
পবিত্র রমজানের ফল থেকে শুরু করে সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে বাজারে। সেই সঙ্গে ইফতারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয় এমন সবজির দামও এখন বাড়তির দিকে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খেজুর, মাল্টা ও আপেলের দাম। পাশাপাশি কলা, বরই, পেঁপে, পেয়ারা, তরমুজসহ দেশীয় ফলেও লেগেছে আগুন। গতকাল শুক্রবার হাতিরপুল, বড় মগবাজার, রামপুরা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায় রোজার দ্বিতীয় দিনেই ফলের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় বেড়েছে। তবে বাড়তি দামে অনেককেই হিসাব কষে কিনতে দেখা গেছে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম স্থিতিশীল রাখা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে রমজান মাসে এ দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন রোজা সামনে রেখে বিশেষ কিছু করার সুযোগ ছিল না। তবে ইতিবাচক দিক হচ্ছে, আমাদের হাতে যে পরিমাণ খাদ্য মজুত রয়েছে, তা বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য পর্যাপ্ত।’
সিলেট নিয়ে পরিকল্পনা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘সিলেটের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা আমি দীর্ঘ নির্বাচনি প্রচারণা ও ইশতেহারে উল্লেখ করেছি। যেসব বিষয় সিলেটবাসীর জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত, সেগুলো বাস্তবায়নে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইটি সংশ্লিষ্ট পেশার প্রসার এবং একটি এআই সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ মন্ত্রী বলেন, আমাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি দিন কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক অবস্থানে এগিয়ে নিতে সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে।
সিলেটের আইটি পার্কে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান তৈরি করতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমানো এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সিলেটে প্রবাসী ও দেশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ নীতি-সহায়তা প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হবে।
গতকাল পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারের কাঁচা বাজারে দেখা গেছে, লেবুর হালি ১০০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৬০ টাকা, ধনে পাতা ৮০ টাকা, বেগুন ১০০ টাকা, শসা ৯০ থেকে ১০০ টাকা, রসুন ১২০ টাকা, আলু ২৫, টমেটো ৬০ টাকা, কাঁচা টমেটো ৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও কাঁচা পেঁপে ৪০ টাকা, সিম ৬০ টাকা, বাঁধাকপি ৪০ টাকা, ফুলকপি ৫০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। আর আদা বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকা কেজিতে।
মুরগি বিক্রেতা খলিল বলেন, রোজার মাসে মুরগির দাম বেড়ে যায়। যে কক মুরগি ২৮০ টাকা করে বিক্রি করতাম তা এখন ৩৪০-৩৮০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। আমাদের বেশি টাকায় কিনতে হয়, এ জন্য বেশি দামে বিক্রি করি।
রায়সাহেব বাজারে মুরগি কিনতে আসা এক শিক্ষার্থী জানান, মুরগির দাম বৃদ্ধি হওয়ায় হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। মেসে থেকে পড়াশোনা করি। হিসাব করে চলতে হয়। এ জন্য দাম বেড়ে গেলে সমস্যায় পড়ি। রায়সাহেব বাজারে গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। রায় সাহেব বাজারের খাসির মাংস বিক্রেতা জানান, দাম নিয়ন্ত্রণেই আছে। রমজানের আগেও ১ হাজার ২০০ করে বিক্রি করতাম। তবে বিভিন্ন বাজারে খাসির মাংস ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ করেও বিক্রি করতে দেখা গেছে।
রমজানে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। সেই খেজুরের দামই এবার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। মানভেদে কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। অনেক দোকানে গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে ১০০ থেকে ১২০ টাকা বেশি দাম চাওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানের খেজুরও এখন মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। ইফতারের প্রধান অনুষঙ্গ হওয়ায় খেজুর কিনতেই হচ্ছে, কিন্তু আগের তুলনায় কম পরিমাণে কিনছেন অনেকেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি ব্যয় ও পাইকারি দামের প্রভাবেই খুচরায় এই মূল্যবৃদ্ধি। ফলে ফলের বাজারে সবচেয়ে চড়া দামের তালিকায় এখন খেজুরই শীর্ষে।
বিদেশি ফলের মধ্যে মাল্টা ও আপেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে মাল্টা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ থেকে ৩৮০ টাকায়, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ২৮০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। আপেল প্রকারভেদে ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ৫০ থেকে ৭০ টাকা বেশি।
ক্রেতারা জানিয়েছেন, সপ্তাহের ব্যবধানে আপেলের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আঙ্গুর ও কমলার দামও ঊর্ধ্বমুখী। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাইকারি বাজারে এক পেটি কমলার দাম কয়েক হাজার টাকা বেড়েছে। ফলে বিদেশি ফলের বাজারে রমজানের শুরুতেই বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দেশীয় ফলের বাজারেও স্বস্তি নেই। কলার ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত। সাগর কলা এখন ডজনে ১৫০ টাকা, যা কয়েকদিন আগেও ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। শবরি কলা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা এবং বাংলা কলা ১০০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা বলছেন, দেশীয় ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কলার দাম। পাশাপাশি বরই কেজিতে ১২০ থেকে ২০০ টাকা, পেয়ারা ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং দেশি পেঁপে ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে এসব ফলের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
তরমুজের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ টাকা চাওয়া হচ্ছে, যা অনেকের কাছে বেশি মনে হচ্ছে। আনারস প্রতিটি ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারা বলছেন, মৌসুমের শুরুতেই এমন দাম অস্বাভাবিক। তবে বিক্রেতাদের দাবি, সরবরাহ সীমিত থাকায় দাম কিছুটা বেশি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রোজার কারণে ফলের চাহিদা বাড়ে, আর নির্বাচনের পর সরবরাহে বিঘ্ন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। পাইকারি বাজার থেকেই ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি দামে ফল কিনতে হচ্ছে। এদিকে বিভিন্ন আড়তে সিন্ডিকেটের অভিযোগও আছে। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, তারা বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করতে পারেন না। তবে ভোক্তাদের মতে, প্রতি বছরই রমজানের আগে বাজার নিয়ন্ত্রণের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কম দেখা যায়। ফলে রোজা এলেই ফলের বাজারে বাড়তি চাপ যেন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রমজানকে ঘিরে চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ও বাজারে অসাধু চক্র সক্রিয় থাকলে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। রমজানের শুরুতেই যখন ফলের দাম এভাবে বেড়েছে, তখন সামনে আরও বাড়বে কি না তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে ক্রেতাদের মধ্যে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অন্তত পবিত্র এই মাসে ফলের বাজার যেন সাধ্যের মধ্যে থাকে। নইলে ইফতারের টেবিলে ফলের বৈচিত্র্য কমে যাবে, বাড়বে কেবল দুশ্চিন্তার ভার।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকার কাজ করছে : পবিত্র রমজান মাসে সাধারণ মানুষের স্বস্তি নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সরকার কাজ করছে। দুধ, ডিম ও মাংস সুলভমূল্যে বিক্রির মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ কমানো হবে। এরই মধ্যে ঢাকায় ২৫টি পয়েন্টে এসব পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। শুক্রবার টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগামীতে জেলা পর্যায়ে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আগামীকাল থেকে জেলা পর্যায়ে পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে সুলভ মূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রয় কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করা হবে। তিনি বলেন, আমার অঙ্গীকার অনুযায়ী, আমি টাঙ্গাইলের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবো। রমজান মাসে যেন দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে ইবাদত করতে পারে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসময় জেলা প্রশাসক শরীফা হকের সভাপতিত্বে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।