
দেশে ১ মাসে দুই দফায় বেড়েছে জেট ফুয়েলের (উড়োজাহাজের জ্বালানি) দাম। দুবারে লিটারপ্রতি মোট ১০৭ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে উড়োজাহাজের টিকিটের দাম বাড়িয়েছে দেশের বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থাগুলো। দেশের ছয়টি রুটে বিমানের ভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জেট ফুয়েলের নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানিয়েছে। এতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির এই দাম বাড়ানো হয়েছে।
বিইআরসি জানায়, গত ৮ মার্চ প্রথম দফায় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট ফুয়েলের দাম লিটারে বেড়েছিল ১৭ টাকা ২৯ পয়সা। দ্বিতীয় দফায় গত মঙ্গলবার রাতে প্রতি লিটারে দাম বাড়ানো হয় ৮৯ টাকা ৮৮ পয়সা। দুই দফায় জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে ১০৭ টাকা। তাতে প্রতি লিটারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০২ দশমিক ২৯ টাকা।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একটি উড়োজাহাজ পরিচালনার মোট ব্যয়ের ৪০-৫০ শতাংশই হয় জ্বালানি বাবদ। তাই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে ভাড়ার ওপর। ফলে দেশের বিমানগুলোতে যাত্রী কমতে পারে, যার প্রভাব পড়বে দেশের পর্যটন খাতের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে।
বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের বর্তমানে ২৫টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এসব বিমান ১০টি দেশের ১৫টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে চলাচল করে। এ ছাড়া সংস্থাটি দেশের অভ্যন্তরে ঢাকা, কক্সবাজার, সিলেট, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর ও রাজশাহী- এই ছয় গন্তব্যে বিমানসেবা দিচ্ছে। ইউএস বাংলার সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা। তবে ভাড়া বাড়ার ফলে নতুন ভাড়া হয়েছে ৫ হাজার ৮৫০ টাকা।
জানতে চাইলে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) কামরুল ইসলাম গত বুধবার বলেন, ‘জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে স্বাভাবিকভাবেই পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাবে। তাই খরচ সামলাতে কিছু সমন্বয় করতে হচ্ছে। তবে আমরা বিমানের মূল ভাড়া বৃদ্ধি করিনি। মূল ভাড়ার সঙ্গে ফুয়েল সারচার্জ হিসেবে বাড়তি অর্থ যোগ করা হয়েছে। জ্বালানির দাম কমলে এই সারচার্জও কমে যাবে।’
দেশের আরেক বেসরকারি বিমান সংস্থা এয়ার অ্যাস্ট্রা। দেশের অভ্যন্তরে চারটি রুটে প্রতিদিন ২৪টি উড়ানের মাধ্যমে বিমানসেবা দিচ্ছে সংস্থাটি। এতে প্রতিদিন প্রায় ১৬ হাজার লিটার জেট ফুয়েলের প্রয়োজন হয়। এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, একটি ফ্লাইটে গড়ে ৮০ শতাংশ যাত্রী থাকলে খরচ ঠিকঠাক উঠে আসে। কিন্তু ভাড়া বাড়ার ফলে যাত্রী কমে যাবে। এতে যাত্রীর গড় উপস্থিতি ৬০ শতাংশ বা তারও নিচে নেমে যেতে পারে। ফলে ফ্লাইটের খরচের পুরো অংশ তোলা সম্ভব হবে না। অল্প সময়ের জন্য এই সারচার্জ বা বাড়তি ভাড়া দিয়ে খরচ সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু জ্বালানির দাম দীর্ঘমেয়াদে না কমলে দেশের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য টেকসইভাবে চলা কঠিন হয়ে যাবে। তবে দেশের একমাত্র সরকারি বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখনো তাদের ভাড়া বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিপণন ও বিক্রয় বিভাগের পরিচালক আশরাফুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে শিগগিরই এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। আলোচনা শেষে প্রয়োজন মনে হলে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব মফিজুর রহমান বলেন, দেশে বিমানভাড়া যদি ৫০০ টাকাও বেড়ে যায়, এর প্রভাব যাত্রীর ওপর পড়ে। ভাড়া বাড়লে যাত্রীরা সড়কপথ বা অন্য পরিবহন বেছে নেন। ফলে এয়ারলাইনের বুকিং কমে যায়। যাত্রীসংখ্যা কমে গেলে বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ জ্বালানির চাপে পড়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও নেপালে এখনো জেট ফুয়েলের দাম সেভাবে বাড়েনি, পাকিস্তানে বেড়েছে।