ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আকারে রেকর্ড, ঘাটতিতেও রেকর্ড

আকারে রেকর্ড, ঘাটতিতেও রেকর্ড

দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্রান্তিকালে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থনৈতিক খাতে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন তিনি। বাস্তবায়নের এক বিরাট চ্যালেঞ্জ নিয়েই অর্থমন্ত্রী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট ঘোষণা করতে পারেন।

অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে, এই বাজেট আকারের দিক থেকে যেমন একটি রেকর্ড, তেমনি ঘাটতিতেও একটি রেকর্ড। বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। আর এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি থাকবে জিডিপির ৪ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম হতে পারে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : সবার জন্য উন্নয়ন’ অথবা ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিভাগ থেকে মোট ছয়টি নামের প্রস্তাব করা হয়েছিল। নামগুলোর মধ্যে ছিল—‘অর্থনীতির বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’, ‘মানবিক, কল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী দেশ, কর্মসংস্থান, সুশাসন, সমতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘বৈষম্যহীন, টেকসই ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার প্রত্যয়’। শেষ শিরোনামটি ছিল ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’। অর্থমন্ত্রী এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নেবেন।

সূত্র জানায়, এবারের বাজেটে সরকারের মূল দৃষ্টি থাকবে ডি-রেগুলেশন এবং সৃজনশীল অর্থনীতি দিয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের রূপরেখা বাস্তবায়নে। পাশাপাশি দারিদ্র্য নিরসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাজেটে বিশেষ দৃষ্টি থাকবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এসব খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বাজেটে।

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক খাতের দুঃশাসনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরবেন। বক্তৃতার একটি জায়গায় বলা হয়েছে, ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেখে গিয়েছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের সময় ৩০ জুন ২০২৪ সালে তা ছয় গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাখা ৬৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ প্রায় ১৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায়। সরকারের সুদ ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সুদ পরিশোধ ছিল মাত্র ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এনবিআর থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির তুলনায় ৭০ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ২ লাখ কোটি টাকা করা হয়েছে।

উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা দেশীয় উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে। এছাড়া অনুদান হিসেবে ৫ হাজার কোটি টাকা পাওয়ার আশা করছে সরকার।

আয় ও ব্যয়ের এই কাঠামোর ভিত্তিতে আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বেশি।

বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ লাখ ৪৪ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা, যা সংশোধন করে ৬১ লাখ ২১ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ।

বাজেটে দাম কমতে ও বাড়তে পারে যেসব পণ্যের : প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিপণ্যে কর-শুল্ক কমানোর প্রস্তাব এসেছে, ফলে এসব পণ্যের দাম কমতে পারে। অন্যদিকে সিগারেট, বিলাসবহুল গাড়ি ও আমদানি করা কাজুবাদামসহ কিছু পণ্যে করভার বাড়ানো হয়েছে, যা দাম বৃদ্ধির কারণ হতে পারে। ফলে কোন পণ্যে মিলবে স্বস্তি আর কোন খাতে বাড়বে খরচ- সেটিই এখন ভোক্তাদের প্রধান আগ্রহের বিষয়।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও কর্মসংস্থান সংকটের মধ্যে দেশের মানুষ যখন স্বস্তির অপেক্ষায়, তখন আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসাসামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য ও পরিবেশবান্ধব খাতে খরচ কমে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যে করভার বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো এবং বিনিয়োগে উৎসাহিত করা। তবে একই সময়ে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা বেশি।

৬০ পণ্যে কমছে উৎসে কর : প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বড় স্বস্তি আসতে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগিসহ প্রায় ৬০টি কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এসব পণ্যের ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কও প্রত্যাহারের পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বাজারে এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যয় কমে দাম কিছুটা সহনীয় হতে পারে।

শিশুখাদ্য ও আমদানি পণ্যে করছাড় : শিশুখাদ্য প্রস্তুতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া সব ধরনের মসলা ও খেজুর আমদানির ওপর থাকা ৫ শতাংশ রেগুলেটরি ডিউটি প্রত্যাহার করা হলে এসব পণ্যের দামও কমতে পারে।

শিল্প খাতেও বড় ধরনের কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হচ্ছে। নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কের স্তরও কমিয়ে আনা হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং শিল্পপণ্যের মূল্যও কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

ভোজ্যতেল খাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। দেশীয় তৈলবীজ ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আগামী ১০ বছর করমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হতে পারে। এর ফলে সরিষার তেলসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভোজ্যতেলের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমার সম্ভাবনা : স্বাস্থ্য খাতে একাধিক করছাড়ের প্রস্তাবে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমতে পারে। কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে অগ্রিম কর প্রত্যাহার করা হলে প্রতিটি ডায়ালাইসিসে প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ উৎপাদনের ৬৮টি কাঁচামালে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, ক্যানসারের ওষুধের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে কর রেয়াত এবং হার্টের রিং ও চোখের লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট তুলে দেওয়ার প্রস্তাব চিকিৎসাসেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে পারে। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয়করও ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।

প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে স্বস্তি : প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতেও বড় ধরনের স্বস্তি আসতে পারে। স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনের ২২টি কাঁচামালের ওপর অগ্রিম কর কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে। মোবাইল সিমে ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট বাতিল করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে নতুন সিমের দাম কমতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) রেভিনিউ শেয়ার ও লাইসেন্স ফির ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবায় উৎসে কর ১২ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামানো হলে টেলিকম খাতের ব্যয় কমবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ওপর উৎসে কর ৪ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নামানো হচ্ছে। রিফাইনারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে উৎসে কর ১ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে কমানো হবে। এতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শূন্য শতাংশ করহার এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর অব্যাহতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, চার্জিং স্টেশন, ই-বাইক, ব্যাটারি এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনেও ব্যাপক কর রেয়াত দেওয়া হচ্ছে।

সোনা ও স্বর্ণালংকার খাতে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তনের ফলে সোনার ব্যবসা আরও আনুষ্ঠানিক খাতে আসবে এবং বাজারে দামের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্ল্যাশ মেমোরি, মনিটরসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্যের আমদানিতে অগ্রিম কর কমানো হচ্ছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, এসি, ওয়াশিং মেশিন, সিসিটিভি ক্যামেরা ও কম্পিউটার উৎপাদনে কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিলাসবহুল ও ক্ষতিকর পণ্যে কর বৃদ্ধি : তবে সব পণ্যের দাম কমবে না। স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যে করভার বাড়ানো হচ্ছে। আগামী বাজেটে সিগারেটের চারটি স্তরেই দাম বাড়ানো হচ্ছে। নিম্নস্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৯২ টাকা, উচ্চস্তরের ১৬০ টাকা এবং অতি-উচ্চ স্তরের ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর ওপরও উচ্চ হারে সম্পূরক শুল্ক ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করা হচ্ছে।

আমদানি নির্ভর কিছু পণ্যে বাড়তি চাপ : দেশীয় উৎপাদকদের সুরক্ষায় কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে আমদানি করা কাজুবাদামের দাম বাড়তে পারে।

বিলাসবহুল পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলচালিত গাড়ির করভারও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার গাড়ির করহার বৃদ্ধি ও অগ্রিম আয়কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশীয় মদের উৎপাদন পর্যায়ে প্রতি লিটারে ৫০০ টাকা সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে।

এছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিক শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে। বর্তমানে ইভির ক্ষেত্রে কর ভার প্রায় ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব আসতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। সেটিও কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

এছাড়া রড ও ইস্পাতজাত কিছু পণ্যে নির্দিষ্ট ভ্যাট বাড়ানো, আমদানি করা পাঙাশ ফিশ ফিলেটে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ, হেলিকপ্টারের ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়কর এবং জুয়ার আয়ের ওপর করহার ২০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাবও রয়েছে।

স্বাস্থ্যে বাড়তি বরাদ্দ, চিকিৎসার চিত্র বদলাবে কতটা : সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপণ্য, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের করছাড় দেওয়া হলেও রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য সংগতি রেখে বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে এনবিআরের কাঁধে তুলে দেওয়া হতে পারে ৬ লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের চাপ। বিগত অর্থবছরের অর্জন ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় যা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ এখন কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ কারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার একটা চাহিদা আছে। আর এই কারণেই সম্ভবত সরকার বিভিন্ন রকমের শুল্ক-কর ছাড়ের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। যদিও শুধু শুল্ক-কর ছাড়ই বিনিয়োগ বাড়ানোর একমাত্র নির্ণায়ক নয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকের সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহ, জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখা, লাইসেন্স ও নিবন্ধন পাওয়ার বিষয়গুলো সহজ করে বিনিয়োগ প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত