
ব্যাংক ঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। একই সঙ্গে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সংস্থাটি। তবে বিদ্যমান ভর্তুকির পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পণ্য কেনার খরচ, ব্যাংক ঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফয়সল আজাদ বলেন, 'চলতি অর্থবছরে আমরা ভর্তুকির ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছি। তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে সংস্থার মোট ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিসিবির ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পণ্য কেনা ও বিক্রির দামের পার্থক্য এবং ব্যাংক ঋণের সুদ— ভর্তুকির বড় দুটি উৎস।
টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, 'টিসিবির মূল সমস্যা হলো, যে দামে পণ্য কেনা হয়, সেই দামের চেয়ে অনেক কম দামে তা বিক্রি করতে হয়। কিছু পণ্য কেনা দামের তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ভোজ্যতেলে ভর্তুকির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।'
২০২২ সাল থেকে টিসিবি প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। অথচ বর্তমানে ডিলার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়সহ প্রতি লিটার তেল কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। ব্যাংক ঋণের সুদ যোগ করলে এ খরচ প্রায় ২০০ টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংক ঋণের সুদ কমাতে টিসিবি এখন ঋণপত্র (এলসি) ও ঋণপত্রের বিপরীতে ঋণ (এলটিআর) সুবিধার পরিবর্তে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কিনছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংক ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে নগদ অর্থে চিনি ও মসুর ডাল কেনায় এলসি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় কমেছে প্রায় ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, সংস্থাটির বার্ষিক ব্যাংক ঋণের সুদ ব্যয় বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। এ ব্যয় থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ফয়সল আজাদ বলেন, 'আমরা ঋণপত্র (এলসি) এবং ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা কমাচ্ছি। যেখানে সম্ভব, নগদ অর্থে পণ্য কেনা হচ্ছে।' এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কম সুদে ঋণসুবিধা পাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলা ও এলটিআর সুবিধা নেওয়া শুরু করেছে টিসিবি।
বিক্রির অর্থ দ্রুত সংস্থার ব্যাংক হিসাবে জমা নিশ্চিত করতে একটি অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) চালু করেছে টিসিবি। আগে এ অর্থ জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) হিসাবের মাধ্যমে আসত। নতুন ব্যবস্থায় ডিলারদের কাছ থেকে বিক্রির অর্থ দ্রুত টিসিবির হিসাবে জমা হবে। এতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর না করে নগদে পণ্য কেনা সহজ হবে। ভর্তুকির বাইরেও আয় বাড়াতে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে এনেছে টিসিবি।