ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গ্রিডে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য

গ্রিডে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য

আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে বিশেষ অধ্যাদেশ প্রণয়ন, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে 'বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬' উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি এ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জেনে আশ্বস্ত হবেন যে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ-২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থাও সরকার এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে।" তিনি বলেন, "সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই জাতীয় গ্রিডে সরকার ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।

সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের প্রত্যাশার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর যারা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন, তাদের কাছ থেকে বিশেষ প্রণোদনাসহ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে সরকার। এ সুবিধা পেতে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কোনোভাবেই অসম্ভব হবে না।" তিনি বলেন, "আসুন, আমরা সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে রূপান্তরিত করি। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি।"

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) দুই দিনব্যাপী এ সোলার এক্সপোর আয়োজন করেছে। এবারের এক্সপোর প্রতিপাদ্য, 'প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতের আয় বাড়াই'। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিন শতাধিক তরুণ-তরুণী তাঁদের উদ্ভাবনী ধারণা উপস্থাপন করেছেন। তাঁদের সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামীর বাংলাদেশে জ্ঞান ও উদ্ভাবনের এমন প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন। তারেক রহমান বলেন, "আপনাদের একটি উদ্ভাবনী ধারণা বাংলাদেশের জন্য যুগান্তকারী হতে পারে। অর্থের অভাবে যাতে তরুণদের কোনো উদ্ভাবনী ধারণা হারিয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে চলতি বাজেটে স্টার্টআপের জন্য বর্তমান সরকার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।" উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী সোলার এক্সপো পরিদর্শন করেন।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে উদ্যোক্তাদের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যাতে অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন, সরকার তা নিশ্চিত করতে চায় বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজস্ব উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সোলার এক্সপো একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তিনি বলেন, "এই সোলার এক্সপোতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৌরবিদ্যুৎ খাতের উদ্যোক্তা, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, কুইক রেন্টালের নামে লুটপাটের পরিবর্তে সাশ্রয়ী পন্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন আর শুধু সম্ভাবনার খাত নয়, বরং এটি একটি অনিবার্য বাস্তবতা।"

দেশকে 'আমদানিনির্ভর করে ফেলার কারণে' বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, "দেশটাকে সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সংকট মোকাবেলা করতে হয়েছে। সেই সংকটের মধ্য দিয়ে দেশ ও দেশের জনগণ এখনো যাচ্ছে।" জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ডিজেলের মজুদ বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যে ৬ হাজার কোটি টাকা আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জ্বালানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়ে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা বা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় সময় নষ্ট করার পরিবর্তে ভবিষ্যতে কীভাবে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো যায়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, "বাসাবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের কাছে অগ্রাধিকার।" বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিশেষ করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে।

বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের কাজ একযোগে চলছে বলেও জানান তিনি।

সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। অন্যদের আহ্বান জানানোর আগে তিনি নিজেই নিজের বাসায় সৌর প্যানেল স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, "ইতোমধ্যে আমার বাসায় ব্যবহারের বিদ্যুতের কিছু অতিরিক্ত ইউনিট প্রায় প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।"

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রপাতির দাম কমানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি এবং দেশে উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনই সরকারের লক্ষ্য নয়, জনগণের বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ কমানোও অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতে আট হাজারের বেশি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাঁদের স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহকেরা প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, সেদিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাঁদের সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরেন্দ্র এলাকায় এরই মধ্যে এ কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, "আমরা আশা করছি, আগামী এক বছরের মধ্যে ১৭ হাজার পাম্পকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনতে সক্ষম হব।"

সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়িত্ব হলেও এর সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্বের অংশ বলে মনে করেন তিনি। এ কারণে দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার এবং বাসাবাড়ি, অফিস ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে বাতি, পাখা ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগে অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত