ঢাকা শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৮ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সুসংবাদ প্রতিদিন

চান্দিনায় মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

চান্দিনায় মাছ চাষে নীরব বিপ্লব

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠের দিকে তাকালে এখন আর শুধু সোনালি ধানের নাচন চোখে পড়ে না, বরং বাতাসের ঢেউয়ে ঝিলমিল করে ওঠে বিশাল সব মৎস্য প্রকল্পের পানি। কুমিল্লার এই উপজেলাটি এখন মৎস্য উৎপাদনে দেশের এক অনন্য মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মূলত শিক্ষিত ও উদ্যমী যুবকদের হাত ধরে এখানে সূচিত হয়েছে এক নীরব বিপ্লব। বেকারত্বের অভিশাপ মুছে এক সময়ের নিস্তরঙ্গ গ্রামগুলো এখন কর্মচাঞ্চল্যে মুখর। কেউ পুকুরে মাছের পোনা ছাড়ছেন, কেউ বাঁশের খুঁটি দিয়ে ঘের তৈরি করছেন, আবার কেউ নৌকায় করে মাছের খাবার ছিটিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই দৃশ্য এখন চান্দিনার প্রতিটি ইউনিয়নের চিরাচরিত প্রতিচ্ছবি।

চান্দিনার এই মৎস্য বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিশাল আকৃতির ‘ঘুগরার বিল’। এক সময় যে বিলে বছরের অধিকাংশ সময় পানি জমে থাকত এবং আশানুরূপ ফসল হতো না, সেই পতিত জলরাশিই এখন রুপালি সম্পদের খনি। উপজেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্যোক্তারা এসে এই বিলের জমি লিজ বা বন্ধক নিয়ে গড়ে তুলেছেন শত শত মৎস্য প্রকল্প। শুধু ঘুগরার বিলই নয়, সাধারণ কৃষকরাও এখন গতানুগতিক কৃষির বাইরে এসে ভিন্ন কিছু ভাবছেন। অনেকে নিজেদের ধান চাষের জমিতে আইল বেঁধে মাছ ও ফসল- উভয়ই চাষ করছেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘সমন্বিত চাষ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর ফলে একখণ্ড জমি থেকে দ্বিগুণ আয়ের পথ প্রশস্ত হয়েছে।

মাছ চাষের এই ব্যাপক প্রসারের ফলে এলাকায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে। মেহার গ্রামের পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী রোকন সরকার ও আবুল কালামের মতো ব্যবসায়ীরা এখন ভীষণ ব্যস্ত। তারা সরাসরি প্রজেক্ট থেকে মাছ কিনে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন আড়তে পাঠাচ্ছেন। এই পরিবহন ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। জাল টানা শ্রমিক থেকে শুরু করে ট্রাক চালক কিংবা প্যাকেজিং কর্মী—সবাই এখন এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই চেইনটি যেমন উদ্যোক্তাদের লাভ নিশ্চিত করছে, তেমনি মধ্যস্বত্বভোগী ও শ্রমিকদেরও অন্নের সংস্থান করছে।

উদ্যোক্তাদের এই সাফল্যের পেছনে কাজ করছে আধুনিক প্রযুক্তি ও সঠিক দিকনির্দেশনা। অনেক মৎস্য চাষি এখন উপজেলা মৎস্য অফিসের পরামর্শ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চাষাবাদ করছেন। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ওষুধ ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও এখানে চোখে পড়ার মতো। বিভিন্ন কোম্পানি মাঠপর্যায়ে সেমিনার ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে। তারা চাষিদের দোরগোড়ায় গিয়ে আধুনিক মাছ চাষের পদ্ধতি ও রোগ দমনের কলাকৌশল শিখিয়ে দিচ্ছে। কোম্পানিগুলোর এই সক্রিয় তৎপরতা ও সহজলভ্য ইনপুট সাধারণ মানুষকে মাছ চাষে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করছে।

চান্দিনার এই মৎস্য বিপ্লব গ্রামীণ অর্থনীতিকে মজবুত করেছে এবং যুবকদের দিয়েছে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার শক্তি। মাছের এই উৎপাদন স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় আমিষের যোগানেও বড় ভূমিকা রাখছে। যদি পরিকল্পিতভাবে এবং পরিবেশ ও কৃষিজমির ভারসাম্য রক্ষা করে এই চাষাবাদ এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে চান্দিনা হতে পারে বাংলাদেশের মৎস্য শিল্পের অন্যতম রাজধানী। একদিকে উন্নয়ন আর অন্যদিকে কৃষিজমি রক্ষা, এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধনই এখন এই অঞ্চলের টেকসই অগ্রযাত্রার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত