দিকে বগুড়ার সান্তাহার উপজেলার তিলকপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আটকে পড়া বিভিন্ন স্টেশনের যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। সান্তাহার রেলওয়ে থানার এসআই মাহফুজুর রহমান জানান, নীলসাগর এক্সপ্রেস বুধবার বেলা ২টার দিকে সান্তাহার স্টেশনে থামে। সান্তাহার স্টেশন থেকে ছেড়ে যাওয়ার কিছুসময় পর ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। এতে ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনার পর যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেকেই হুড়োহুড়ি করে নামার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন জানিয়ে পাকশী রেলওয়ে জেলার এসপি মেহেদী হাসান বলেন, আহতদের বেশিরভাগই ছাদের যাত্রী। তাদের আদমদীঘী ও নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থলে সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ও উত্তরবঙ্গের ৫ জেলা- নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। লাইনচ্যুত বগি সরিয়ে নিতে ঈশ্বরদী জংশন থেকে ঘটনাস্থলের আসে উদ্ধারকারী ট্রেন।

স্থানীয়রা বলছেন, বুধবার বেলা পৌনে ২টার দিকে রেললাইনে মেরামতের কাজ চলছিল। সেজন্য লাল পতাকা টানানো ছিল এবং সিগন্যালও দেওয়া হয়েছিল। তবে ট্রেনটি সেই সিগন্যাল ‘অমান্য করে আসায়’ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সান্তাহারের স্টেশন মাস্টার খাদিজা খানম বলেন, ঘটনাস্থলে লাল পতাকা লাগিয়ে লাইন মেরামতের কাজ চলছিল। তখনই ট্রেন ঢুকে পড়লে দুর্ঘটনা ঘটে।

লাল পতাকা দেখানো হলেও ট্রেন থামাননি চালক, দাবি স্থানীয়দের : লাল পতাকা দেখানো হলেও ট্রেন চালক ট্রেন থামাননি। রেলওয়ের প্রাথমিক তথ্য ও স্থানীয়দের বক্তব্যে একাধিক সম্ভাব্য কারণ সামনে এসেছে। সান্তাহার রেলস্টেশন মাস্টার আছিয়া খাতুন জানান, দুর্ঘটনাস্থলের রেললাইনে আগে থেকেই ত্রুটি ছিল। তার দাবি, সেই ত্রুটির কারণেই ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি, লাইনম্যান আগে থেকেই বিপদসংকেত দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেনচালক সেই সংকেত উপেক্ষা করেন বা খেয়াল করেননি। স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ?‘লাল পতাকা দেখানো হয়েছিল। যদি সেটা মানা হতো, তাহলে হয়তো এই দুর্ঘটনা এড়ানো যেত।’

ট্রেন হঠাৎ কেঁপে উঠে, তার পরই মানুষের চিৎকার : ‘ট্রেনটা হঠাৎ করে কেঁপে উঠে। তার পরই দেখি মানুষ চিৎকার করছে। কয়েকটা বগি কাত হয়ে গেছে। সবাই প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছিল।’ এভাবেই নিজের আতঙ্কের কথা জানান দুর্ঘটনার শিকার নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী আমিনুল ইসলাম। ৯ বগি লাইনচ্যুতের ঘটনায় শতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বুধবার আড়াইটার দিকে সান্তাহার জংশনের কাছাকাছি ছাতনীগ্রামের বাগবাড়ি এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সাময়িকভাবে উত্তরাঞ্চলের অন্তত পাঁচ জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ বিকট শব্দে ট্রেনটি দুলতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পাশের জমিতে ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৪৭ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, মোট আহতের সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। অনেকে নিজেরাই নিকটবর্তী হাসপাতালে চলে যান। নওগাঁ সদর হাসপাতাল, আদমদীঘী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং আশপাশের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে আহতদের ভর্তি করা হয়েছে। নওগাঁ সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অন্তত ৮০ জন চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন। যাদের মধ্যে অন্তত ২০ জনকে ভর্তি করতে হয়েছে। কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

তদন্ত কমিটি গঠন : দুর্ঘটনার পরপরই পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিতে রয়েছেন প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলী এবং চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তাদেরকে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ণয় এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা থেকে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হতে পারে : ঈদযাত্রীদের নিয়ে নীলফামারীর চিলাহাটির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার সান্তাহারে লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে ঢাকার সঙ্গে উত্তরবঙ্গের ট্রেন চলাচলে প্রভাব না পড়লেও বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে ওই রুটে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা। ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম বলেন, নীলসাগর এক্সপ্রেস লাইনচ্যুত হলেও বুধবার তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না। যেসব ট্রেন রাতে বা ভোরে ঢাকায় আসার কথা সেগুলো হয়তো দেরিতে আসতে পারে। সেজন্য বৃহস্পতিবার ওই রুটের ট্রেন ছাড়তে কিছুটা বিলম্ব হতে পারে।

দুর্ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই রেলওয়ের উদ্ধারকারী (রিলিফ) ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে। লাইনচ্যুত বগিগুলো সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতের কাজ শুরু করেছে। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে অন্তত একটি লাইন সচল করার চেষ্টা করা হয়, যাতে আংশিকভাবে ট্রেন চলাচল শুরু করা যায়। উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিস, রেলওয়ে কর্মী এবং স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দেখা গেছে। তবে ভারী বগি সরানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত লাইন ঠিক করতে সময় লাগছে।

তিন স্টেশনে আটকা পাঁচ ট্রেন : সান্তাহারে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৯টি বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় গতকাল তিনটি স্টেশনে ঈদযাত্রার ৫টি ট্রেন আটকা পড়ে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, গতকাল বুধবার রাত দুইটা নাগাদ লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার হবে। এতে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের আরও কয়েক জোড়া ট্রেন আটকা পড়তে পারে। ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের ৫ জেলা নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও জয়পুরহাটের সঙ্গে ঢাকার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেল কন্ট্রোলার শফিকুর রহমান জানান, ঘটনার পর থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ঈদযাত্রার তিনটি ট্রেন আটকা পড়ে। এর মধ্যে পঞ্চগড় থেকে রাজশাহীগামী বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে, খুলনা থেকে চিলাহাটিগামী রূপসা এক্সপ্রেস নাটোরের রানীনগরে, খুলনা থেকে পার্বতীপুরগামী রকেট মেইল নাটোরে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা পঞ্চগড়গামী একতা এক্সপ্রেস নাটোরের আবদুলপুর স্টেশনে ও রাজশাহী থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস আবদুলপুর স্টেশনে আটকা পড়ে।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বলেন, লাইনচ্যুত ট্রেনটি উদ্ধার করতে গতকাল বুধবার রাত দুইটা বাজতে পারে।

রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন : ট্রেন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে দেশে সবচেয়ে বেশি যে কারণটি উঠে আসে, তা হলো রেললাইনের ত্রুটি ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো লাইন, নিয়মিত পরিদর্শনের অভাব এবং সময়মতো মেরামত না করাই এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। সান্তাহার রুটটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম ব্যস্ত রেলপথ। প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন এই পথে চলাচল করে। ফলে লাইনের ওপর চাপও বেশি। রেলওয়ের সাবেক প্রকৌশলী আবুল হোসেন বলেন, ‘যেখানে লাইন দুর্বল, সেখানে গতিনিয়ন্ত্রণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। আর সিগন্যালিং সিস্টেম যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।’

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত