ঢাকা শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

ফিরছে গ্রাম সরকার

ফিরছে গ্রাম সরকার

গ্রাম পর্যায়ে সন্ত্রাস, চুরি, মাদক, জুয়া ও নারী-শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখতে আবারও চালু হতে যাচ্ছে 'গ্রাম সরকার'। এ লক্ষ্যে 'গ্রাম সরকার আইন, ২০২৬'-এর খসড়া তৈরি করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত আইনে ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৫ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, যুব প্রতিনিধি, পল্লী চিকিৎসক, নিকাহ রেজিস্ট্রার, সমবায় সমিতির সদস্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধিরাও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

খসড়া অনুযায়ী, গ্রাম সরকার শুধু গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। গ্রামে অপরাধ সংঘটনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা, অপরাধ প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রতিবেদন দেওয়াও হবে এর অন্যতম দায়িত্ব। পাশাপাশি শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন, কৃষি উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয়েও কাজ করবে প্রস্তাবিত এই স্থানীয় সংগঠন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে গ্রাম সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরে ২০০৩ সালে এ-সংক্রান্ত আইন করা হয়। তবে সেই আইনও পরবর্তী সময়ে বাতিল হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর নতুন আইনের মাধ্যমে গ্রাম সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ খসড়াটি তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের মতামত চেয়েছে।

গত ৬ অক্টোবর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকেও গ্রাম সরকার পুনর্বহালের প্রস্তাব তোলেন কেউ কেউ। তবে বিষয়টি পরবর্তী বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রাখার জন্য বলা হয়। ফলে গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ এখনো প্রস্তাব ও খসড়া আইন প্রণয়নের পর্যায়ে রয়েছে। আইনটি চূড়ান্ত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই এর বাস্তবায়ন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে।

প্রতি ওয়ার্ডে ১৭ জনের কাঠামো

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে গ্রাম সরকার থাকবে। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের নামের সঙ্গে ওয়ার্ড নম্বর যুক্ত করে এর নামকরণ করা হবে। গ্রাম সরকার হবে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। আইনের বিধান সাপেক্ষে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন, অধিকারে রাখা এবং হস্তান্তরের ক্ষমতাও থাকবে এর। গ্রাম সরকারের প্রধান হবেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। উপদেষ্টা হিসেবে থাকবেন ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য। আর ১৫ সদস্যের মধ্যে থাকবেন দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর দুইজন প্রতিনিধি—একজন পুরুষ ও একজন নারী, দুইজন কৃষক, একজন নিকাহ রেজিস্ট্রার, একজন সমবায় সমিতির সদস্য, একজন পল্লী চিকিৎসক, একজন শিক্ষক, একজন ব্যবসায়ী, একজন পেশাজীবী, একজন শ্রমিক, একজন যুব প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্য— যদি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে এমন জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকেন।

অর্থাৎ প্রধান ও উপদেষ্টাসহ একটি গ্রাম সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামোতে মোট ১৭ জন থাকবেন। কোনো এক বা একাধিক শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধি পাওয়া না গেলে গণ্যমান্য ব্যক্তি বা সমাজসেবকের সংখ্যা বাড়িয়ে সেই ঘাটতি পূরণের বিধান রাখা হয়েছে। সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রস্তাব রয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে— এমন ভোটারদের কমপক্ষে ১০ শতাংশের উপস্থিতিতে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে হ্যাঁ-না ভোটের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচন করা হবে। তবে এ নির্বাচনপদ্ধতি বাস্তবে কীভাবে পরিচালিত হবে, তা আইনের চূড়ান্ত বিধান ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার ওপর নির্ভর করবে।

গ্রাম সরকারের মেয়াদ হবে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর। প্রধান, উপদেষ্টা ও প্রত্যেক সদস্য দায়িত্ব গ্রহণের আগে পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের সামনে শপথ নেবেন। গ্রাম সরকার গঠনের ৩০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়।

অপরাধ প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ

প্রস্তাবিত গ্রাম সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে গ্রাম পর্যায়ে অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক উদ্যোগ গড়ে তোলা। নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি, মাদক এবং যেকোনো ধরনের জুয়াসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে খসড়ায়। একই সঙ্গে এসব অপরাধ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিস্থিতি নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন দিতে হবে। গ্রামে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে গ্রাম সরকার। স্থানীয় পর্যায়ের বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নিতে পারবে তারা। এ ক্ষেত্রে গ্রাম সরকারের লিখিত সিদ্ধান্ত আইনানুগ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করতে পারবে বলে খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে। তবে এ দায়িত্ব পালনের অর্থ প্রচলিত আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কোনো বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা নয়; কার্যক্রমের সীমা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী।

গ্রামীণ জনপদে ছোটখাটো বিরোধ, সামাজিক বিরোধ এবং বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অপরাধের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত আইনে। তবে এসব দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে গ্রাম সরকারের সদস্যদের ভূমিকা, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় এবং অপরাধ প্রতিরোধে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণের ওপর।

উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রকল্প তদারকি

অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নেও দায়িত্ব পালন করবে গ্রাম সরকার। গ্রামের রাস্তাঘাট, কালভার্টসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে তারা। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি এবং আর্থিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে ইউনিয়ন পরিষদকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে।

শিক্ষা বিস্তার ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রসারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করবে গ্রাম সরকার। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে খসড়ায়। একইভাবে পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, টিকাদান কর্মসূচি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করবে এই সংগঠন। বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে গ্রাম সরকার। প্রয়োজনে নিজস্ব তত্ত্বাবধানেও এ-সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিতে পারবে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে নিয়োজিত কর্মচারীদের কাজের বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিবেদন দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।

কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রেও গ্রাম সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সার, উন্নতমানের বীজ ও কীটনাশকের সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজ রাখবে তারা। এসব উপকরণের সংকট দেখা দিলে তা দ্রুত ইউনিয়ন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্ব

গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সমবায় সমিতি গঠন, ক্ষুদ্র শিল্প স্থাপন, হাঁস-মুরগির খামার, মৎস্য চাষ ও পশুপালনের মতো উদ্যোগে মানুষকে উৎসাহিত করার দায়িত্বও থাকবে গ্রাম সরকারের। স্থানীয় পর্যায়ে আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের প্রসার এবং গ্রামীণ মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে এসব উদ্যোগ সহায়ক হবে বলে খসড়ায় বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ, খাল খনন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণী সংরক্ষণে জনগণকে উৎসাহিত করবে গ্রাম সরকার। নারী, যুবক, তরুণ, প্রবীণ ও শিশুসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত কাঠামোতে গ্রাম সরকারকে ইউনিয়ন পরিষদের সহায়ক সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে খসড়ায় স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত প্রশাসনিক একাংশ হিসেবে গণ্য হবে না। অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করলেও এর আইনগত অবস্থান ও ক্ষমতার পরিধি নির্ধারিত হবে প্রস্তাবিত আইনের বিধান অনুসারে।

সদস্য হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা

খসড়ায় গ্রাম সরকারের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব, বসবাস, ভোটার তালিকায় নাম থাকা এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতার বিষয়ে কিছু শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করলে বা হারালে কেউ সদস্য হতে পারবেন না। কোনো আদালত কাউকে অপ্রকৃতিস্ত ঘোষণা করলেও তিনি সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের আঞ্চলিক এলাকার বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য চলে গেলেও সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকবে না।

নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আদালতের রায়ে কমপক্ষে এক বছরের কারাদণ্ড হলে এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সদস্য হতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম না থাকলেও সদস্য হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়া বা থাকা এবং কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় অনাদায়ী থাকাও সদস্য হওয়ার অযোগ্যতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দায়িত্বে অবহেলা করলে অপসারণ

গ্রাম সরকারের সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতেও বিধান রাখা হয়েছে খসড়ায়। যথাযথ তদন্তের পর নির্ধারিত কারণে কোনো সদস্যকে পদ থেকে অপসারণ করা যাবে। যথোপযুক্ত কারণ ছাড়া পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকলে, শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে কিংবা দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানালে সদস্যকে অপসারণের সুযোগ থাকবে। অসদাচরণের দায়ে দোষী হওয়া বা সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারালেও অপসারণ করা যাবে। খসড়ায় অসদাচরণ বলতে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও নৈতিক স্খলনকে বোঝানো হয়েছে।

প্রতিটি গ্রাম সরকারের জন্য 'গ্রাম সরকার তহবিল' নামে একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া অর্থ এবং অন্য উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এ তহবিলে জমা হবে। তবে তহবিলের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চূড়ান্ত আইনে কী ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ব্যবস্থা থাকবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তদন্ত করে বাতিল করতে পারবেন জেলা প্রশাসক

গ্রাম সরকারের কার্যক্রমের ওপর প্রশাসনিক তদারকির ক্ষমতাও রাখা হয়েছে খসড়ায়। জেলা প্রশাসক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, পরিদর্শনকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী অথবা কোনো ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে গ্রাম সরকারের কার্যাবলি তদন্তের জন্য কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিতে পারবেন। তদন্তে যদি দেখা যায়, কোনো গ্রাম সরকার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বা ধারাবাহিকভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে, প্রশাসনিক ও আর্থিক দায়িত্ব পালনে অক্ষম, জনস্বার্থবিরোধী কাজ করছে কিংবা ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন বা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, তাহলে জেলা প্রশাসক সেটি বাতিল ঘোষণা করতে পারবেন। তবে বাতিলের আদেশ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাম সরকারকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হবে।

গ্রাম সরকার বাতিল হলে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের গঠিত এডহক কমিটি দায়িত্ব পালন করবে। ওয়ার্ডের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে— এমন ভোটারদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে। প্রথমবার গ্রাম সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে তারিখ নির্ধারণ করবে। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ১৮০ দিনের মধ্যে নতুন গ্রাম সরকার গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। আর গ্রাম সরকার বাতিল হলে বাতিলাদেশ জারির পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে।

গ্রাম সরকারের কার্যালয় ওয়ার্ডের মধ্যবর্তী স্থানে অথবা হাটবাজার কিংবা গ্রোথ সেন্টার এলাকায় স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ গ্রাম সরকার প্রধানের সঙ্গে পরামর্শ করে কার্যালয়ের স্থান নির্ধারণ করবে।

পুরোনো ব্যবস্থার নতুন রূপ

২০০৩ সালের রহিত গ্রাম সরকার আইনেও প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন প্রধান, একজন উপদেষ্টা ও ১৩ জন সদস্য নিয়ে গ্রাম সরকার গঠনের কথা ছিল। নারী নির্যাতন, সন্ত্রাস, চুরি ও ডাকাতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা, স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা এবং চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও আর্থিক বিষয় পর্যালোচনার দায়িত্বও ছিল ওই আইনে। নতুন খসড়ায় সদস্যসংখ্যা ১৩ থেকে বাড়িয়ে ১৫ করার পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধ, উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তার মতো দায়িত্বও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে গ্রাম সরকার পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগের বাস্তব সাফল্যনির্ভর করবে এর ক্ষমতা ও দায়িত্বের স্পষ্ট সীমারেখা, ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়, সদস্য নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ওপর। বিশেষ করে অপরাধ প্রতিরোধের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি হবে। খসড়াটি চূড়ান্ত আইন হিসেবে অনুমোদিত হওয়ার আগে এসব বিষয়ে মতামত ও পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত