
এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী নাভানেথাম নাভি পিল্লাই। গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। নরওয়ের নোবেল কমিটি জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাহস ও সততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে কাজ করেছেন নাভি পিল্লাই। দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত এক পরিবারে তার জন্ম। বর্ণবৈষম্যের সময় বেড়ে ওঠা পিল্লাই আইনজীবী হিসেবে বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই করেন। বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অন্যদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়।
পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্ট, রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করছেন পিল্লাই। আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ও বিস্তারে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক মামলায় তিনি দেখিয়েছেন, আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতেও ভূমিকা রেখেছেন তিনি। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ওই মামলায় প্রথমবারের মতো শুধু প্রচারের মাধ্যমে গণহত্যায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগেও একজন আসামির বিচার হয়। এই আইনি অগ্রগতিতেও তার ভূমিকা ছিল।
নোবেল কমিটি বলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাতের অহিংস সমাধানের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন অপরিহার্য। শান্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা চাপ ও আক্রমণের মুখে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সাহস, দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন নাভি পিল্লাই।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। একইসঙ্গে সহিংসতা ও সংঘাতের শিকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন। ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়েরই আইনের শাসন মেনে চলার দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি বারবার তুলে ধরেছেন। নাভি পিল্লাইয়ের কর্মজীবন আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা ও বিকাশের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়। ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তার অঙ্গীকার আরও শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গড়তে আগ্রহী মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা বলে জানিয়েছে নোবেল কমিটি।
বাসচালকের মেয়ের নোবেল জয় : দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের অন্ধকারে বেড়ে ওঠা এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। বাবা ছিলেন বাসচালক, সংসারে সাত ভাইবোন। সেই পরিবার থেকেই উঠে এসে একদিন বিশ্বমঞ্চে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হয়ে ওঠেন নাভানেথাম নাভি পিল্লাই। রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচার করেছেন, দায়িত্ব পালন করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে। এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। হার্ভার্ড ল বুলেটিন ২০০৬ সালে পিল্লাইকে নিয়ে 'বাসচালকের মেয়ে' শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উঠে এসেছিল দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক মেয়ের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করার গল্প। জাতিসংঘকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে পিল্লাই বলেছিলেন, 'আমরা খুব গরিব পরিবারে বড় হয়েছি। আমার বাবা ছিলেন একজন বাসচালক। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন।' সেই পরিবার থেকে উঠে এসে তিনি কেবল নিজের জীবনের গতিপথই বদলাননি, ভূমিকা রেখেছেন আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু নজির প্রতিষ্ঠায়। তার কর্মজীবনের কেন্দ্রে ছিল একটি প্রশ্ন—ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও কি ভয়াবহ অপরাধের জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তার দীর্ঘ পথচলা।
দারিদ্র্য ও বৈষম্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা
১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানের ক্লেয়ারউডে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। বাসচালক বাবার সাত সন্তানের একজন ছিলেন তিনি। তার শৈশব কেটেছে এমন এক সমাজে, যেখানে মানুষের অধিকার, চলাফেরা, শিক্ষা ও জীবনের সুযোগ অনেকাংশেই নির্ধারিত হতো গায়ের রং দিয়ে। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় অ্যাপারথেইড বা বর্ণবৈষম্য ছিল রাষ্ট্রীয় নীতি। শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসকগোষ্ঠী কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ মানুষের বসবাস, চলাফেরা, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক অধিকার নিয়ন্ত্রণ করত। ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষেরাও এই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার শিকার হতেন।
এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা পিল্লাইয়ের জন্য আইন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া সহজ ছিল না। কিন্তু পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তার ছাত্রজীবনেই। দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন পিল্লাই। ১৯৬৩ সালে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) এবং ১৯৬৫ সালে ব্যাচেলর অব লজ (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ও উচ্চতর গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি নেন। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গ্রন্থাগারে নুরেমবার্গ বিচারের নথিপত্র পড়েছিলেন পিল্লাই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি নেতাদের বিচারের জন্য এই বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সেই নথিপত্রে তিনি দেখেছিলেন, ভয়াবহ অপরাধের জন্য রাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদেরও বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। এই উপলব্ধি তার চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী জীবনে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুক্ত হন তিনি। তার কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোতে বারবার ফিরে এসেছে সেই একই বিশ্বাস, ক্ষমতার ঊর্ধ্বে কেউ নন।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই
১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে নিজের আইন ব্যবসা শুরু করেন পিল্লাই। সেখানে নিজস্ব আইন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রথম বর্ণগতভাবে নিপীড়িত নারী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি। তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের প্রায়ই গ্রেপ্তার করা হতো। তাদের অনেকের পক্ষে আদালতে দাঁড়ান পিল্লাই। তার মক্কেলদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি তার স্বামীও ছিলেন। সেই সময় নিপীড়িত মানুষের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে কাজ করা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের হয়ে আদালতে দাঁড়ানো মানে ছিল বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। আটক ব্যক্তিদের অধিকার, হেফাজতে নির্যাতন এবং আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে কাজ করেন তিনি।
১৯৭৩ সালে রাজনৈতিক বন্দিদের আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সাফল্য অর্জন করেন পিল্লাই। তবে আইন পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করেও বর্ণবৈষম্যের কারণে বিচারকের কক্ষে প্রবেশের সুযোগ পর্যন্ত পাননি তিনি। বৈষম্যমূলক সেই ব্যবস্থার মধ্যেই একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক হন পিল্লাই। যে ব্যবস্থার কারণে তাকে পেশাগত জীবনে বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন তিনি।
হার্ভার্ড থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে
নিজের দেশে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান পিল্লাই। সেখানে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ১৯৮৮ সালে আইন বিষয়ে উচ্চতর গবেষণাভিত্তিক ডিগ্রি অর্জন করেন। হার্ভার্ডে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা তার কাজের পরিসর আরও বিস্তৃত করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলো প্রয়োগের সুযোগ পান তিনি। বিশেষ করে নারীর অধিকার রক্ষার বিষয়টি তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। পরে জেসিকা নিউওয়ার্থের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নারী অধিকার সংগঠন 'ইকুয়ালিটি নাউ' প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন পিল্লাই। সংগঠনটির লক্ষ্য ছিল আইন ও নীতির মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্যদূর করা এবং সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন তিনি। একই বছর জাতিসংঘের রুয়ান্ডাবিষয়ক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক নির্বাচিত হন। এর মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করে। এবার আর শুধু একটি দেশের বিচারব্যবস্থা নয়, গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয় তাকে।