
ঊনচল্লিশ পেরিয়ে চল্লিশেও টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরতার নাম মুশফিকুর রহিম। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাকি দুই ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়ালেও লাল বলের ক্রিকেটে নিজের গুরুত্ব যেন আরও ভালোভাবেই প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। সিলেট টেস্টে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি করে দলকে শক্ত অবস্থানে নেওয়ার পাশাপাশি গড়েছেন একাধিক রেকর্ড। দ্বিতীয় ইনিংসে পরিণত ব্যাটিংয়ে ১৭৮ বলে শতক পূর্ণ করেন মুশফিক। ইনিংসজুড়ে ছিল তার স্বভাবসুলভ ধৈর্য ও নিয়ন্ত্রিত শটের প্রদর্শনী। গতকাল সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মোহাম্মদ আব্বাসের বলটা স্কয়ার কাটে থার্ড ম্যান দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠিয়ে বুনো উদযাপনে ব্যাট ছুড়ে দিলেন মুশফিকুর রহিম, পরে দুহাত উঁচিয়ে ধরলেন। বরাবরের মতো মাথা নত করে সৃষ্টিকর্তাকে কৃতজ্ঞতা জানালেন তিনি।
অবশ্য তার ইনিংসটি যেমন, যেভাবে তিনি খেলেছেন এবং দল যে অবস্থানে আছে, তাতেও এরকম বাঁধনহারা উদযাপন হতেই পারে। লিটন দাসের সঙ্গে তার শতরানে জুটি বাংলাদেশকে জয়ের অবস্থানে নিয়ে গেছে। আর তার সেঞ্চুরিটি পাকিস্তানকে ম্যাচ থেকে একরকম ছিটকে দিয়েছে। তাকে একটি জায়গায় এককভাবে শীর্ষেও নিয়ে গেছে এই শতক। বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি শতরানের রেকর্ডে তার সঙ্গী ছিলেন মুমিনুল। ১৪ সেঞ্চুরিতে আপাতত মুশফিকই সবার ওপরে। এই ইনিংসের পথে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ১৬ হাজার রানও পূর্ণ করেন তিনি। এই রান, সেঞ্চুরি, পরিসংখ্যান আর রেকর্ডের খতিয়ান, এগুলো স্রেফ কিছু সংখ্যা নয়। এসবে মিশে আছে তার অনেক ঘাম, শ্রম, ত্যাগ, নিবেদন আর প্রতিজ্ঞা। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর মাঠের ভেতরে-বাইরে শৃঙ্খলার ছকে সাজানো জীবন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি, ছুটির সঙ্গে আড়ি, ক্লান্তির সঙ্গে লড়াই, প্রত্যাশার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা আর উঁচুতে ওঠার তাড়না। এই সংখ্যাগুলো স্বাক্ষ্য দেবে তার নির্ভরতারও। দুই দশকের বেশি সময় হয়ে দলর ভরসা হয়ে থাকা। এই ইনিংসটিতেও মিশে আছে যেন তার ক্যারিয়ারের সবকিছুই। তৃতীয় তিন সকালে যখন ক্রিজে যান, জরুরি ছিল একটি জুটি। আকাশ ছিল মেঘলা, বল মুভ করছিল বেশ। পাকিস্তানি বোলাররাও দারুণ বল করছিলেন তখন। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত বিদায় নিলেন দ্রুতই। মুশফিক ঠিকই সব সামলে নিলেন তার চওড়া ব্যাটে। শুরুর সেই চ্যালেঞ্জিং সময় কাটিয়ে দিলেন বরাবরের মতোই আস্থায়। সময়ের সঙ্গে বাড়াতে থাকলেন রান। লিটন দাসের সঙ্গে গড়ে উঠল শতরানের জুটি। পঞ্চম বা এর নিচের জুটিতে এই নিয়ে সপ্তমবার শতরানের বন্ধন গড়লেন তারা। টেস্ট ইতিহাসের এখানে তাদের ওপরে আছে কেবল ইংল্যান্ডের জো রুট ও বেন স্টোকস জুটি (৮টি)। লিটন যখন ফিরলেন, দল তখস শক্ত অবস্থানে। তবে মুশফিকের শেষ নয় সেখানেই। তাইজুল ইসলামকে নিয়ে পাকিস্তানকে পিষে ফেলার আয়োজন করলেন তিনি। চা-বিরতিতে যান তিনি ৯০ রান নিয়ে। বিরতির আগের ওভারেই শান মাসুদের সঙ্গে তার ও শাকিলের সঙ্গে তাইজুলের সেই ঘটনা। বিরতির পর মোহাম্মাদ আব্বাসের বল লাগে তার পায়ে। আম্পায়ার আউট না দেওয়ায় রিভিউ নেয় পাকিস্তান। বড় পর্দায় যখন দেখা গেল, বল চলে যাচ্ছিল স্টাম্পের একটু ওপর দিয়ে, বড় পর্দায় তাকিয়ে হতাশ হয়ে মাঠেই বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন পাকিস্তানিরা। সেই হতাশা আরও বাড়িয়ে একটু পরই মুশফিক শতরানে পা রাখলেন ১৭৮ বলে। সেই উদযাপনের পর আবার নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে মনোযোগ দিলেন আবার নতুন করে। ইনিংস এগিয়ে নিলেন আরও কিছুটা দূর। পাকিস্তানের সম্ভাবনাও তাতে দূর থেকে দূর সরে যেতে থাকল আরও। টেস্ট ক্রিকেটে তার ২১ বছর পূর্ণ হবে সপ্তাহখানেক পর। বাংলাদেশ ক্রিকেটের কতো চড়াই-উৎরাই, কতো উত্থান-পতনের স্বাক্ষী তিনি। দেশের ক্রিকেটের কত কিছু বদলে গেছে- প্রজন্ম বদলেছে, যুগ পেরিয়েছে, সময় গড়িয়েছে- কিন্তু মুশফিকুর রহিম গতকালও বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতার প্রতিশব্দ হয়ে আছেন।