প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
প্রাক-ইসলামি যুগে যখন চরম উচ্ছৃঙ্খলতা, পাপাচার, দুরাচার, ব্যভিচার, মিথ্যা, হত্যা, লুণ্ঠন, মদ্যপান, জুয়ায় ভরপুর ছিল, অন্যায়-অপরাধ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, নৈরাশ্য আর হাহাকার বিরাজ করছিল, ঠিক তখন মানবতার মুক্তির দিশারী সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশেষ নবী প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) বিশ্ববাসীর হেদায়েতের জন্য আবির্ভূত হলেন। রাসুল (সা.) হলেন বিশ্বমানবতার জন্য আল্লাহর এক অনন্য রহমত স্বরুপ প্রেরিত। মহানবী (সা.) ছিলেন উত্তম চরিত্রের অধিকারী। ক্ষমা, উদারতা, ধৈর্য, সহনশীলতা, সততা ও সত্যবাদিতা, দয়া, দানে, কাজে-কর্মে, আচার-আচরণে, মানবতা ও মহত্ব সব গুণের অধিকারী। তিনি ছিলেন সর্বকালের সব মানুষের জন্য উত্তম আদর্শ। এ জন্য আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সুরা আহজাব : ২১)।
জন্ম ও পরিচয় : মহানবী (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২০ এপ্রিল (রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ) সোমবার মক্কার বিখ্যাত কোরাইশ গোত্রের বনী হাশেম বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল্লাহ, মায়ের নাম আমিনা। তার দাদার নাম ছিল আবদুল মুত্তালিব। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় মুহাম্মদ এবং আহমদ। তার জন্মের আগে পিতা আবদুল্লাহ মারা যান। ছয় বছর বয়সে মা আমিনাকে হারান। আট বছর বয়সে তার দাদা মৃত্যুবরণ করেন।
দুগ্ধপান : সর্বপ্রথম তাকে তার মা দুগ্ধ পান করান। এরপর আবু লাহাবের বাদী সুওয়াইবা তাকে দুগ্ধ পান করান। অতঃপর ধাত্রীর সন্ধান করতে থাকেন। হাওয়াজিন গোত্রের বনী সাদের হালিমা সাদিয়া এ বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী হন। হালিমার ঘরে এলাহি বরকতের জোয়ার শুরু হলো। দু’বছর দুগ্ধপানের পর বিবি হালিমা শিশু মুহাম্মদকে নিয়ে তার মায়ের কাছে হাজির হন। আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন, শিশুকে আরও কিছুদিনের জন্য তার কাছে যেন থাকতে দেওয়া হয়। এদিকে মক্কায় তখন মহামারি চলছিল। উভয় দিক চিন্তা করে বিবি আমেনা তার শিশুকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেন। এভাবে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত মহানবী (সা.) বনী সাদে লালিত পালিত হন। সেখানে তিনি তার দুধ ভাইদের সঙ্গে জঙ্গলে ছাগল চরাতেন। (বোখারি : ১/১৭২)।
বেড়ে ওঠা : পাঁচ বছর বয়সে তিনি মা আমিনার কোলে ফিরে আসেন। আদর-সোহাগে মা তাকে লালন পালন করতে থাকেন। কিন্তু মায়ের আদর তার কপালে বেশিদিন স্থায়ী হলো না। তার ছয় বছর বয়সে মাও ইন্তেকাল করেন। এবার তিনি পিতামাতা দুজনকে হারিয়ে এতিম হয়ে যান। এরপর তিনি দাদা আবদুল মুত্তালিবের আদর-স্নেহে লালিত-পালিত হতে থাকেন। কিন্তু আট বছর বয়সের সময় তার দাদাও মারা যান। এরপর তিনি চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। আবু তালিবের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। কিশোর মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন কর্মঠ। চাচার অস্বচ্ছল পরিবারের নানাভাবে সাহায্য করতেন। বাড়তি আয়ের জন্য রাখালদের সঙ্গে ছাগল, মেষ চরাতেন। রাখাল বালকের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ। তাদের সঙ্গে তিনি সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি বজায় রাখতেন। রাখালদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ হলে তিনি বিচারকের ভূমিকা পালন করতেন। তিনি চাচার ব্যবসা-বাণিজ্যেও সাহায্য করতেন। একবার চাচার সঙ্গে ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়ায় গেলেন। এ সময় বাহিরা নামক এক পাদ্রীর সঙ্গে তার দেখা হয়। বাহিরা তাকে অসাধারণ বালক বলে মন্তব্য করেন। শেষ নবী বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তিনি আবু তালেবকে তার ব্যাপারে সাবধান করেন। কারণ শত্রুরা তার অনিষ্ট করতে পারে।
হিলফুল ফুজুল প্রতিষ্ঠা : সিরিয়া থেকে ফেরার পর বালক মুহাম্মদ (সা.) ফিজার যুদ্ধ বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করে আঁতকে ওঠেন। উকাজের মেলায় জুয়া খেলাকে কেন্দ্র করে এ যুদ্ধ হয়েছিল। কায়েস গোত্র অন্যায়ভাবে এ যুদ্ধ কোরাইশদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এ জন্য একে হারবুল ফিজার বা অন্যায় সমর বলা হয়। এ যুদ্ধ চলে একটানা পাঁচ বছর। অনেক মানুষ আহত, নিহত হলো। যুদ্ধের বিভীষিকাময় করুণ দৃশ্য দেখে ও আহতদের আর্তনাদে তার কোমল হৃদয় কেঁপে উঠল। তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি শান্তিকামী উৎসাহী যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সংগঠন করেন। এ সংঘের উদ্দেশ্য ছিল, আর্তের সেবা করা, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ করা, অত্যাচারিতকে সাহায্য করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং গোত্রে গোত্রে সম্প্রীতি বজায় রাখা ইত্যাদি। তিনি তার প্রচেষ্টায় অনেক সফলতা লাভ করেন। এরই মধ্যে সত্যবাদী, বিচক্ষণ, আমানতদার, পরোপকারী, শান্তিকামী যুবক হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আপন-পর সবাই তাকে সত্যবাদী ও আল আমিন উপাধিতে ভূষিত করল। তার কাছে ধন-সম্পদ আমানত রাখতে লাগল।
হাজরে আসওয়াদ স্থাপন : বহুদিন আগের নির্মিত পুরোনো কাবাঘর সংস্কারের কাজ হাতে নিল কোরাইশরা। যথারীতি কাবাঘর সংস্কার করল তারা। কিন্তু পবিত্র হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর স্থাপন নিয়ে বিবাদ লেগে গেল। প্রত্যেক গোত্রই এ পাথর কাবাঘরের দেয়ালে স্থাপনের সম্মান নিতে চাইল। যুদ্ধের সাজ সাজ রব পড়ে গেল। অবশেষে প্রবীণতম গোত্র প্রধান উমাইয়া বিন মুগিরার প্রস্তাব অনুসারে সিদ্ধান্ত হলো, আগামীকাল যে ব্যক্তি সবার আগে কাবাঘরে আসবেন, তার ওপর বিবাদ মীমাংসা অর্পিত হবে। তার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নেবে। মহানবী (সা.) কাবাঘরে সবার আগে প্রবেশ করেন। সবাই আনন্দে চিৎকার করে বলল, ‘আল আমিন আসছেন। আমরা তার প্রতি সন্তুষ্ট। সঠিক মীমাংসাই হবে।’ রাসুল (সা.) একখানা বিছানার চাদর বিছিয়ে দিলেন। তারপর চাদরে নিজ হাতে পাথরখানা রাখলেন। গোত্র সওদাগরদের ডেকে চাদর ধরতে বললেন। তারা ধরে তা যথাস্থানে বহন করে নিয়ে গেল। রাসুল (সা.) নিজের হাতে পাথরখানা কাবাঘরের দেয়ালে বসিয়ে দিলেন। একটি অনিবার্য যুদ্ধ থেকে সবাই বেঁচে গেল। পাথর তোলার সম্মান পেয়ে সবাই খুশি হলো।
খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার দায়িত্ব গ্রহণ ও বিয়ে : তখনকার দিনে আরবে একজন বিখ্যাত ধনী ও বিদূষী নারী ছিলেন। নাম তার খাদিজা। তিনি তার বিশাল বাণিজ্য দেখাশোনা করার জন্য একজন বিশ্বাসী বিচক্ষণ লোক খুঁজছিলেন। মহানবী (সা.)-এর উত্তম চরিত্রের সুনাম শুনে তিনি তার ওপর ব্যবসার দায়িত্ব অর্পণ করেন। রাসুল (সা.) খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে সিরিয়া যান। তার সঙ্গে খাদিজা (রা.)-এর বিশ্বস্ত কর্মচারী মাইসারাও ছিলেন। ব্যবসায় আশাতীত লাভ করে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন। মাইসারার কাছে মুহাম্মদ (সা.)-এর সততা, বিচক্ষণতা ও কর্মদক্ষতার কথা শুনে খাদিজা (রা.) অত্যন্ত মুগ্ধ হন। তিনি তার সঙ্গে নিজের বিয়ের প্রস্তাব দেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচা আবু তালেব রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে খাদিজার বিয়ের সব ব্যবস্থা করে দেন। শুভ বিবাহ সম্পন্ন হলো। তখন মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স ২৫ বছর, আর খাদিজার বয়স ৪০ বছর। তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়েছিল। খাদিজা (রা.) বেঁচে থাকতে তিনি অন্য কোনো বিয়ে করেননি। বিয়ের পরে খাদিজার আন্তরিকতায় তিনি প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন। কিন্তু তিনি এ ধন-সম্পদ ভোগ-বিলাসে, আরামণ্ডআয়েশে ব্যয় না করে গরিব-দুঃখী ও আর্ত-পীড়িতদের সেবায় অকাতরে ব্যয় করেন।
নবুওয়ত লাভ : মহানবী (সা.) শিশু বয়স থেকেই মানুষের মুক্তি ও শান্তির জন্য ভাবতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার এ ভাবনা আরও গভীর হয়। মূর্তিপূজা, কুসংস্কার এবং নানা দুঃখ-কষ্টে জর্জরিত মানুষের মুক্তির জন্য ছিল তার সব ভাবনা। মানুষ তার স্রষ্টাকে ভুলে যাবে। হাতে বানানো মূর্তির সামনে মাথা নত করবে, এটা হয় না। এসব চিন্তাণ্ডভাবনায় বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে ধ্যান করতেন। কখনও কখনও একাধারে তিনদিন সেখানে ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এভাবে দীর্ঘদিন ধ্যানমগ্ন থাকার পর অবশেষে ৪০ বছর বয়সে রমজান মাসের কদরের রাতে আঁধার গুহা আলোকিত হয়ে উঠল। জন্মের ৪১তম বছরে ২৭ রজব (হিজরতের ১৩ বছর আগে) মোতাবেক ৬১০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে জাগ্রত ও চৈতন্য অবস্থায় এ ঘটনা ঘটে। জিবরাইল (আ.) আল্লাহর মহান বাণী নিয়ে এলেন। মহানবী (সা.)-কে বললেন, ‘পড়–ন।’ তিনি মহানবী (সা.)-কে সুরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত তেলাওয়াত করে শোনান। নবীজি (সা.) ঘরে ফিরে খাদিজার কাছে সব ঘটনা প্রকাশ করলেন। বললেন, ‘আমাকে বস্ত্রাবৃত করো। আমি আমার জীবনের আশঙ্কা করছি।’ তখন খাদিজা নবীজিকে সান্ত¦না দিয়ে বললেন, ‘না, কখনও না। আল্লাহর কসম! তিনি কখনও আপনার অনিষ্ট করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেন। আর্তপীড়িত ও দুঃস্থদের সাহায্য করেন। মেহমানদের সেবা যত্ন করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য করেন। খাদিজার এ উক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয়, নবুওয়ত লাভের আগে মহানবী (সা.) নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে মানবিক গুণাবলির অনুশীলন করতেন। মানবতার সেবায় নিয়োজিত থাকতেন। বর্বর আরবদের মধ্যে থেকেও তিনি নির্মল ও সুন্দর জীবনযাপন করতেন। তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ।
দ্বীন প্রচার : নবুওয়ত লাভের পর রাসুল (সা.) আল্লাহর নির্দেশে প্রথমে নিকটাত্মীয়দের কাছে গোপনে ঈমানের দাওয়াত দিতে থাকেন। তার দাওয়াতে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন তার সুখ-দুঃখের অংশীদার স্ত্রী খাদিজা (রা.)। এরপর তাদের পরিবারভুক্ত আলী (রা.), যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। পরিবারের বাইরে এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন আবু বকর (রা.)। তিনি ছিলেন রাসুল (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এরপর আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পেয়ে তিনি প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। এতে মূর্তিপূজারীরা তার ঘোর বিরোধিতা শুরু করে। মহানবী (সা.) ও তার সাহাবিদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতে থাকে। তারা মহানবী (সা.)-কে নানারকম প্রলোভন দেখাতে থাকে। নেতৃত্ব ও ধন-সম্পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। রাসুল (সা.) স্পষ্টভাবে তাদের জানিয়ে দেন, ‘আমার এক হাতে সূর্য, আরেক হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি সত্য প্রচার থেকে বিরত হব না।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। ইবাদত করতে হবে একমাত্র তাঁরই। তিনি এক, অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমাদের হাতে বানানো দেব-দেবীর ও প্রতিমার কোনো ক্ষমতা নেই। এদের ভালো-মন্দ করার কোনো শক্তি নেই। আসমান, জমিন, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহতায়ালা। তিনি সবকিছুর স্রষ্টা, পালনকারী ও রিজিকদাতা। তিনি আমাদের জীবন-মৃত্যুর মালিক। সুতরাং দাসত্ব, আনুগত্য ও ইবাদত করতে হবে একমাত্র তাঁরই।’ তিনি আরও বললেন, ‘তোমরা সত্য-ন্যায় ও সুন্দরের পথে ফিরে এসো। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, জুয়া, ব্যভিচার, মিথ্যা, প্রতারণা- এসব পাপের কাজ। সুতরাং এগুলো পরিহার করো। কারও প্রতি অন্যায় অবিচার করবে না। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করবে না। অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ হরণ করবে না। কারও প্রতি জুলুম করবে না।’ মহানবী (সা.) আরও বোঝালেন, ‘তোমাদের দুনিয়ার জীবন শেষ নয়। মৃত্যুর পর আরও এক জীবন আছে। যে জীবন অনন্তকালের। পরকালে আল্লাহর দরবারে দুনিয়ার ভালো-মন্দ সব কাজের জন্য হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ার জীবনে যারা আল্লাহ ও রাসুলের কথা মানবে, ভালো কাজ করবে, পরকালে তারা মুক্তি পাবে। চির সুখের স্থান জান্নাত লাভ করবেন। আর যারা আল্লাহ ও রাসুলের কথা মানবে না, মন্দ কাজ করবে, তারা চরম শাস্তির স্থান জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
তায়েফ গমন : নবুওয়তের দশম বছরে মহানবী (সা.)-এর প্রিয়তমা সহধর্মিণী খাদিজা (রা.) ও তার চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। এতে তিনি শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েন। সীমাহীন শোক ও কাফেরদের অত্যাচারের মুখেও তিনি দ্বীন প্রচার করতে থাকেন। তিনি মক্কাবাসীদের থেকে এক রকম নিরাশ হয়ে দ্বীন প্রচারের জন্য তায়েফ গমন করেন। সেখানকার লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করল না। বরং তারা প্রস্তুরাঘাতে মহানবী (সা.)-এর পবিত্র শরীর ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত করল। মহানবী (সা.) এমন সময় তায়েফবাসীদের জন্য বদদোয়া করলেন না। বরং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন। অবশেষে তিনি আবার মক্কায় ফিরে এলেন।
মেরাজে গমন : মক্কার কাফেরদের সীমাহীন অত্যাচার ও তায়েফবাসীদের দুর্ব্যবহারে মহানবী (সা.) অত্যন্ত মর্মাহত ও ব্যথিত হলেন। তখন আল্লাহতায়ালা তাকে নিজের সান্নিধ্যে নিলেন। রাসুল (সা.)-এর বয়স যখন ৫১ বছর ৯ মাস, তখন তাকে সশরীরে মর্যাদাপূর্ণ ইসরা ও মেরাজ ভ্রমণের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়। নবুওয়তের একাদশ বছর রজব মাসের ২৭ তারিখে মেরাজের রাতে রাসুুল (সা.) প্রথমে কাবা থেকে বাইতুল মোকাদ্দাসে যান। সেখানে তিনি পূর্ববর্তী নবীদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাদের ইমাম হয়ে সালাত আদায় করেন। অতঃপর সেখান থেকে এক-এক করে সাত আসমান অতিক্রম করে মহান আল্লাহর আরশে তাশরিফ গ্রহণ করেন। এ সফরে রাসুল (সা.) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান লাভ করেন। জান্নাত-জাহান্নাম স্বচক্ষে দর্শন করেন। সরাসরি আল্লাহর দিদারে ধন্য হন। মেরাজ মহানবী (সা.)-এর জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এতে তিনি নতুন প্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে পূর্ণোদ্যমে দ্বীন প্রচার করতে থাকেন।
মদিনায় হিজরত : ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে হজের মৌসুমে মদিনা থেকে ১২ জন লোকের একটি দল মক্কায় আসেন। গোপনে মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাত করে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে মদিনা থেকে দুজন নারীসহ ৭৫ জনের একটি দল এবং আকাবায় মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা মহানবী (সা.) ও সাহাবিদের মদিনায় হিজরতের আহ্বান জানান। সব রকম সহযোগিতা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। মক্কার কাফেরদের বিরোধিতা ও নির্যাতনের মাত্রা যখন বেড়ে গেল এবং ইসলাম প্রচার বাধাগ্রস্ত হলো, তখন মহানবী (সা.) সাহাবিদের মদিনায় হিজরতের নির্দেশ দিলেন। নিজে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় রইলেন। কোরাইশরা রাসুল (সা.)-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হলো। আল্লাহতায়ালা তাকে হেফাজত করলেন। রাসুল (সা.) নিজ ঘর থেকে বেরুলেন। আল্লাহতায়ালা কাফেরদের চোখ অন্ধ করে দিলেন। যাতে তারা রাসুল (সা.)-কে দেখতে না পারে। তিনি চলতে চলতে মক্কার বাইরে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সঙ্গে মিলিত হলেন। অতঃপর তারা একসঙ্গে পথচলা আরম্ভ করেন। সওর নামক পাহাড়ে পৌঁছে একটি গুহায় তিনদিন পর্যন্ত আত্মগোপন করেন। এ সময়টিতে আবদুল্লাহ বিন আবু বকর (রা.) তাদের কাছে কোরাইশদের সংবাদ পৌঁছাতেন। তার বোন আসমা (রা.) খাদ্য ও পানীয় পৌঁছে দিতেন। তারপর রাসুল (সা.) ও তার সঙ্গী আবু বকর (রা.) গুহা থেকে বের হন। তারা মদিনার পথে যাত্রা শুরু করেন। রাসুল (সা.) মদিনায় পৌঁছে তাকওয়ার ভিত্তিতে ইসলামের সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন। বর্তমানে মদিনা শরিফে এ মসজিদটি ‘মসজিদে কোবা’ নামে পরিচিত। মদিনায় রাসুল (সা.) সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা হলো- মসজিদে নববি নির্মাণ এবং আনসার ও মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন।
মদিনা সনদ : মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করে একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হলেন। এখানে মুহাজির-আনসারসহ সব মুসলমান, ইহুদি-খ্রিষ্টান ও অন্যান্য মতাদর্শের লোক একত্রে মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে নিরাপদে বসবাস করবে। তাদের মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকবে। স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবে। সঙ্গে সঙ্গে মদিনার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এ উদ্দেশে তিনি সব সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি লিখিত চুক্তি সম্পাদন করেন। এটি ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত। এটি পৃথিবীর সর্বপ্রথম লিখিত সনদ। এ সনদে ৪৭টি ধারা ছিল। মদিনার সনদ রাসুল (সা.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কূটনৈতিক দূরদর্শিতা, ধর্মীয় সহিংসতা এবং সুন্দর সমাজ গঠনের এক জ্বলন্ত স্বাক্ষর। এতে বিভিন্ন জাতের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আর্থসামাজিক অধিকার নিশ্চিত হয়।
বদর ও অন্যান্য যুদ্ধ : মক্কার কাফের-মুশরিকরা ইসলাম ও মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু মদিনায় ইসলামের উত্তরোত্তর উন্নতি দেখে তারা হিংসায় জ্বলে ওঠে। মদিনার ইহুদিরা তাদের প্ররোচিত করে। এদিকে আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলা মুসলমানদের দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার গুজব ওঠে। কাফেররা মদিনা আক্রমণের জন্য রওনা হলো। সংবাদ পেয়ে রাসুল (সা.) ৩১৩ জন সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মদিনা থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর নামক স্থানে উপস্থিত হন। দ্বিতীয় হিজরির ১৭ রমজান ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে বদর প্রান্তরে দুইপক্ষ পরস্পর মুখোমুখি হলো। কোরাইশ বাহিনীর সংখ্যা এক হাজার। অস্ত্রশস্ত্র বেশুমার। মুসলিমদের সংখ্যা নগণ্য। অস্ত্রশস্ত্র তেমন কিছু নেই। কিন্তু তারা ঈমানের বলে বলিয়ান ও তাদের আল্লাহর ওপর অকৃত্রিম বিশ্বাস ও ভরসা। তুমুল যুদ্ধ হলো। মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হলো। বদর যুদ্ধে নেতা আবু জাহেল, ওলিদ, উতবা ও শায়বাসহ ৭০ জন মারা গেল। ৭০ জন বন্দি হলো। মুসলিমপক্ষে ১৪ জন শহিদ হন। রাসুল (সা.) ও মুসলমানরা যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে উদার ও মানবিক আচরণ করেন। নিজেরা না খেয়ে বন্দীদের খাওয়ান। নিজেরা পায়ে হেঁটে বন্দীদের বাহনের ব্যবস্থা করেন। বন্দী মুক্তির চমৎকার ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষিত বন্দীদের মুক্তিপণ নির্ধারিত করা হলো ১০ জন করে নিরক্ষর মুসলিম বালক-বালিকাদের শিক্ষিত করা। বদর যুদ্ধের শোচনীয় পরাজয়ের পরও কাফেররা দমে গেল না। তারা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে বারবার আক্রমণ চালাতে লাগল। এর মধ্যে উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ ছিল ভয়াবহ। এসব যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হলেও উহুদ যুদ্ধে সামান্য ভুলের জন্য মুসলমানদের অনেক ক্ষতি হয়েছিল। ৭০ জন সাহাবি শাহাদত বরণ করেন। মহানবী (সা.)-এর দাঁত মোবারক ভেঙে যায়।
হোদায়বিয়ার সন্ধি : ষষ্ঠ হিজরি সনে ৬২৮ খ্রিষ্টব্দে রাসুল (সা.) ওমরা পালনের উদ্দেশে ১৪০০ জন সাহাবিসহ মক্কা যাত্রা করেন। মক্কার নয় মাইল দূরে হোদায়বিয়া নামক স্থানে উপনীত হন। কোরাইশরা ওমরা পালনে বাঁধা দেয়। রাসুল (সা.) জানালেন, ‘আমরা যুদ্ধের জন্য আসিনি। শুধু ওমরা করে চলে যাব।’ কিন্তু কোরাইশরা তাতেও রাজি হলো না। রাসুল (সা.) মক্কাবাসীদের কাছে ওসমান (রা.)-কে দূত হিসেবে পাঠান। তার ফিরে আসতে বিলম্ব হওয়ায় তিনি শহিদ হয়েছেন বলে রব ওঠে। রাসুল (সা.) মুসলমানদের থেকে এ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন। কাফেররা ভয়ে ওসমান (রা.)-কে ফেরত দেয়। সুহাইল আমরকে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায়। ১০ বছরের জন্য সন্ধি হয়। এটি হোদায়বিয়ার সন্ধি নামে খ্যাত। সন্ধির শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম শর্ত ছিল- ১. মুসলমানরা এ বছর ওমরা না করে ফিরে যাবেন। আগামী বছর নিরস্ত্রভাবে তিনদিনের জন্য আসবেন। ২. কোনো মক্কাবাসী মদিনায় আশ্রয় নিলে তাকে মক্কায় ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু কেউ মদিনা থেকে মক্কায় এলে তাকে ফেরত দেওয়া হবে না। ৩. আরবের যে কোনো গোত্র দুই পক্ষের যে কারও সঙ্গে মিত্রতা করতে পারবে। আপাত দৃষ্টিতে এ সন্ধির শর্তগুলো মুসলমানদের জন্য অপমানজনক হলেও প্রকৃতপক্ষে সুফল বয়ে এনেছিল। এতে কাফেররা মুসলমানদের একটি শক্তিধর স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। দেশ-বিদেশে ইসলাম প্রচারের সুযোগ হলো। দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। কোরআনে কারিমে একে প্রকাশ্য বিজয় বলা হয়েছে।
মক্কা বিজয় : হোদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসুল (সা.) বিভিন্ন গোত্রে তার দাওয়াতি কর্মসূচি অধিক পরিমাণে বাড়াতে সক্ষম হন। ফলে এক বছরের মাথায় মুসলমানদের সংখ্যা অধিক হারে বৃদ্ধি পেল। এরই মাঝে কোরাইশদের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ বনু বকর মুসলমানদের মিত্র খোজাআ গোত্রের ওপর আক্রমণ করল। এর অর্থ দাঁড়াল, কোরাইশ এবং তার মিত্ররা হোদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করল। রাসুল (সা.) এ সংবাদ পেয়ে অত্যধিক ক্রুদ্ধ হলেন। মক্কা বিজয়ের উদ্দেশে দশ হাজার যোদ্ধার একটি বিশাল সেনাদল গঠন করলেন। তখন ছিল হিজরি অষ্টম বর্ষের রমজান মাস। এদিকে কোরাইশরা রাসুল (সা.)-এর মক্কাভিমুখে অভিযানের সংবাদ পেয়ে তাদের নেতা ও মুখপাত্র আবু সুফিয়ানকে ক্ষমা প্রার্থনা, সন্ধি চুক্তি বলবৎ এবং চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে রাসুল (সা.)-এর কাছে পাঠাল। রাসুল (সা.) তাদের ক্ষমার আবেদন নাকচ করে দিলেন। কারণ তারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছে। আবু সুফিয়ান ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো উপায় না দেখে ইসলাম গ্রহণ করল। অতঃপর সেনাদল মক্কাভিমুখে রওনা হয়ে মক্কার কাছাকাছি এলে মক্কাবাসী বিশাল দল দেখে আত্মসমর্পণ করল। আর রাসুল (সা.) মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তিনি বাইতুল্লাহ তওয়াফ করলেন। নিজ হাতের লাঠি দ্বারা কাবার আশপাশে রাখা সব প্রতিমা ভেঙে চুরমার করে দিলেন। স্বীয় রবের শেখানো আয়াত পাঠ করতে লাগলেন, ‘বলো, সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ৮১)। অতঃপর রাসুল (সা.) সবার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। ঘোষণা করলেন, ‘মক্কা পবিত্র ও নিরাপদ।’
বিদায় হজ : দশম হিজরিতে রাসুল (সা.) মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে হজব্রত পালন ও হজের আহকাম শিক্ষা গ্রহণ করতে মক্কায় যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। তার আহ্বানে লক্ষাধিক সাহাবি উপস্থিত হলেন। তারা জিলকদ মাসের পঁচিশ তারিখ মক্কার উদ্দেশে রওনা হন। বাইতুল্লাহ পৌঁছে প্রথমে তওয়াফ করেন। অতঃপর জিলহজ মাসের আট তারিখ মিনার উদ্দেশে রওনা হন। এরপর নয় তারিখ জাবালে আরাফা অভিমুখে যাত্রা করেন। রাসুল (সা.) সেখানে অবস্থান করেন। মুসলমানদের উদ্দেশে তার ঐতিহাসিক অমর ভাষণ দান করে তাদেরকে ইসলামি বিধিবিধান ও হজের আহকাম শিক্ষা দেন। আল্লাহতায়ালা বললেন, ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত পরিপূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা মায়িদা : ৩)।
ইন্তেকাল : বিদায় হজ থেকে ফেরার পর ১১ হিজরির সফর মাসে মহানবী (সা.) জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড হওয়ায় পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হলো। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতা তীব্র হওয়ার পর তিনি স্ত্রীদের অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রা.)-এর কক্ষে অবস্থান করতে থাকেন। তার কাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল। মৃত্যুর একদিন আগে তিনি তাও দান করে দেন। অবশেষে ১১ হিজরির রবিউল আউয়াল মাসের ১ তারিখ ও ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের ৮ তারিখ সন্ধ্যায় তিনি মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্যে চলে যান। এ সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
লেখক : শিক্ষক, সিরাত গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী