ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান

বললেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে জনসচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান

রক্তের অভাবে যেন কোনো মানুষের মৃত্যু না হয়, সে জন্য পর্যাপ্ত রক্তের মজুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে মরণোত্তর চক্ষুদান কার্যক্রম জোরদার এবং কর্নিয়া সংগ্রহে দেশকে স্বাবলম্বী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

গতকাল সোমবার জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বাংলদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল 'রক্তদানে জীবনের জয়গান, চক্ষুদানে আলোর সন্ধান'।

দিবসটি উপলক্ষে সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিটি বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের নিচতলার চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার বহন করেন।

মন্ত্রী বলেন, শুধু সেমিনার আয়োজন করে রক্তদান কর্মসূচির গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। এ জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে রক্তদানের গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে, রক্তদান করলে দাতার শারীরিক ক্ষতি হয় না; বরং এক ব্যাগ রক্ত একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও রক্তদান একটি মহৎ কাজ উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন মানুষের জীবন বাঁচানো অনেক বড় দান। রক্তদানের মাধ্যমে অন্যের জীবন রক্ষা করা পরকালের জন্যও সওয়াবের কাজ। তাই এ বিষয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাঁদের সন্তানের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্তের প্রয়োজন হয়, যা রোগী ও পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভোগান্তির কারণ। এ কারণে বিয়ের আগে বর-কনের থ্যালাসেমিয়া বাহক কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এ রোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি রক্তের চাহিদা ও সংকট কমাতেও ভূমিকা রাখবে। রক্তের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রচার-প্রচারণা ও কর্মসূচি গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

সন্ধানীর কার্যক্রম এগিয়ে নিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী বলেন, রক্ত সংগ্রহের জন্য যেসব প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন, মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে। তিনি দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত সন্ধানীর পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও দেন।

অনুষ্ঠানে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাঈদ মেহেবুব উল কাদির বলেন, ১৯৭৮ সালের ২ নভেম্বর জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। স্বেচ্ছায় রক্তদান আন্দোলন ৪৮ বছর পার করলেও ১৯৮৪ সালে শুরু হওয়া মরণোত্তর চক্ষুদান কর্মসূচি এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৪ হাজার ২০০টি কর্নিয়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৫০০টি সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অপ্রতুল। চলতি বছরে মাত্র ১২ জনের কর্নিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকে কর্নিয়া সংগ্রহ করা হতো। তবে নেপাল বর্তমানে বাংলাদেশে কর্নিয়া সরবরাহ করছে না। ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও শ্রীলঙ্কার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এসব দেশ থেকে কর্নিয়া আনতে যে ব্যয় হয়, তা অনেক রোগীর পক্ষেই বহন করা কঠিন।

কর্নিয়া সংগ্রহ ও আমদানির জটিলতা নিরসনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে মাল্টি-স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন ওয়ার্কশপ আয়োজনের প্রস্তাব দেন তিনি। এর মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে কর্নিয়া সংগ্রহ এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা মানুষের চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, সন্ধানী মূলত মেডিকেল ও ডেন্টাল শিক্ষার্থীদের সংগঠন। রক্ত ও কর্নিয়া সংগ্রহের জাতীয় কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সংগঠনটি শিক্ষার্থীদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে।

তিনি বলেন, রক্ত সংগ্রহের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও কর্নিয়া সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। দেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় কর্নিয়া সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। ভবিষ্যতে রক্ত কিংবা কর্নিয়ার জন্য যেন অন্য কোনো দেশের ওপর নির্ভর করতে না হয়, সে লক্ষ্যে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বিএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী বলেন, ২ নভেম্বরকে জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস হিসেবে ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা। রক্তদানের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ বাড়লেও মরণোত্তর চক্ষুদানের ক্ষেত্রে এখনও কাঙ্ক্ষিত সচেতনতা তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, ধর্মীয় ও সামাজিক নানা ভুল ধারণা এবং কুসংস্কারের কারণে অনেকে মরণোত্তর চক্ষুদানে আগ্রহী হন না। এ বিষয়ে গ্রামগঞ্জের মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী আরও বলেন, ১৯৭৭ সালে মাত্র ছয়জন শিক্ষার্থীর উদ্যোগে শুরু হওয়া সন্ধানী আজ অনেক দূর এগিয়েছে। সংগঠনটি স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান— এই দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। এ কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম শাকিল, সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. ফজলুল হক কাশেম, মহাসচিব ও উদযাপন উপকমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির হোসেন এবং সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। অনুষ্ঠানে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সন্ধানীর কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত