ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মাথার জন্য ৫ কোটি ইউরো দেবে ইরান

* চুক্তির আশা দেখছেন ট্রাম্প, ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত * হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার অধিকার কোনো দেশেরই নেই : কাতার * ইরান যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমছে মার্কিনিদের
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মাথার জন্য ৫ কোটি ইউরো দেবে ইরান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইরান। গত সোমবার এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদন অনুসারে- এই আর্থিক পুরস্কার নিয়ে ইতোমধ্যে ইরানের পার্লামেন্ট মজলিসে আনুষ্ঠানিক বিল উত্থাপন করা হয়েছে। শিগগির এই প্রস্তাবে ভোট দেবেন আইনপ্রণেতারা। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হন। মূলত সেসব হত্যার প্রতিশোধ নিতেই ইরানের এমন উদ্যোগ।

‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা ব্যবস্থা’ শিরোনামের এই বিলটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি তৈরি করেছেন বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। আজিজি জানান, ইরান ২৮ ফেব্রুয়ারি চালানো হামলার জন্য ট্রাম্প, নেতানিয়াহু ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে দায়ী করে। তাদেরকে অবশ্যই কৃতকর্মের জন্য ‘পাল্টা ও একই পরিণামের’ মুখোমুখি হতে হবে। পৃথক ঘোষণায় কমিশনের অপর এক সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ান জানান, যে ‘ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে জাহান্নামে পাঠাবে’, তার জন্য পুরস্কার ঠিক করতে মজলিসে শিগগিরই ভোট গ্রহণ করা হবে। ‘ইরানের বর্তমান নেতা মোজতবা খামেনির জীবনের প্রতিও হুমকি এসেছে,’ উল্লেখ করে তিনি হুশিয়ারি দেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা আবারও শুরু হলে হামলাকারীদের ওপর ‘বিপর্যয়’ নেমে আসবে। বিলটি মজলিসে পাস হলে তা আইনে পরিণত হবে। সে ক্ষেত্রে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ট্রাম্প অথবা নেতানিয়াহু, যেকোনো একজনকে হত্যা করলেই ৫ কোটি ইউরো পাবে। টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমের বরাত দেওয়া হলেও দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন দেখা যায়নি। শুধুমাত্র ইরানের সরকারবিরোধী সংবাদমাধ্যম হিসেবে পরিচিত লন্ডনভিত্তিক ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও আরও কয়েকটি স্বল্প পরিচিত সংবাদমাধ্যম তথ্যটি প্রকাশ করেছে। টেলিগ্রাফের বরাত দিয়ে ভারতের কয়েকটি গণমাধ্যমেও এই খবর প্রচার করে।

সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে- আগে ধর্মীয় ফতোয়া ও বিভিন্ন প্রচারণা থেকে ‘গুপ্তহত্যার’ আহ্বান জানানো হলেও এবার বিষয়টিকে মজলিসে ভোটের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মজলিস এই উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।

গত বছর ট্রাম্প বলেছিলেন, যদি ইরান তার বিরুদ্ধে দেওয়া হত্যার হুমকির ওপর ভিত্তি করে কোনো পদক্ষেপ নেয় তবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিকে ‘পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার’ জন্য ‘অত্যন্ত কঠোর নির্দেশ’ দেবে। এটিই ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানিয়ে ইরানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আসা সর্বশেষ হুমকি। পাশাপাশি, ব্যক্তি উদ্যোগেও ট্রাম্পকে হত্যার জন্য পুরস্কারের অর্থ সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে।

‘ব্লাড কোভেন্যান্ট’ নামের একটি অনলাইন প্রচারণার মাধ্যমে ট্রাম্পকে হত্যার পুরস্কার হিসেবে ইতোমধ্যে ২ কোটি ইউরো জোগাড় হয়েছে বলেও টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।

চুক্তির আশা দেখছেন ট্রাম্প, ইরানে নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মঙ্গলবার তিনি ইরানে নতুন করে বড় হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় তিনি হামলা থেকে সরে এসেছেন। ট্রাম্প আরও বলেন, উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধেও তিনি হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে দিলে ইরান উপসাগরীয় দেশে পাল্টা হামলার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরান ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে।

ট্রাম্প এর আগেও যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান বলে জানিয়েছেন। তবে যুদ্ধ বন্ধে তাঁর চুক্তির রূপরেখা ইরান প্রত্যাখ্যান করায় তিনি মঙ্গলবার হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প দাবি করেন, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলবারে ইরানের সামরিক হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করতে অনুরোধ জানায়। সমঝোতায় পৌঁছাতে এখন গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে বলেও ট্রাম্প জানান।

তবে ট্রাম্প আরও বলেন, মার্কিন সেনাবাহিনীকে তিনি ইরানে বড় ধরনের হামলার জন্য প্রস্তুতি রাখতে বলেছেন। যদি চুক্তি না হয়, তাহলে এক মুহূর্তের নির্দেশে হামলার জন্য প্রস্তুতি রাখছেন মার্কিন সেনারা। সিএনএনের খবরে জানানো হয়, গত শনিবার ট্রাম্প তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকের এক দিন পরই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরানকে ‘দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে তাদের কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না’।

গত রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তাদের খুব দ্রুত এগোতে হবে। না হলে তাদের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’

ইরানের পক্ষ থেকে এখনো এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি যে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা পিছু হটতে প্রস্তুত। ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ দেশটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার অধিকার কোনো দেশেরই নেই - কাতার : বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার অধিকার কোনো দেশেরই নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কাতার। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি এক বিবৃতিতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশই কোনো পরিস্থিতিতেই এই কৌশলগত জলপথে অন্যান্য দেশের প্রবেশাধিকার বা নৌচলাচলকে ‘অবরুদ্ধ’ করতে পারে না।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যে এই অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে রেখে কাতারের পক্ষ থেকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো। সম্প্রতি কাতার থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দুটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে বলে জানা গেছে। তবে এই দুটি ট্যাংকার পার হওয়ার অর্থ এই নয় যে ওই রুটে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কাতার স্পষ্ট করেছে যে সামগ্রিক বাণিজ্যিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে এখনও সময় লাগবে।

বিশ্বের মোট খনিজ তেলের সিংহভাগ এবং কাতারের মতো বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলোর এলএনজি সরবরাহের প্রধান পথ হলো এই হরমুজ প্রণালি। সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনার কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, কাতারের এই বিবৃতি তাকে কেন্দ্র করেই বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিল।

ইরান যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমছে মার্কিনিদের : ইরান যুদ্ধ এবং ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা— দু’টোর প্রতিই মার্কিন জনগণের সমর্থন কমে যাচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এবং সিয়েনা কলেজ পরিচালিত এক নতুন জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এক প্রতিবেদনে মিডল ইস্ট আই বলছে, ১ হাজার ৫০৭ জন নিবন্ধিত ভোটারের ওপর পরিচালিত এই জরিপে মাত্র ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে ৬৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এই যুদ্ধের বিরোধীতা করে। জরিপে আরও দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ মানুষ ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিপক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে, ৩৭ শতাংশ এ সহায়তার পক্ষে রয়েছেন। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির পরিচালিত এক জরিপে দেখা গিয়েছিল, গাজা যুদ্ধের শুরুর দিকে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তা ইসরাইলকে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন ৫১ শতাংশেরও বেশি মার্কিন ভোটার।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত