
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে বেইজিং ত্যাগ করেছেন। এই সফরে তিনি দুই দফায় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বাণিজ্য ইস্যু ছাড়াও ইরান ও তাইওয়ানের মতো আলোচিত দুই ইস্যুতে এই দুই নেতার মধ্যে স্পষ্ট কোনো ঐকমত্য হয়েছে, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। সোজা কথায় ইরান ও তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো ধরনের অগ্রগতি ছাড়াই ট্রাম্পের সফর শেষ হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বেইজিংয়ে সির দ্বিতীয় দিনের বৈঠক শুরুর আগে ফক্স নিউজে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষ সম্মেলনকে ‘এখন পর্যন্ত সফল’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ইরানের যুদ্ধের অবসান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত দেখতে চান।
ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে ভূমিকা রাখার প্রস্তাবও দিয়েছেন সি। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘প্রেসিডেন্ট শি একটি চুক্তি দেখতে চান। তিনি সত্যিই একটি চুক্তি হতে দেখতে চান এবং তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি যদি কোনোভাবে সহায়তা করতে পারি, তাহলে আমি এতে যুক্ত হতে চাই।’
চীনের ইরানি তেল ক্রয়ের বিষয়টি টেনে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘দেখুন, যে দেশ এত বেশি তেল কিনছে, তাদের স্পষ্টতই কোনো না কোনো সম্পর্ক আছে। কিন্তু তিনি বলেছেন, আমি যদি কোনোভাবে সহায়তা করতে পারি, তাহলে আমি সাহায্য করতে চাই।’এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি টিকে আছে। তবে আলোচনায় এখনও স্থায়ী কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা দূরবর্তী। এই অবস্থায় চীনের তরফ থেকে ইরান ইস্যুতে স্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি না আসার বিষয়টি আসলে ধোঁয়াশা তৈরি করে। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, ইরান প্রসঙ্গে দুই নেতার ‘দৃষ্টিভঙ্গিতে খুবই মিল’ রয়েছে। তবে সাংবাদিকদের সামনে দেওয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সরাসরি কিছু বলেননি শি। আজ শুক্রবার সকালে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইরান যুদ্ধ ‘কখনও হওয়াই উচিত ছিল না।’
শি ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার ‘এই সফরের মাধ্যমে আমাদের দুই দেশের মধ্যে একটি নতুন, গঠনমূলক কৌশলগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একে সত্যিকার অর্থেই একটি মাইলফলক ঘটনা বলা যেতে পারে।’ শির তরফ থেকে এই ধরনের কথা বলা হলেও তাতে তাইওয়ান বা ইরান ইস্যুতে কোনো বক্তব্য ছিল না। আবার ট্রাম্পও তাইওয়ান নিয়ে কিছু বলেননি। এর আগের দিন গতকাল বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাইওয়ান ইস্যু সতর্কতার সঙ্গে সামলাতে বলেন। অন্যথায় সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়বে বলেও হুমকি দেন তিনি।
মার্কিন থিংকট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে বেইজিং জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন করেছে, যা বিশেষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে আকৃষ্ট করার মতো করেই সাজানো হয়েছিল। তবে প্রাথমিক বার্তাগুলো দেখাচ্ছে, দুই পক্ষের অগ্রাধিকারের জায়গায় এখনও বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।
কিম বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। একই সঙ্গে তারা এটাও তুলে ধরেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েই একমত যে ইরানের কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়া উচিত নয় এবং হরমুজ প্রণালী খোলা থাকা উচিত।’
প্যাট্রিসিয়া কিম আরও বলেন, ‘যে বিষয়টি উল্লেখযোগ্য, তা হলো ইরান প্রসঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে চীনের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।’ তার ভাষায়, ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য নতুন কাঠামো নিয়ে চীনের বিবৃতি এবং তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের রেড লাইন বা চূড়ান্ত সীমাকে সম্মান করার দাবি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।’
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে চীন -ট্রাম্প : ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতায় সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের জন্য খোলা রাখার পক্ষেও মত দিয়েছেন তিনি। বেইজিংয়ে সির সঙ্গে বৈঠকের পর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ দাবি করেছেন। সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘শি জিনপিং যুদ্ধ বন্ধে সহায়তা করতে চান। তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, তবে অবশ্যই করতে চাই।’ ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। যুদ্ধের প্রভাবে এ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে থাকায় বিশ্ব তেল-বাণিজ্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ জলপথ খোলা রাখার পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বজুড়েই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করছে।
ট্রাম্প বলেন, চীন হরমুজ প্রণালী খোলা রাখতে চায়। কারণ, দেশটি ওই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি করে। তিনি বলেন, ‘তারা ওই পথ দিয়ে অনেক তেল কেনে এবং তারা তা চালিয়ে যেতে চায়। তাই তারা হরমুজ প্রণালী খোলা দেখতে চায়।’ ট্রাম্প আরও বলেন, সি চিন পিং তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, চীন ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম দেবে না। তবে এ আশ্বাসে ইরানকে চীনের সম্ভাব্য গোয়েন্দা সহায়তা, ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানি বা চীনা ক্রেতাদের মাধ্যমে ইরানের তেল বিক্রি থেকে পাওয়া বিপুল আয়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইরান যুদ্ধে চীনের অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কারণ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন। এ তেল বিক্রির আয়ই ইরানের অর্থনীতির বড় ভরসা।
ট্রাম্প যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও চুক্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়েছেন, সেখানে শি বারবার দুই দেশের মধ্যে সংঘাত এড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। শি জিনপিং বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিন্ন স্বার্থ আমাদের মতপার্থক্যের চেয়ে অনেক বড়। সহযোগিতা দুই পক্ষের জন্যই উপকারী, আর সংঘাত উভয়ের জন্য ক্ষতির।’ ট্রাম্প বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন, তেল ও এলএনজি কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি ২০০টি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
হরমুজ নিয়ে ট্রাম্প-শির মধ্যে কী আলোচনা হলো, তবে কি নৌপথটি উন্মুক্তে প্রদক্ষেপ নেবে চীন : বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গতকাল শুক্রবার বেইজিংয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা নিয়ন্ত্রণে এই জলপথটি দিয়ে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি বলে দুই নেতাই মনে করেন।
এদিকে, ভারতের নয়াদিল্লিতে চলমান ব্রিকস সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানায়। তেহরান কোনো ধরনের চাপের মুখে ‘মাথা নত করবে না’ বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। একই সময়ে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যকার সংঘাতের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটনে তৃতীয় দফা সরাসরি বৈঠক শুরু হয়েছে। অবশ্য কূটনৈতিক এই আলোচনার মধ্যেও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইরানি সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, গত রাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চীনা কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত জাহাজসহ অন্তত ৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজ পারাপারের অনুমতি দিয়েছে তেহরান। ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দেশটির নৌবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখলে এই জলপথ সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী সচল রাখতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
একই সঙ্গে এই যুদ্ধে ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ না করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বেইজিং।
ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ঠেকাতে একমত চীন, দাবি ট্রাম্পের : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইরান ইস্যুতে তাদের মধ্যে বিশদ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে। গতকাল শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন চলমান আলোচনার ২য় দিনে এসব মন্তব্য করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প জানান, দুই নেতাই হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখার পক্ষে একমত হয়েছেন এবং ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, সে বিষয়ে উভয়েই একমত প্রকাশ করেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এই আলোচনাকে অত্যন্ত সফল উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এমন অনেক ভিন্ন ভিন্ন সমস্যার সমাধান করেছি, যা অন্য কেউ হলে হয়তো সমাধান করতে পারতো না।’
যুক্তরাষ্ট্র-চীন শীর্ষ সম্মেলনের অফিসিয়াল চুক্তিগুলো এখনও প্রকাশ না পেলেও, ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে এমন কোনো আভাস পাওয়া যায়নি যে, ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা বেইজিং-তেহরানের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে এমন একটি যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। তাদের মতে যা কখনো শুরু হওয়া উচিত ছিল না।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল ও সয়াবিন কিনতে চায় চীন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চীন এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও সয়াবিন আমদানিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর তিনি এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘চীন আমাদের কাছ থেকে তেল কিনতে রাজি হয়েছে।’ উপস্থাপক শন হ্যানিটিকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের নতুন মোড় নিয়ে আলোচনা করেন।
উল্লেখ্য, চীন দীর্ঘদিন ধরে ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হিসেবে পরিচিত। তবে গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে সয়াবিন আমদানির ক্ষেত্রেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ব্রাজিলের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ইরানে ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকবে, আর বেশি ধৈর্য রাখতে পারব না : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তার প্রশাসনের সাফল্যের তালিকায় ‘ইরানে সামরিক হামলার মাধ্যমে চালানো ধ্বংসযজ্ঞকে’ অন্তর্ভুক্ত করেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের খবরে বলা হয়েছে, নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া দীর্ঘ ওই পোস্টের ভাষা ইঙ্গিত দেয়, আজ শুক্রবার চীন সফর শেষে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করতে পারেন। এপ্রিলের শুরুর দিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে এখনও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার আলোচনা কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি। গত বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজের ‘হ্যানিটি’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আর খুব বেশি ধৈর্য ধরতে যাচ্ছি না। তাদের একটি চুক্তিতে আসা উচিত।’ তবে একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত খুঁজে বের করার বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বা জনসংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আসলে এটা হাতে পেলে স্বস্তি বোধ করব। কিন্তু আমার মনে হয়, এটা যতটা না বাস্তব কারণে গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি জনসংযোগের জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরেকটি কাজ আমরা করতে পারি, সেটা হলো আবার বোমা হামলা করা। কিন্তু আমি সেটা উদ্ধার করতে পারলে বেশি স্বস্তি বোধ করব এবং আমরা সেটা উদ্ধার করব।’
গত বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠকের পর হোয়াইট হাউস জানায়, দুই নেতা একমত হয়েছেন যে- হরমুজ প্রণালী খোলা থাকা উচিত। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালীর ওপর চীনের নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি তেল কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন শি জিনপিং। একই সঙ্গে দুই নেতা একমত হয়েছেন যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।
তেহরান অবশ্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে তারা এমন মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যার কোনো শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নেই। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরীক্ষা করতে বাধা দিয়েছে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, চীনা কর্মকর্তারা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে বেইজিং কোনো ধরনের বিধিনিষেধ বা টোল ছাড়া হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু দেখতে চায়। পাশাপাশি ইরানকে সামরিক সহায়তা সীমিত রাখতে চীন বাস্তববাদী পদক্ষেপ নেবে বলেও তারা জানিয়েছে।
ট্রাম্পের সফরে ২০০ উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি চীনের, তবু কেন বোয়িংয়ের শেয়ারে দরপতন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের মধ্যেই বড়সড় ব্যবসায়িক চুক্তির খবর সামনে এল। গতকাল বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজ চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, চীন ২০০টি বোয়িং জেট উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে একমত হয়েছে। তবে সংখ্যাটি বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হওয়ায় শেয়ারবাজারে বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে উড়োজাহাজ নির্মাতা সংস্থা বোয়িং। ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের আগে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিল, প্রায় ৫০০ উড়োজাহাজ বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ৫০০টি ‘৭৩৭ ম্যাক্স’ জেটের পাশাপাশি বেশ কিছু ব্যয়বহুল ‘ওয়াইডবডি’ উড়োজাহাজও ছিল। সে তুলনায় ২০০টি উড়োজাহাজের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। যার ফলে বৃহস্পতিবার বাজার চলাকালে বোয়িংয়ের শেয়ারের দর প্রায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং প্রায়ই তাদের কূটনৈতিক সফরগুলোকে বড় ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে। বিএনপি পারিবাস-এর অ্যারোস্পেস ইনভেস্টমেন্ট অ্যানালিস্ট ম্যাট একার্স বলেন, ‘এই সফরে আরও কিছু অর্ডার আসার সম্ভাবনা থাকতে পারে, তবে আপাতত বিনিয়োগকারীরা একে প্রত্যাশার চেয়ে কম হিসেবেই দেখছেন।’
উল্লেখ্য, বোয়িংয়ের সিইও কেলি অর্টবার্গ এবং জিই অ্যারোস্পেসের সিইও ল্যারি কাল্প এই সফরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গী হয়েছেন। অর্টবার্গ গত মাসেই আশা প্রকাশ করেছিলেন, চীনের সঙ্গে বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে মার্কিন শেয়ারবাজারে ডাও এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের উন্নতি হলেও বোয়িংয়ের জন্য দিনটি খুব একটা সুখকর ছিল না।