
হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে আরও ১২ জন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৪৫১ জন। এদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া হাম ‘অতিমাত্রায় সংক্রমণযোগ্য’ হলেও আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনলে ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে বলে তথ্য দিয়েছেন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে শাহবাগে শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে দেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য দেন একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
সেখানে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জিয়াউল হক বলেন, ‘আমরা দেশের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞসহ সকল চিকিৎসক দেশে হামের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু শঙ্কিত নই’। আপনারা সংবাদ মাধ্যমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় বিভিন্ন তথ্য পেয়ে থাকেন। যেমন এই হামের সাথে গুটি বসন্তও হতে দেখা গেছে।
‘অনুসন্ধানের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে, সেটা ছিল জলবসন্তের একটা সহ-সংক্রমণ। এই ধরনের অপতথ্য সম্পর্কে সজাগ থাকার জন্য আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীকে অনুরোধ জানাচ্ছি।’ রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের এ চিকিৎসক বলেন, মনে রাখতে হবে হাম একটি অতিমাত্রায় সংক্রমণযোগ্য রোগ, যা খুব দ্রুত মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে ৯৯ শতাংশ রোগী সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে। ‘বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন’ এবং ‘চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ এ সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে।
সেখানে শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ‘হাম মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই আক্রান্ত শিশুকে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। এটি করতে পারলেই শিশুদের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে।’
অধ্যাপক রুহুল আমিন বলেন, ‘দেশে মাতৃদুগ্ধ পান করে এখন ৫৬ শতাংশ। বাকি শিশুরা মাতৃদুগ্ধের বাইরে থাকায় তাদের রোগপ্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতাও শিশুদের নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।’ দেশে হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু হার ‘শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ’ বলে তথ্য দেন জিয়াউল হক। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। অতীতে সফল টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে হামের সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু গত ২ বছরে টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় চলতি বছরের মার্চ থেকে গত ১৪ মে পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৪১৯ শিশুর মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে।
‘এর মধ্যে ৭০ জন হামে ও ৩৬৯ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। হামজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ শ্বাসতন্ত্র বিকল হয়ে পড়া। এ কারণে দেশের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সরকারকে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।’
হামের বিস্তার রোধে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
সেগুলো হল- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি চালু রাখা। প্রত্যন্ত উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ‘ফিভার কর্নার’ চালু করে হামপ্রবণ এলাকা শনাক্ত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত চিকিৎসা নির্দেশিকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দেশব্যাপী হামের উপসর্গ ও চিকিৎসার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অধ্যাপক আসিফ মুজতাবা মাহমুদ, জয়েন্ট সেক্রেটারি অধ্যাপক কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর, চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক আনোয়ারুল আনাম কিবরিয়া, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক গোলাম সরওয়ার লিয়াকত হোসেন ভুঁইয়া সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
হামে মারা গেল আরও ১২ শিশু, মৃত্যু ছাড়াল ৪৫১ : দেশে গেল ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এই রোগের উপসর্গ নিয়ে আরো ১২ জন শিশুর মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে চারজনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছিল; বাকি আট জনের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল।
এ নিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৪৫১ জন। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম সংক্রান্ত নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। এছাড়া হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে ৩৭৭ জন। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১৫০ জন ঢাকায় মারা গেছে; আজ রার ৭৮ জশাহী বিভাগের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গেল ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১১১ জন হাম আক্রান্ত হয়েছে; এই সময়ে ১ হাজার ১৯২ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসেন; যাদের মধ্যে এক হাজার ১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গেল ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪২২ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ৭ জন ভর্তি হয়েছে রংপুরে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৫৫ হাজার ৬১১ জন। এদের মধ্যে ৭ হাজার ৪২১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।