প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৬ মে, ২০২৬
মসনবির প্রথম, প্রধান ও শেষ শিক্ষা প্রেম। বিশ্বপ্রেমের সঙ্গে আত্মার সংযোগ। তার জন্য প্রথম প্রয়োজন জাগতিক লোভ-মোহের বাঁধন থেকে মুক্তি লাভ। হৃদয়কে স্বচ্ছ আয়নার মতো পরিচ্ছন্ন করলেই আল্লাহ্র নুর প্রতিবিম্বিত হবে, আর এ আলোয় তার জীবন ও জগৎ আলোকিত হবে। কিন্তু আমাদের মন ও জীবন যে বস্তুর প্রেমে, জগৎ নামের দাসীকে নিয়ে ব্যস্ত-মত্ত, আমাদের উপায় কী? মওলানা রুমি (রহ.) সে উপায় বাতলে দিতে চান মসনবির প্রথম রূপক গল্প বাদশাহ-বাঁদির প্রেম কাহিনির বাঁকে বাঁকে।
কাহিনি-সংক্ষেপ
একদা এক বাদশাহ শিকারের উদ্দেশ্যে সহচর সমেত বনে যাচ্ছিলেন। পথে এক পরমা সুন্দরী তরুণী দাসী তার নজর কাড়ে। বাদশাহ শিকারের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন; কিন্তু নিজেই শিকার হয়ে গেলেন। দাসীর প্রেমের শিকারে পরিণত হলেন। অনেক অর্থের বিনিময়ে দাসীকে খরিদ করে ফিরে এলেন রাজপ্রাসাদে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, দাসী রোগে আক্রান্ত হলো। কিছুতেই রোগ সারে না। সারা দেশের সেরা হেকিমদের জড়ো করলেন বাদশাহ, দাসীর চিকিৎসার জন্য। বলে দিলেন, দাসী বাঁচলেই কিন্তু আমিও বাঁচব।
হেকিমরা বাদশাহকে অভয় দিলেন, আমাদের দক্ষ চিকিৎসায় অবশ্যই রোগী ভাল হবে। কিন্তু অহংকারের বশে তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ (আল্লাহ চাহেন তো) না বলে মারাত্মক ভুল করলেন। তাতে হিতে বিপরীত হলো। চিকিৎসায় বাঁদির অবস্থার অবনতি হতে লাগল। হতাশ বাদশাহ ছুটে গেলেন মসজিদে। মেহরাবে সেজদায় পড়ে মাটি ভিজিয়ে দিলেন চোখের পানিতে। কান্না-ক্লান্ত বাদশাহ ঢলে পড়লেন ঘুমের কোলে। তখন স্বপ্নে দেখেন এক সৌম্য মূর্তির অলি-আল্লাহকে। বললেন : কাল আপনার কাছে একজন হেকিম আসবেন, তার হাতেই আপনার দাসীর সুচিকিৎসা হবে, আরোগ্য পাবে।
ভোরে রাজপ্রাসাদে অপেক্ষমান বাদশাহ ঠিকই এক হেকিমের সাক্ষাৎ পেলেন। হেকিম রোগিণীর শিরা পরীক্ষা করে বুঝলেন, প্রেমের রোগে আক্রান্ত দাসীর প্রাণের মানুষ সমরকন্দের এক স্বর্ণকার। কিন্তু বাদশাহকে বললেন না। বললেন, স্বর্ণকারকে নিয়ে আসতে হবে সমরকন্দ হতে রাজপ্রাসাদে। স্বর্ণকার রাজ-দরবারে আসলে দাসীকে ফেরত দেওয়া হয় তার কাছে। তারপর দু’জন-দু’জনায় ছয় মাস কাটিয়ে পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল দাসী। এরপর হেকিমের পরামর্শে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে খাওয়ানো হয় স্বর্ণকারকে। এর ফলে স্বর্ণকারের স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে, তার সঙ্গে দাসীর প্রেমাসক্তিও কমতে থাকে। কারণ, স্বর্ণকারের প্রতি দাসীর প্রেম ছিল জৈবিক, দেহগত, বস্তুনির্ভর। স্বাস্থ্যহীন স্বর্ণকারের প্রেমাসক্তি হতে দাসী সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে গেল। ততক্ষণে স্বর্ণকার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। এখন দাসী বাদশাহর বাহু-বন্ধনে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এসে গেল।
মনীষীদের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন : মসনবীর ব্যাখ্যাতা মনিষীগণ এ কাহিনিকে রূপক গল্প হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তারা কাহিনির ভিন্ন অর্থ গ্রহণ করেছেন। এ কাহিনিতে বাদশাহ হলেন আকল ও রূহের রূপক। বাঁদী হচ্ছে নফসে আম্মারা। স্বর্ণকারের প্রতি বাঁদীর প্রেম দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসের প্রতি নফস আম্মারার আসক্তির পরিচায়ক। অদৃশ্য জগতের আধ্যাত্মিক চিকিৎসকই নফস আম্মারার রোগ ধরতে পারেন এবং তিনিই তার সুচিকিৎসা করতে সক্ষম। তিনি রূহ ও আকলকে শাহওয়াতে নফসানী বা প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার ফাঁদ থেকে উদ্ধার করেন। প্রফেসর নিকলসন কাহিনির এরূপ ব্যাখ্যার পক্ষপাতি।
মওলানা থানবি (রহ.) উপরোক্ত ঘটনার গূঢ়রহস্য বর্ণনা করেছেন এভাবে : ‘এ কাহিনি মূলত আমাদের বাস্তব অবস্থার অনুরূপ। অনুরূপতা এ দিক থেকে যে, কাহিনিতে যেভাবে বাদশাহ বাঁদির ওপর প্রেমাসক্ত হয়েছেন তদ্রূপ আমাদের রূহরূপী বাদশাহ, নফসরূপী দাসীর ওপর প্রেমাসক্ত হয়ে তার অনুগত হয়ে গেছে। বাঁদি যেরূপ স্বর্ণকারের প্রতি আশেক ছিল তেমনি নফসও দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসের প্রতি আশেক হয়ে আছে। বাদশাহ যেভাবে বাঁদির চিকিৎসার জন্য অদক্ষ হেকিমদের সাহায্য নিয়েছেন, অথচ কোনো ফায়দা হয়নি। তেমনি অপক্ব পীরদের কাছে গিয়ে কোনো ফায়দা হবে না। কাহিনিতে গায়বী হেকিম যেভাবে চিকিৎসা করলেন এবং স্বর্ণকারকে বিষপানে কুৎসিত আকৃতির বানিয়ে দিলেন, যাতে তার প্রতি বাঁদীর মনে ঘৃণার সৃষ্টি হয়, অতঃপর স্বর্ণকারকে মেরে ফেললেন এবং এ পন্থায় বাঁদীর সুচিকিৎসা করলেন, তদ্রূপ কামেল পীর দুনিয়াবী ভোগ বিলাসের আসক্তিকে ক্রমান¦য়ে নফস থেকে পৃথক করে ফেলেন। এক পর্যায়ে নফস সেগুলো ত্যাগ করে এবং নফসানী রোগব্যাধি হতে মুক্তি পায়। এরপর বাদশাহ রূহ, নফসের দ্বারা উপকৃত হয়।
মোটকথা এ শিক্ষণীয় বিষয়টি পাওয়া গেল যে, যদি হৃদয়ের মরিচা দূর করতে চাও, তাহলে কামেল পীরের শরণাপন্ন হও। তার আদেশ-নিষেধ মেনে চল। তিনি যথাযথ পন্থায় তোমার রোগের চিকিৎসা করবেন।
মওলানা রুমি (রহ.)-এর বক্তব্যের দুটি প্রধান বিষয় রয়েছে। একটি বিষয়, যা পরম কাম্য তা হলো তাওহীদ। দ্বিতীয়টি হলো তাওহীদে উপনীত হওয়ার কর্মপন্থা অর্থাৎ শেখে কামেল বা কামেল পীরের আনুগত্য। (কলিদে মসনবি, প্রথম দপ্তর, পৃষ্ঠা : ১৩)।
ড. বদিউজ্জামান ফরুজানফার এ ধরনের ব্যাখ্যাকে পছন্দ করেননি। তিনি বলেন, ‘এ জাতীয় ব্যাখ্যা মওলানার রুচির সাথে খাপ খায় না। কারণ হচ্ছে, সাধারণত মসনবিতে গল্প, কাহিনি ও উপমা কোনো বিষয় বা বক্তব্যের ব্যাখ্যা ও বর্ণনার যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং বক্তব্য ও বিষয়গুলোর প্রতি পাঠক ও শ্রোতার মনোযোগ আকর্ষণের মাধ্যম হিসেবে গল্প-কাহিনির অবতারণা করা হয়। মাওলানা চান না যে, এসব কাহিনি বা গল্পকে নৈতিক বা সামাজিক বিষয়ের আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা হোক। এ জন্য আমরা দেখতে পাই, মসনবিতে এমন কতক কাহিনি বর্ণনা করা হয়েছে যেগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে কুৎসিত ও অপছন্দনীয়। কিন্তু তদ্ধারা যেহেতু কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বা আসল বক্তব্য পরিষ্কাররূপে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে সেহেতু মওলানা সেসব উপমা বা গল্প বর্ণনা থেকে বিরত থাকেননি। কারণ গল্পের কাঠামো বা তার অংশগুলো কী রকম হচ্ছে তার প্রতি মওলানার আদৌ দৃষ্টি নেই। তিনি গল্প ও উপমাকে দাঁড়িপাল্লা বা মাপকযন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছেন। দৃশ্যত এ গল্পেও তিনি গল্পের আঙ্গিক কাঠামোকে মোটেও গুরুত্ব দেননি; বরং এর ফলাফলই তার লক্ষ্য ছিল।’ (শারহে মসনবি শরিফ, পৃষ্ঠা : ৫০)।
আমার ক্ষুদ্র অনুভবে জনাব ফরুযানফারের ব্যাখ্যাই সঠিক। কারণ মওলানার উদ্দেশ্য কাহিনি বর্ণনা নয়, বরং কাহিনির ছদ্মাবরণে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও গূঢ়-রহস্যগুলো ব্যাখ্যা করাই তাঁর লক্ষ্য। এ জন্য দেখা যায়, তিনি কোনো গল্প কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে নানা ধর্মীয়, নৈতিক ও দার্শনিক বিষয় এমনভাবে তুলে ধরেন, যা পড়তে গিয়ে মনে হবে মওলানা নিজেই কাহিনি শেষ করার কথা ভুলে গেছেন। আবার দেখা যাবে, এক কাহিনি শেষ না করেই আরেক কাহিনির অবতারণ করেছেন। এভাবে ‘এক গল্পের মাঝে আরেক গল্পের’ আধিক্যে সাধারণত ওই সব পাঠক অস্বস্তি ও বিরক্তি বোধ করবেন, যারা মসনবিকে কোনো কাহিনিকাব্য মনে করে এর রস আস্বাদনের চেষ্টা করেন।
মসনবীর কাহিনিগুলোকে কোনো দেশের পর্যটন বিভাগের সুসজ্জিত গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা যায়। এ ধরনের গাড়িতে পর্যটকদের নিয়ে কোনো ঐতিহাসিক স্থানে নামানো হয়। গাইড সেখানকার ঐতিহাসিক বিষয় ও নিদর্শনগুলোর বর্ণনা দেন। আবার যাত্রীদের তুলে কোনো পরিত্যক্ত স্থানে নিয়ে নামান, সেখানকার দৃশ্যাবলী দেখানোর পর আবার গাড়িতে ওঠান। এভাবে মনোরম হোক বা দৃশ্যত অপছন্দনীয় হোক, নানা গম্য-অগম্য স্থানে নিয়ে যান। স্থূলদৃষ্টির যাত্রীরা হয়ত বলবে, এত অল্প রাস্তা পাড়ি দিতে এতবার দাঁড়াল কেন, গাইডের এত কথা বলার দরকার কী ছিল? শহরটি এক চক্কর ঘুরিয়ে আনলেই তো হত। শহরের প্রাচীন স্থাপত্যের দুর্গন্ধময় গলিতে নিয়ে গেলেন কেন? কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী পর্যটকরা এমন গাইড ও ভ্রমনের জন্য নিজকে ধন্য মনে করবেন।
বুঝতে হবে যে, গাইডের উদ্দেশ্য শুধু শহরের কয়েকটি সড়কে বা মোড়ে চক্কর দেয়া নয়, প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থান ও নিদর্শন খতিয়ে দেখানোই উদ্দেশ্য। মসনবি শরিফকেও সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই কোনো বিরক্তির ছোঁয়া লাগবে না। আধ্যাত্মিক তৃপ্তিতে মন ভরে যাবে। অন্যথায় একে সুন্দর সুখপাঠ্য কাহিনি কাব্য মনে করলে সম্পূর্ণ নিরাশ হতে হবে। বাদশাহ ও বাঁদীর প্রেম কাহিনিকেও আমরা এই নিরিখে আধ্যাত্মিক শরাব পানের পেয়ালা অথবা আধ্যাত্মিক জগতের রহস্য দর্শনের উদ্দেশ্যে পর্যটনের গাড়ি মনে করব। তাহলেই স্বর্ণকারকে বিষপ্রয়োগে হত্যার মতো জটিল প্রশ্নের সমাধান মিলবে। মওলানা রুমির বিশ্লেষণের ধারাভাষ্য সামনে আনলেই এ বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং এ সম্পর্কিত যে কোনো প্রশ্নের জবার পাওয়া যাবে।
গল্পের উপসংহারে মওলানা সতর্ক করে বলেছেন, আল্লাহ্্র কাজ এবং অলি-আল্লাহ্দের কাজকে নিজের সাথে তুলনা করা মারাত্মক ভুল। নিজের অবস্থা ও অবস্থান ভালো করে চিন্তা করে দেখ, তাহলেই এর হাকীকত বুঝতে পারবে। আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনায় আমরা সে সত্যের সাক্ষাৎ পাই। আমাদের জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, তাৎক্ষণিকভাবে মনে হয় তাতে আমাদের জন্য কোনো কল্যাণ নাই; এমনকি নিজের জন্য ক্ষতিকর মনে করে অস্থির হয়ে উঠি, অধৈর্য হয়ে যাই; কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময় যাওয়ার পর ঘটনার প্রকৃত কল্যাণ আমাদের সামনে আসে। কাজেই আল্লাহর কাজকে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনার মানদণ্ডে বিচার করতে নাই।
একইভাবে আল্লাহর অলীদের কোনো কোনো কাজ সাধারণ দৃষ্টিতে বুঝে আসবে না, আপত্তিকর মনে হতে পারে। এর আসল কারণ, নির্বোধ লোকেরা আল্লাহর নবী (আ.) ও অলীদের নিজের সঙ্গে তুলনা করে। তাতে মারাত্মক ভ্রম ও পরিণতির শিকার হয়। মওলানা বলছেন : তোমার মধ্যে আর ঐ শ্রেণীর মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। তাদের নিকট আল্লাহর আদেশ ও ইলহাম আসে। তারা সেই নির্দেশনা অনুসারেই কাজ করেন। উপরের গল্পে গায়েবী হেকিম সেরূপ ইলহাম যোগেই দাসীর চিকিৎসা করেন। কোরআন মজীদে মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর ঘটনাও এর নিরিখে বুঝতে হবে।
বস্তুত সবকিছুকে নিজের উপর তুলনা করে বিচার করলে কী ধরনের বিভ্রাট ঘটে এবং গোটা সৃষ্টিতে একই ধরনের বস্তুর পরস্পরে যে তারতম্য বিরাজমান তার ব্যাখ্যায় মওলানা আরেকটি গল্পের অবতারনা করছেন।