ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি

গুলিবিদ্ধ ফারহানকে রিকশায় তুলতেই ছাড়ল শেষ নিঃশ্বাস

গুলিবিদ্ধ ফারহানকে রিকশায় তুলতেই ছাড়ল শেষ নিঃশ্বাস

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে আন্দোলন চলাকালে গুলিবিদ্ধ রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজকে কোলে করে রিকশায় তুলেছিলেন সাইদ হোসেন। তবে রিকশায় তোলার সময় ফারহান একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়েন। তখনই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা সাইদের। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে এসব বর্ণনা দেন এই প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার ৬ নম্বর সাক্ষী।

মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে সাইদ হোসেনের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ২৫ বছর বয়সী সাইদের বসবাস মোহাম্মদপুরে। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। জবানবন্দিতে সাইদ বলেন, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টায় ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের রাপা প্লাজার সামনে জড়ো হই। আগের দিন আমাদের মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে এখানে জড়ো হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে গিয়ে দেখি বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রছাত্রী জড়ো হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছেন। আমি তাদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগদান করি। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে থাকি। হঠাৎ আমাদের ওপর অতর্কিতভাবে গুলি করে ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশ সদস্যরা। আমরা আত্মরক্ষার্থে বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নেই। গুলি থামলে আবারও রাস্তায় নেমে আসি। ফের গুলি ছোড়া হলে আমরা গলিতে গিয়ে অবস্থান নিই। এভাবে তিন ঘণ্টা চলতে থাকে।

তিনি বলেন, দুপুর দুইটা-আড়াইটার দিকে আমার সামনে একটি ছেলে ঘুরে পড়ে যান। আমিসহ আরও আন্দোলনকারীরা তাকে একটি গলিতে নিয়ে যাই। হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশে তাকে কোলে করে একটি রিকশায় তোলা হয়। একটু সামনে গিয়ে কয়েকজন আন্দোলনকারীর সহযোগিতায় একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দেই। এরপর পুনরায় আন্দোলনে যোগ দেই। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ওই ছেলেটির নাম ফারহান ফাইয়াজ। রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। ফারহানের বাবার কাছ থেকে শুনতে পেয়েছিলাম যে, তার বুকের বাঁ পাশে গুলি লেগেছিল। তবে আমি ফারহানকে যখন রিকশায় তুলি, তখন একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়েন তিনি। সম্ভবত তখনই মারা গেছেন।

সাক্ষী জানান, পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া ও পত্রপত্রিকার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানকদের নির্দেশনায় ডিএমপি কমিশনার হাবিব, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার এবং এডিসি রৌশানুল হক সৈকতদের সহায়তায় যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী এমএ সাত্তার, বজলুর রহমান, রানা, আদাবরের তুহিন, মোহাম্মদপুরের তুহিন, রাষ্ট্রন, আসিফ আহমেদ, মাসুদ, ইসমাইল, বিচ্ছু জালাল, মোল্লা রুবেল, সাজ্জাদ, রাসেল, ফজলে রাব্বি, এপিএস বিপ্লব, ইউনুস, রাজিবসহ আরও অনেক সন্ত্রাসী ফারহান ফাইয়াজসহ অন্যান্য শহীদের মৃত্যুর জন্য দায়ী। ভিডিওতে দেখা গেছে যে, তারা প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি করেছে। একইভাবে ১৮ জুলাই যাত্রাবাড়ী, মিরপুরসহ ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় অসংখ্য মানুষ পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে নিহত এবং আহত হয়েছেন।

এ সময় এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার চেয়েছেন সাইদ হোসেন। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করেন গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও তারেক আবদুল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদার, মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

এ মামলায় মোট ২৮ আসামি। এর মধ্যে গ্রেপ্তার চারজন হলেন- নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগ কর্মী ফজলে রাব্বি।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত