
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার 'হাইব্রিড হামলার' হুমকি সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষা শিল্প-সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো সুরক্ষার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এলিসি প্রাসাদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রোঁ বলেন, গত কয়েক সপ্তাহে ফ্রান্স রাশিয়ার একাধিক হাইব্রিড হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং এসব কর্মকাণ্ড 'পাল্টা জবাব ছাড়াই' ছেড়ে দেওয়া হবে না। হাইব্রিড হামলা বলতে সাধারণত সামরিক আক্রমণের বাইরে সাইবার হামলা, নাশকতা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার বা অন্যান্য গোপন কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়, যার উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা ও অস্থিতিশীল করা।
ইউরোপের বিভিন্ন নেতা সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান কতটা দৃঢ়, তা পরীক্ষা করতে রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিতে পারে। ম্যাক্রোঁ বলেন, 'সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপীয় দেশগুলো এবং ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হাইব্রিড হুমকি বেড়েছে।
এর উদ্দেশ্য আমাদের ভয় দেখানো এবং ইউক্রেনকে সমর্থনের প্রচেষ্টা দুর্বল করা। কিন্তু এর ফল হবে ঠিক উল্টো। আমরা ভীত নই, কারণ আমরা জানি ইউক্রেনের ভবিষ্যতের সঙ্গে আমাদের নিজেদের নিরাপত্তাও জড়িত।'
তিনি গত মাসে জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার ঘটনা উল্লেখ করেন, যার জন্য জার্মান কর্তৃপক্ষ রাশিয়াকে দায়ী করেছে। পাশাপাশি পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের বক্তব্যও তুলে ধরেন, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন রাশিয়া ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সদস্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছে। টাস্কের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে পরে সেটিকে 'দুর্ঘটনা' বলে দাবি করতে পারে, যাতে জোটের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি হয়।
গত সপ্তাহে ইউক্রেন-পোল্যান্ড সীমান্তের কাছে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে রুশ ড্রোন হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। ইউক্রেন জানিয়েছে, হামলার কয়েক মিনিট আগে ট্রেনের যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া ইতালি থেকে এস্তোনিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিরক্ষা স্থাপনায় রহস্যজনক আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার জন্য কয়েকটি দেশ রাশিয়াকে দায়ী করেছে। তবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার দাবি করেছেন, ইউরোপে হামলার কোনো পরিকল্পনা রাশিয়ার নেই। অন্যদিকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো যদি ইউক্রেনে সেনা পাঠায়, তবে মস্কো সেটিকে যুদ্ধ ঘোষণার সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করবে। তিনি বলেন, 'ইউরোপ যদি রাশিয়ার বিরুদ্ধে হামলা চালায়, তবে সেটি হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের যুদ্ধ এবং তা খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের হবে।'
এদিকে গত শুক্রবার রাশিয়া আবারও যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে বলেছে, ইউক্রেনে থাকা কোনো ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা যদি রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলার কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তা 'বৈধ লক্ষ্যবস্তু' হিসেবে বিবেচিত হবে। রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনকে ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য 'অত্যন্ত সংঘাতমুখী' অবস্থান নিয়েছে এবং এর জবাবে প্রয়োজনীয় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার মস্কোর রয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও কথা বলেন ম্যাক্রোঁ। তিনি জানান, ড্রোন ও সাইবার হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতের সংবেদনশীল স্থাপনাগুলো সুরক্ষার দায়িত্ব সরকারকে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য জি-৭ দেশগুলোর একটি বৈঠক আহ্বানের ঘোষণা দেন তিনি। সেখানে ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে গ্যাসের মজুত এবং কৌশলগত জ্বালানি রিজার্ভ ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা হবে বলে জানান ফরাসি প্রেসিডেন্ট।