
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমিতে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে জাপানের বিখ্যাত ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু। গত তিন বছর ধরে পরীক্ষামূলক ও উদ্যোক্তা পর্যায়ে চাষ শুরু হলেও চলতি মৌসুমে এ আলুর আবাদ সম্প্রসারিত হয়েছে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে। কৃষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের আগ্রহ বাড়ায় এটি এখন সম্ভাবনাময় একটি ‘সুপারফুড’ ফসল হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, অন্যান্য দেশি জাতের তুলনায় ওকিনাওয়া জাতের ফলন অনেক বেশি। প্রতি বিঘায় শতাধিক মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। সংরক্ষণ ক্ষমতা তুলনামূলক বেশি এবং রোগবালাই সহনশীল হওয়ায় কৃষকদের কাছেও এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সাধারণ কৃষকদের ভাষ্যমতে, প্রতি শতকে তিন মণেরও বেশি উৎপাদন মিলছে, যা স্থানীয় অন্যান্য জাতের তুলনায় প্রায় দেড়গুণ বেশি। আলুর আকারও বেশ বড় এবং আকর্ষণীয়।
সিদ্ধ কিংবা পুড়িয়ে খাওয়ার পর এ আলুর ভেতরে দৃষ্টিনন্দন হলুদাভ রং দেখা যায়, যা ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছে। স্বাদেও রয়েছে আলাদা মিষ্টতা ও নরম ভাব। কম পানিতে ধীরে ধীরে সিদ্ধ করলে এর স্বাদ আরও ভালো হয়। আবার সিদ্ধ বা পুড়ানো আলু কিছু সময় ফ্রিজে রেখে খেলে মিষ্টতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায় বলে জানান ভোক্তারা।
অনেকেই মনে করেন, মিষ্টি আলু খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। মিষ্টি আলুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম হওয়ায় ডায়াবেটিস রোগীরাও পরিমিত পরিমাণে এটি খেতে পারেন। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল কমাতে সহায়তা করে। পাশাপাশি উচ্চমাত্রার খাদ্যআঁশ হজমে সহায়তা করে, দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা ভিটামিন ‘এ’ চোখের দৃষ্টিশক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট থাকায় এটি ধীরে ধীরে শক্তি জোগায় এবং দ্রুত ক্ষুধা লাগতে দেয় না।
বিশ্বব্যাপী ওকিনাওয়া মিষ্টি আলু বিশেষভাবে পরিচিত জাপানের ওকিনাওয়া অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতির কারণে। দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের পেছনে এ আলুকে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এ আলুর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
বড়িকান্দি ইউনিয়নের বড়িকান্দি গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বলেন, গত বছর কৃষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জাতের মিষ্টি আলু সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসাইনের মাধ্যমে কৃষি অফিস থেকে ভাইন সংগ্রহ করি। পরে প্রথমবারের মতো ২০ শতক জমিতে আবাদ করে প্রায় ৬৫ মণ আলু পেয়েছি।
নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের দড়িলাপাং গ্রামের কৃষক কামাল মিয়া বলেন, এই আলুর স্বাদ ও চাহিদা দুইটাই ভালো। বাজারেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। গত ২ বছর ধরে তিন বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলু আবাদ করছি। প্রতি বিঘায় প্রায় ১২০ মণের মতো ফলন আসে। স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদন হওয়ায় এটি আমাদের জন্য লাভজনক। তাই ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিসার জাহাঙ্গীর আলম লিটন জানান, ওকিনাওয়া জাতের মিষ্টি আলুর প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলন ও বাজারচাহিদা ভালো থাকায় আগামীতে এর আবাদ আরও বাড়বে। উদ্যোক্তা কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনীর জন্য ভাইন উৎপাদনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। আগামী মৌসুমে ১০০ বিঘা জমিতে ওকিনাওয়া সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপ-পরিচালক ড. মোস্তফা এমরান হোসেন বলেন, দেশে এখনো মিষ্টি আলু সংরক্ষণের জন্য আধুনিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। গোল আলুর মতো সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও মিষ্টি আলুভিত্তিক এগ্রো-প্রসেসিং শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং ভোক্তারাও দীর্ঘ সময় বাজারে এ পুষ্টিকর খাদ্য সহজলভ্যভাবে কিনতে পারবেন।
বর্তমানে নবীনগর উপজেলায় প্রায় ২৫৫ হেক্টর জমিতে মিষ্টি আলুর আবাদ হয়। এর মধ্যে নাটঘর, নবীনগর পশ্চিম, সাতমোড়া, বড়িকান্দি ও বীরগাঁও ইউনিয়নের প্রায় ২০ জন কৃষক ওকিনাওয়া জাতের আলু উৎপাদন করছেন। কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এ জাতের আবাদ আরও তিনগুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্যাপশন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দি গ্রামের একটি মিষ্টি আলু খেত।