ঢাকা শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতায় গুরুত্ব দিতে হবে

বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতায় গুরুত্ব  দিতে হবে

বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক। আগামী মাসে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশের প্রাক্কালে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর নিয়মতান্ত্রিক বাস্তবায়নই হওয়া উচিত দেশের প্রধান অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার।

ড. এনামুল হক সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এতে পণ্যের দাম বাড়বে, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, অভ্যন্তরীণ পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখতে এবং বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজেটে সরকারি উদ্যোগে খাদ্য সংগ্রহ ও আমদানির জন্য পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করা উচিত। তিনি বলেন, সরকারের উচিত নিজস্ব তত্ত্বাবধানে কৌশলগত খাদ্য মজুত গড়ে তোলা। বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি না পেলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও প্রকট হবে। তিনি যুক্তি দেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেবল নগদ সহায়তার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। কারণ খাদ্য সরবরাহে ঘাটতি থাকলে পণ্যের দাম বাড়তেই থাকবে। বাজারে পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকলে শুধু টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাড়লে বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসার ঝুঁকি রয়েছে। এজন্য সরকারের আপৎকালীন পরিকল্পনা থাকতে হবে। তিনি বলেন, দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসনে ঋণ সুবিধা দিতে হবে, যাতে তারা ছোট ব্যবসা বা আয়মুখী কর্মকাণ্ড শুরু করতে পারেন।

জলবায়ু-সম্পর্কিত ঝুঁকি তুলে ধরে ড. এনামুল বলেন, তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের মানুষকে আরও বেশি সহায়তা দিতে হবে। তিনি বন্যাপ্রবণ এলাকার কৃষকদের জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরিতে হাঁস পালন, গবাদিপশু পালন এবং প্রাণিসম্পদভিত্তিক অন্যান্য কার্যক্রমে সহায়তা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, হাওর অঞ্চলের কৃষকরা সাধারণত একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভরশীল। সেই ফসল নষ্ট হলে তারা পুরো বছরের আয় হারান। তাই বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি অত্যন্ত জরুরি।

দুর্যোগকবলিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক নগদ সহায়তার পক্ষে মত দিলেও তিনি বলেন, খাদ্য সরবরাহ না বাড়িয়ে শুধু নগদ অর্থ সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মূল্যস্ফীতি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিআইডিএস মহাপরিচালক সরকারের ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেলস) কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থা আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ওএমএস-এর মাধ্যমে চাল ও ডাল সরবরাহের পাশাপাশি ডিমও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এতে একদিকে যেমন সুষম পুষ্টি নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদকরাও উপকৃত হবেন।

ক্রমবর্ধমান খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা উল্লেখ করে বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে বিশ্বের কয়েকটি দেশ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। তাই বাংলাদেশকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তা একটি উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। ড. এনামুল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও কৃষি সহায়তা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও সমন্বিত করতে কৃষক কার্ড এবং ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবহার সম্প্রসারণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সার ও কীটনাশকের মতো কৃষি উপকরণগুলো কম দামে সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন বাড়বে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং অপব্যবহার কমাতে একটি মাত্র সমন্বিত ফ্যামিলি কার্ড ব্যবস্থার আওতায় বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি একীভূত করার সুপারিশও করেন তিনি।

ড. এনামুল বলেন, দেশের প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন। এই কর্মসূচিগুলোকে যদি কৌশলগতভাবে একীভূত করা যায়, তাহলে আর্থিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। বৈদেশিক বাণিজ্য কৌশলের বিষয়ে তিনি বলেন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য রুটে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা চলমান থাকায় বাংলাদেশকে এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগ আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সংঘাত পরিস্থিতিতে এশিয়া তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। তাই ভারতের মতো বড় বাজারসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি বাড়াতে বাংলাদেশকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

ড. এনামুল হক বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী প্রকল্প গ্রহণের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোনিবেশ করা উচিত। তিনি বলেন, বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত