ঢাকা শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

জ্বালানি তেলের সংকট চলছেই পাম্পে দীর্ঘ সারি

জ্বালানি তেলের সংকট চলছেই পাম্পে দীর্ঘ সারি

দেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাহিদা অনুযায়ী তেল মিলছে না। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য লাইন দিনভরই থাকছেন চালকরা। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কোনো কোনো ফিলিং স্টেশনে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। আবার কোথাও কোথাও তেল নেই’, মাইকে ঘোষণা করছেন নিরাপত্তাকর্মী। তবু দীর্ঘ লাইন ফিলিং স্টেশনের সামনে রয়ে যান চালকরা। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেল নিতে মোটরসাইকেলের চালকদের ভিড় রয়ে যায়। তেল বিক্রি বন্ধ, তাই ফিলিং স্টেশনে ঢোকার পথ আটকে দেন নিরাপত্তাকর্মীরা। কিছু কিছু ফিলিং স্টেশনে তেল নেই, তাই পাম্পযন্ত্রটি কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আবার কাগজে ‘তেল নেই’ লিখে সেঁটেও দেওয়া হয়েছে। সরবরাহ কম থাকায় ফিলিং স্টেশনে চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে সীমিত পরিমাণে তেল দেওয়া হচ্ছে।

গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ছেলে শাহরিয়ারের চিকিৎসার জন্য রাজধানীর দয়াগঞ্জে যাওয়ার পথে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাইদুর রহমান ও তার পরিবার। বাসা থেকে বের হওয়ার পরই কাছের পাম্পে তেল না পেয়ে তারা ঢাকার দিকে রওনা দেন এই আশায় যে পথে কোথাও তেল পাওয়া যাবে। কিন্তু একের পর এক পাম্পে গিয়ে একই দৃশ্য দেখতে পান—তেল নেই, বিক্রি বন্ধ। শেষ পর্যন্ত সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিজয় সরণির আগে একটি পাম্পে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখে লাইনে দাঁড়িয়ে যান সাইদুর। প্রচণ্ড রোদে তিনি রাস্তায় মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর স্ত্রী নাসিমা সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে ফুটপাতে আশ্রয় নেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়েন সবাই। নাসিমা জানান, ২০১৮ সালে ছেলে শাহরিয়ারের শরীরে ব্ল্যাড ক্যানসার ধরা পড়ে। সেই থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোই তাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। আজও একই কারণে যাওয়া। বাবাকে সাহায্য করতে মাঝে মাঝে মোটরসাইকেল ঠেলেও দেয় ছেলে। দুপুর পর্যন্ত লাইন প্রায় না নড়লেও পরে ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। অবশেষে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুপুর আড়াইটার দিকে তেল পান তারা। এরপর যাত্রাবাড়ী পৌঁছে ক্লান্ত সন্তানদের নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন সাইদুর।

জানা যায়, ওই ফিলিং স্টেশনে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে তেল বিক্রি বন্ধ ছিল। ফলে সকাল থেকেই সেখানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন জাহাঙ্গীর গেট ছাড়িয়ে যায়, আর মোটরসাইকেলের লাইন পৌঁছে যায় অনেক দূর পর্যন্ত। তীব্র গরমে অনেক চালক রাস্তায় গাড়ি রেখে ফুটপাতে ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন। শুধু এই পাম্প নয়, রাজধানীর আরও কয়েকটি পাম্পেও একই অবস্থা দেখা গেছে।

এদিকে, অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ার চালক এনামুল হকও একই সমস্যায় পড়েন। তিনি আগের দিনও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে অল্প তেল নিতে পেরেছিলেন। পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় ট্যাংক ভর্তি করতে পারেননি। আবার লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট হচ্ছে, ফলে আয় কমে যাচ্ছে। তিনি জানান, তেলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে কাজের সময় নষ্ট হওয়ায় সংসারের খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সব মিলিয়ে, হঠাৎ তেলের সংকট ও পাম্প বন্ধ থাকার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

খোলা বাজারে মিলছে জ্বালানি তেল : পাম্পে না মিললেও খোলা বাজারে বাড়তি দামে মিলছে জ্বালানি তেল। সংকটের মধ্যেই চলছে অবৈধ মজুত। আর কালোবাজারে বিক্রি সময় জনতার হাতে আটক হচ্ছেন অনেকে। পাম্পে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে অল্প সময়েই তেল শেষ হওয়ায় দুর্ভোগে গ্রাহকেরা। অনেক পাম্পেই সাধারণের ক্ষোভকে সামাল দিতে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফিলিং স্টেশনে মিলছে না তেল। তবে একটু খুঁজলেই আশেপাশেই খোলা বাজারে মিলছে জ্বালানি।

ঠাকুরগাঁওয়ে তেলের অভাবে বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন বন্ধ থাকলেও খোলা বাজারে ঠিকই মিলছে তেল। নীলফামারীতে তেলের সংকটের মধ্যেই চলছে অবৈধ মজুত। বিভিন্ন পাম্পের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারির বিপরীতে ড্রাম ভরে তেল সংগ্রহ করছেন অনেকেই। জামালপুরের কালিবাড়ী বাজারে মধ্যরাতে ৩ হাজার লিটার পেট্রোল কালোবাজারে বিক্রি সময় ৭ জনকে আটক করে জনতা। রাজশাহীতে পরিস্থিতি বিবেচনায় পাম্পগুলোতে বাড়ানো হয়েছে পুলিশি নিরাপত্তা। সিলেট-সুনামগঞ্জে কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে রেশনিং পদ্ধতিতে দেওয়া হচ্ছে জ্বালানি তেল। সিলেট বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিয়াসাদ আজিম আদনান বলেন, বিপিসি যেন অবাস্তব ব্যবস্থাপনায় না যায়, বিপিসি যেন সরকারি বিপণন কোম্পানিগুলোকে দায়িত্ব দেয়।

এদিকে, মজুত ঠেকাতে নারায়ণগঞ্জের জ্বালানি তেলের চারটি ডিপো থেকে সাধারণ সময়ের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ ভাগ তেল কম সরবরাহ করা হচ্ছে। তেল সংকটে দুর্ভোগ বেড়েছে নোয়াখালী, রংপুর, সাতক্ষীরা, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায়। নেত্রকোণায় পরিস্থিতি নজরদারিতে ৯ সদস্যের কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। খাগড়াছড়িতে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি সংকটে স্থানীয়দের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়েছে পর্যটকরাও।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত