প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ জুন, ২০২৬
সন্তানের মুখে উচ্চারিত প্রথম শব্দ মা। সন্তানের প্রথম প্রভাত থেকে মা-ই সঙ্গী। মা জীবনের প্রথম ও সেরা শিক্ষক। মায়ের কাছে সন্তান শেখে- কীভাবে বসতে হয়, হাঁটতে হয়, খাওয়ার ধরন, পোশাক-পরিচ্ছদ পরার স্টাইল, পাঠশালায় যাওয়া ও পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা। সর্বোপরি জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছুই মানুষ শেখে তার পরিবার থেকে। আর এর উত্তম শিক্ষক মা। সন্তানের জন্য মায়ার ভাণ্ডার সঞ্চিত থাকে প্রতিটি মায়ের মনে। মায়ের হৃদয়জুড়ে আছে অফুরন্ত শুভকামনা। মা নির্ভয় ও নির্ভরতার আশ্রয়স্থল। পবিত্রতার পরশে বেড়ে ওঠার আঁতুড়ঘর। তার কোমল স্পর্শ আর ছায়ায় সন্তানের আত্মা পরিতৃপ্ত হয়। তার ছায়ার মতো এত পবিত্র, নির্মল, বিশ্বাসী ছায়া পৃথিবীতে আর একটিও নেই। এ ছায়া নিঃস্বার্থ, ভালোবাসার, দয়া-মায়ার, ভরসার, সৌভাগ্যের, কল্যাণ ও প্রার্থনার। সন্তান গর্ভধারণের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের কষ্ট শুরু হয়ে যায়। পর্যায়ক্রমে কষ্ট বাড়তে থাকে। বেদনা, ভয় ও উৎকণ্ঠা মায়ের সব কিছু বিপন্ন করে রাখে। সন্তান জন্মদানের সময় কষ্টের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। সন্তানের নিষ্পাপ মুখ দেখে মা কষ্ট ভুলে যান। শত কষ্ট সত্ত্বেও মা হওয়ার মধ্যেই লুক্কায়িত আছে বিপুল সুখ। মা হওয়ার জন্য প্রতিটি নারীর কী অদম্য আগ্রহ। ডাক্তার-কবিরাজের কাছে নিঃসন্তান নারীদের কত দৌড়ঝাঁপ।
এদিকে প্রসবের সময় মায়ের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবসংক্রান্ত জটিলতায় বিশ্বজুড়ে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারীর মৃতু হয়। তবে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। মায়ের কষ্টের বর্ণনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে তার মা-বাবার সঙ্গে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্ট ভোগ করতে করতে তাকে গর্ভধারণ করে। তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার শুকরিয়া ও তোমার মা-বাবার শুকরিয়া আদায় করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৪)
আল্লাহ তাআলা সন্তানকে সবচেয়ে বেশি ঋণী করেছেন মা-বাবার কাছে। এতটাই ঋণী করেছেন, পৃথিবীর সবকিছু দিয়ে হলেও কোনো সন্তান তার মা-বাবার ঋণ শোধ করতে পারবে না। এ জন্য আল্লাহ মানুষকে মা-বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাদের শুকরিয়া আদায় করতে বলেছেন।
মায়ের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। তার কথা শুনতে হবে। তার সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। কোনোভাবেই তার অবাধ্য হওয়া যাবে না। তার কষ্ট হয় এমন কাজ করা যাবে না। তিনি বিরক্ত হন, এমন কাজ করা যাবে না। কখনও ধমকের স্বরে তার সঙ্গে কথা বলা যাবে না। তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে। মা-বাবার ত্যাগ ও কষ্টের মূল্যায়ন করে আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার কর। তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। তাদের জন্য সদয়ভাবে নম্রতার বাহু প্রসারিত করে দাও আর বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক, তাদের প্রতি দয়া কর, যেমনভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালনপালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩-২৪) এ আয়াতে আল্লাহতায়ালা মা-বাবার খেদমত, সম্মান এবং তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাকে নিজের ইবাদতের সঙ্গে একত্র করেছেন। আল্লাহর ফরজ বিধান ইবাদতের সঙ্গে মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারকে যুক্ত করেছেন। আল্লাহর ইবাদত যেমন প্রতিটি মানুষের জন্য ফরজ, তেমনি মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করাও ফরজ। মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহারে আল্লাহ খুশি হন। মানুষের যেসব আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়, এর মধ্যে অন্যতম হলো মায়ের সঙ্গে সন্তানের উত্তম আচরণ। কোরআনে আছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক কর না। তোমরা মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৩৬) সবসময় মা-বাবার আদেশ মানতে হবে। তাদের আনুগত্য থাকতে হবে। তবে তারা যদি আল্লাহর আদেশ অমান্য করা বা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে বলে, তাহলে তাদের কথা শোনা যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘যদি তারা (মা-বাবা) তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছুর শরিক করতে বাধ্য করেন, যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য কর না। তবে এই দুনিয়ায় তাদের সঙ্গে উপযুক্ত সদয় আচরণ কর।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৫)