ঢাকা সোমবার, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ইতিহাসে প্রথমবার স্বর্ণের দাম আউন্সে ৫ হাজার ডলার ছাড়াল

* ‘মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্বর্ণের বাজারকে ব্যাপকভাবে লাভবান করছে।’
ইতিহাসে প্রথমবার স্বর্ণের দাম আউন্সে ৫ হাজার ডলার ছাড়াল

ইতিহাসে এই প্রথম স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫,০০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৫ সালে মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার পর এই ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ল বাজার।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা এবং সেই সঙ্গে আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে স্বর্ণের এই দাম বাড়ল।

এছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতিও বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। গত শনিবার তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু সবসময়ই ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ বা সেফ-হেভেন হিসেবে পরিচিত। গত বছর রূপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পর, গত শুক্রবার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এর দাম প্রতি আউন্স ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।

মূল্যবান ধাতুর এই আকাশচুম্বী চাহিদার পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বল অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ হিসেবে স্বর্ণ মজুদ করার প্রবণতা। এছাড়া মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আবারও সুদের হার কমাতে পারে- এমন প্রত্যাশাও বাজারকে প্রভাবিত করছে।

পাশাপাশি ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ এবং অতি সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ওয়াশিংটনের আটক করার ঘটনায় সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা স্বর্ণের দাম বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

স্বর্ণের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর দুষ্প্রাপ্যতা। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, মানব ইতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টনের মতো স্বর্ণ উত্তোলন করা সম্ভব হয়েছে।

পরিমাণের দিক থেকে চিন্তা করলে, এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে মাত্র তিন থেকে চারটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুল ভর্তি করা সম্ভব। খনি প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি এবং নতুন সব খনির সন্ধান পাওয়ায় উত্তোলিত এই স্বর্ণের বড় একটি অংশই মূলত ১৯৫০ সালের পর মাটির নিচ থেকে তোলা হয়েছে।

এদিকে ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভের হিসাব অনুযায়ী, মাটির নিচে এখনও প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণের মজুদ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী বছরগুলোতে স্বর্ণ সরবরাহের এই ধারা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গিয়ে থমকে যেতে পারে। এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড অব ইনস্টিটিউশনাল মার্কেটস নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, ‘আপনার কাছে যখন স্বর্ণ থাকে, তখন সেটি অন্য কারও ঋণের ওপর নির্ভরশীল থাকে না; যেমনটা বন্ড বা শেয়ারের ক্ষেত্রে ঘটে। শেয়ারের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সের ওপর আপনার বিনিয়োগের লাভণ্ডক্ষতি নির্ভর করে, কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘বর্তমান এই চরম অনিশ্চিত বিশ্বে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে স্বর্ণ একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম।’

স্বর্ণেই ভরসা মানুষের :

বিনিয়োগকারীরা মূল্যবান ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়ায় ২০২৫ সালটি ছিল স্বর্ণের জন্য একটি ব্লকবাস্টার বছর। ১৯৭৯ সালের পর এক বছরে স্বর্ণের দামে এমন রেকর্ড প্রবৃদ্ধি আর দেখা যায়নি।

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংশ্লিষ্ট শেয়ারগুলোর মাত্রাতিরিক্ত দাম নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। আর্থিক বাজারের এই টালমাটাল অবস্থায় স্বর্ণের দাম বারবার নতুন রেকর্ড স্পর্শ করছে।

গবেষণা সংস্থা মেটালস ফোকাসের নিকোস কাভলিস বলেন, আমার মনে হয় এর বড় একটি কারণ হলো মার্কিন নীতি নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা।

সাধারণত অর্থনৈতিক উদ্বেগ স্বর্ণের দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তবে এর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরা যখন সুদের হার কমানোর পূর্বাভাস পান, তখনও এই মূল্যবান ধাতুর দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়।

সাধারণত সুদের হার কমলে বন্ডের মতো খাতগুলো থেকে বিনিয়োগের মুনাফা কমে আসে। ফলে বিনিয়োগকারীরা বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ ও রূপার মতো সম্পদের দিকে বেশি ঝোঁকেন।

বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর তাদের মূল সুদের হার দুই দফা কমাতে পারে। অনলাইন ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান পেপারস্টোনের রিসার্চ স্ট্র্যাটেজিস্ট আহমেদ আসিরি বলেন, এটি বিপরীতমুখী সম্পর্কের মতো কাজ করে। কারণ সরকারি বন্ডে টাকা রাখার ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বা সুযোগ ব্যয় যখন আর লাভজনক থাকে না, তখন মানুষ বিকল্প হিসেবে স্বর্ণের দিকেই ছোটেন।

শুধু সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই নন, স্বর্ণ মজুদের দৌড়ে নাম লিখিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যমতে, গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে শত শত টন স্বর্ণ যোগ করেছে।

মেটালস ফোকাসের বিশেষজ্ঞ নিকোস কাভালিস বলেন, ‘মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনার একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা স্বর্ণের বাজারকে ব্যাপকভাবে লাভবান করছে।’ চলতি বছরের শুরুতেও স্বর্ণের দাম বাড়ার এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। তবে নিকোলাস ফ্রাপেল সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান বাজার যেহেতু মূলত সংবাদণ্ডনির্ভর বা বিভিন্ন খবরের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করছে, তাই যেকোনো সময় এর দাম আকস্মিকভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত