ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ঢাকার শব্দদূষণের মাত্রা জরিপ

সামগ্রিকভাবে কমলেও বেড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়

সামগ্রিকভাবে কমলেও বেড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়

ঢাকার ৭০টি স্থানে পরিবেশগত শব্দদূষণের মাত্রা নিয়ে পরিচালিত একটি বিশদ তুলনামূলক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় সামগ্রিক শব্দদূষণের মাত্রা কমলেও হাসপাতাল, প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং আবাসিক এলাকাসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানের আশপাশে শব্দদূষণ বেড়েছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত পরিবেশ অধিদপ্তরের ‘৬৪ জেলা শহরে শব্দের মাত্রা পরিমাপ’ শীর্ষক জরিপে ২০১৬-১৭ সালের প্রাথমিক তথ্যের সঙ্গে ২০২২-২৩ সালে সংগৃহীত তথ্যের তুলনা করা হয়েছে। এতে শব্দের মাত্রা পাঁচ ধরনের ভূমি ব্যবহারের এলাকার- নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্পাঞ্চল- ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।

জরিপের ফলাফলে শব্দদূষণের ক্ষেত্রে একটি মিশ্র প্রবণতা উঠে এসেছে। ব্যাপক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নগর কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে রাজধানীর বিস্তৃত এলাকার গড় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শব্দের মাত্রা কমেছে। তবে বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে এবং সেখানে শব্দের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

রোগীদের জন্য শব্দের চাপ কমানো এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্ধারিত নীরব এলাকাগুলোতেও স্থানীয়ভাবে শব্দের মাত্রা বেড়েছে। বাংলাদেশ সচিবালয় এলাকায় সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ১২৬.৫ ডেসিবেল এবং সর্বনিম্ন বা প্রাথমিক শব্দের মাত্রা ৭২.১ ডেসিবেলে পৌঁছেছে।

এ ছাড়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে সর্বনিম্ন শব্দের মাত্রা, অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত শান্ত সময়ে বিরাজমান স্থায়ী পটভূমিগত শব্দ, উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব এলাকার মধ্যে রয়েছে মুগদাপাড়া জেনারেল হাসপাতাল, শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও জাতীয় হৃদরোগ ফাউন্ডেশনের মধ্যবর্তী করিডোর এবং পিজি হাসপাতাল ও বারডেম হাসপাতালের মধ্যবর্তী ব্যস্ত এলাকা।

পরিবেশ অধিদপ্তরের (ঢাকা মহানগর) পরিচালক ও প্রকল্প পরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, তুলনামূলক ফলাফলে দেখা গেছে, নীরব এলাকার বাংলাদেশ সচিবালয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা আগের জরিপের তুলনায় বেশি। তিনি বলেন, নীরব এলাকার অধিকাংশ স্থানে সর্বনিম্ন শব্দের মাত্রা আগের জরিপের তুলনায় কমেছে। তবে শিশু ইনস্টিটিউট ও হৃদরোগ ফাউন্ডেশনের মধ্যবর্তী এলাকা, বাংলাদেশ সচিবালয় এলাকা, মুগদাপাড়া জেনারেল হাসপাতাল এলাকা এবং পিজি ও বারডেম হাসপাতালের মধ্যবর্তী এলাকায় সর্বনিম্ন শব্দের মাত্রা আগের জরিপের তুলনায় বেড়েছে।

অনুমোদিত শব্দের মাত্রা : পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনুমোদিত শব্দসীমা হলো- নীরব এলাকা : দিনে ৫০ ডেসিবেল এবং রাতে ৪০ ডেসিবেল। আবাসিক এলাকা : দিনে ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল। মিশ্র এলাকা (আবাসিক/বাণিজ্যিক/শিল্প) : দিনে ৬০ ডেসিবেল এবং রাতে ৫০ ডেসিবেল।

বাণিজ্যিক এলাকা : দিনে ৭০ ডেসিবেল এবং রাতে ৬০ ডেসিবেল। শিল্প এলাকা : দিনে ৭৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৭০ ডেসিবেল।

আবাসিক এলাকায় বাড়ছে পটভূমিগত শব্দ : নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য জরিপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঢাকার পুরোনো ও প্রতিষ্ঠিত আবাসিক এলাকাগুলোতে সর্বনিম্ন পটভূমিগত শব্দের ব্যাপক বৃদ্ধি। ব্যস্ত সময়ের বাইরে তুলনামূলক শান্ত সময়েও রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকায় স্থায়ী শব্দের মাত্রা ছয় বছর আগের তুলনায় বেশি। যেসব এলাকায় পটভূমিগত শব্দ বেড়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি রোড-৫, লালমাটিয়া, গুলশান রোড-১০১, খিলগাঁও, শাহজাহানপুর এবং শাহবাগের ইস্কাটন। এ ছাড়া লালবাগের রাজা শ্রীনাথ স্ট্রিট এবং যাত্রাবাড়ীর ধলপুর রোড এলাকার মতো পুরোনো আবাসিক এলাকাগুলোতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ উভয় ধরনের শব্দের মাত্রাই বেড়েছে।

বাণিজ্যিক ও মিশ্র এলাকায় শব্দের প্রবণতা : মিশ্র ব্যবহারের এলাকাগুলোতে বড় বড় যানজটপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্রে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা বেড়েছে। উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক গোলচত্বর, শংকর, ধানমন্ডি এবং শ্যামলী মোড়। ভারী বাণিজ্যিক যান চলাচলের কেন্দ্রগুলোতেও স্থায়ী পটভূমিগত শব্দের মাত্রার অবনতি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইংলিশ রোড, নবাবপুর, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও শান্তিনগর।

জরিপে দেখা গেছে, ৬৪ জেলা শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ১২৯.৪ ডেসিবেল রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকার মিশ্র এলাকার যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক গোলচত্বরে। বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতে সাধারণভাবে গড় শব্দের মাত্রা কমেছে। তবে এর ব্যতিক্রম কাকরাইল, যেখানে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা বেড়েছে। একই সঙ্গে মতিঝিলের শাপলা চত্বর, কাকরাইল, বাংলামোটর বিপি এলাকার সামনের অংশ এবং মিরপুরের বেনারসি পল্লিতে পটভূমিগত শব্দের মাত্রার অবনতি হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলে মিশ্র চিত্র : শিল্প এলাকাগুলোতেও মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। পল্লবীর সিরামিক রোড এলাকা এবং সাতরাস্তা গোলচত্বরে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা বেড়েছে। অন্যদিকে পুরোনো শিল্পাঞ্চল হাজারীবাগে শব্দের মাত্রা কমেছে। তেজগাঁওয়ের ওরিয়ন গ্রুপ এলাকা আগের তুলনায় কম সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা রেকর্ড করলেও সেখানে সর্বনিম্ন পটভূমিগত শব্দের মাত্রা বেড়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিপের তথ্য এলাকাভিত্তিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি তুলে ধরেছে। নগরজুড়ে গড় শব্দের মাত্রা কমলেও হাসপাতাল ও আবাসিক এলাকাগুলোকে শব্দদূষণ থেকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, স্পর্শকাতর নগরকেন্দ্রগুলোর আশপাশে লক্ষ্যভিত্তিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, অপ্রয়োজনে হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ট্রাফিক চলাচলের নতুন রুট নির্ধারণ এখন জরুরি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত