ঢাকা শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মওলানা রুমির মসনবি শরিফ

রক্তের প্রবাহ খুনিকে তাড়া করে

ড. মওলানা মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী
রক্তের প্রবাহ খুনিকে তাড়া করে

এশ্‌কহা'য়ী কায পেয়ে রাঙ্গী বুয়াদ

এশ্‌ক নাব্‌ওয়াদ আ'কেবাত নাঙ্গী বুয়াদ

যে প্রেম শুধু রং-রূপের আকর্ষণে হয়

প্রেম নয়, অনুতাপ-লজ্জাই তার পরিণাম হয়।

কা'শ কা'ন হাম নাঙ্গ বূদী য়্যকসারী

তা' নারাফতী বারওয়াই আ'ন বাদ দা'ওয়ারী

হায়! যদি সে প্রথম থেকে রূপ লাবণ্য বঞ্চিত হতো

তার ওপর এমন অবিচার অন্যায় তবে না হতো।

অনেকের গুণ, যোগ্যতা, প্রতিভা তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কর্মজীবনে আমরা প্রতিনিয়ত এই সত্যের সম্মুখীন হই। অপরদিকে পূর্বাপর না ভেবে কোনো খ্যাতি, যশ ও পুরস্কারের লোভও মানুষকে বিপদে ফেলে। গল্পের এ অংশে এ বিষয়টির প্রতিই মওলানা ইঙ্গিত করেছেন। মওলানা বলছেন, স্বর্ণকারের অবস্থা এতই শোচনীয় হলো যে—

খোন দাওয়ীদ আয চাশ্‌মে হামচোন জূয়ে উ

দুশমানে জা'নে ওয়েই আ'মাদ রূয়ে উ

রক্তের ধারা ছুটল চোখ বেয়ে যেন ঝর্নার ধারা

দুশমানে তা'উস আ'মাদ র্পারে উ

এই বাসী শাহ রা' বেকুশ্‌তে র্ফারে উ

ময়ূরের শত্রু যে তার বর্ণালি পুচ্ছ-পালক

কত বাদশাহকে হত্যা করল নিজের শান-শওকত।

স্বর্ণকার তার নির্ঘাত মৃত্যুর পূর্বাভাস বুঝে স্বগতোক্তি করে। তার যবানীতে জীবন ও জগতের অনেক সত্য প্রকাশিত হয়। যেমন—

গোফত মান আ'ন আ'হুয়াম কায না'ফে মান

রীখ্‌ত্‌ আ'ন সাইয়াদ খূনে সা'ফে মান

বলল, আমি সেই মৃগ, যার নাভির লোভে

শিকারী ঝরালো আমার স্বচ্ছ শোণিত লহু।

এই মান আ'ন রূবা'হে সাহরা' কায কামীন

সার বুরীদান্দাশ বারা'য়ে পূসতীন

ওহে আমি সেই বনের শিয়াল যাকে ওঁত পেতে

মাথা কেটে বুক চিরে ফেলে চামড়ার মোহে।

এই মান আ'ন পীলী কে যাখ্‌মে পীলবা'ন

রীখত খূনাম আয বারা'য়ে ওস্তোখা'ন

ওহে আমি সেই হস্তি, শিকারি যাকে

আঘাতে খুন ঝরায় দাঁত ও অস্থির লোভে।

খুনিরা খুন করে, লাশ গুম করে আর ভাবে, শত্রু নিধন করে ভবিষ্যত নিষ্কণ্টক করেছি। মওলানা বলেন, এ ধারণা মিথ্যা। খুনের রক্তের প্রবাহ থামে না; খুনিকে তাড়া করে বেড়ায়।

আ'ন্‌ক কুশতাস্‌তাম পেয়ে মা' দূনে মান

মী নাদা'নাদ কে নাখাস্‌পাদ খূনে মান

যে আমাকে হত্যা করেছে তুচ্ছ জিনিসের জন্য

জানে না আমার এ খুন যে থামবে না কখনও।

বার মানাস্ত এমরোয ও ফার্দা' বার ওয়াই আস্ত

খূনে চোন মান্‌ কাস্‌ চোনীন যা'য়ে কেয় আস্ত

আজ আমার পালা কাল তার অপেক্ষায়

আমার মতো লোকের রক্ত বৃথা যায় কোথায়?

শুধু তাই নয়, কর্মফলের হাত থেকে কারও রক্ষা নেই। মানুষ যে কর্মই করুক ভালো বা মন্দ, তা তার দিকেই ফিরে আসে। উদাহরণ স্বরূপ মওলানা বলেন :

গারচে দীওয়া'র আফগানাদ সা'য়ে দেরা'য

বা'য গার্দাদ সূয়ে উ আ'ন সা'য়ে বা'য

যদিও দেয়াল বিস্তার করে দীর্ঘ ছায়া

ফিরে আসে তার দিকে পুনঃ সেই ছায়া।

ঈন জাহা'ন কূহ আস্ত ও ফে'লে মা' নেদা'

সূয়ে মা' আ'য়াদ নেদা'হা'রা' সেদা'

এই জগত পর্বত আর আমাদের কর্ম হচ্ছে ধ্বনি

আমাদের দিকেই ফিরে আসে ধ্বনির প্রতিধ্বনি।

পাহাড়ের প্রান্তদেশে দাঁড়িয়ে কেউ যদি জোরে চিৎকার দেয়, সে চিৎকার ধ্বনি পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে তার দিকে ফিরে আসে। তেমনি আমাদের কর্মও জগতরূপী পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে হুবহু আমাদের দিকে ফিরে আসে। নিজ কর্মের ফলাফলের হাত থেকে কারও রেহাই নেই। কাজেই সাবধানে থাকতে হবে প্রতিটি কথায়, কাজে ও আচরণে।

ঈন বেগোফ্‌ত ও রাফ্‌ত দার দাম যীরে খা'ক

আ'ন কানীযাক শুদ যে এশ্‌ক ও রাঞ্জ পা'ক

কথাগুলো বলল আর মুহূর্তে মাটির নিচে চলে গেল

ওই দাসী রোগ-শোক ও প্রেম হতে মুক্তি পেল।

যান্‌কে এশকে মুর্দেগান পা'য়ান্দে নীস্ত

যান্‌কে মুর্দে সূয়ে মা' আয়ান্দে নীস্ত

কারণ মরণশীলদের সাথে যে প্রেম, স্থায়ী হয় না

মরণশীল মরে যায়, আমাদের পানে ফিরে আসে না।

মরণশীল মানুষ ও বস্তুর সা পার্থিব প্রেমের এটাই পরিণাম। রূপ-জৌলুস ফুরিয়ে গেলে প্রেমও লোপ পায়। এর বিপরীতে চিরঞ্জীবের সঙ্গে প্রেমের মাহাত্ম্য হচ্ছে :

এশকে যিন্দা দার রাওয়া'ন ও দার বাসার

হার দামী বা'শাদ যে গোন্‌চে তা'যাতার

যিন্দার সঙ্গে প্রেম সে তো হৃদয়ে, দুই নয়নে

ফুলকলির চেয়ে তরতাজা থাকে প্রতিক্ষণে।

এশকে আ'ন যিন্দা গুযীন কূ বা'কীয়াস্ত

কায শরা'বে জা'ন ফাযা'য়াত সা'ক্বীয়াস্ত

প্রেম কর সেই জীবন্তের সাথে চিরঞ্জীব যিনি

তোমার প্রাণ বর্ধক শরাবের সাকী তিনি।

এশকে আ'ন বুগ্‌যীন কে জুমলা আম্বিয়া'

য়া'ফতন্দ আয এশকে উ কা'র ও কিয়া'

প্রেম কর তার সঙ্গে সকল নবী ও রাসুল

যার প্রেমে ধন্য তাঁরা জগতে অতুল।

সেই মহামহিমের সঙ্গে প্রেম কর! নবী-রাসুলগণ যার প্রেমে ধন্য হয়েছেন এবং ধন্য করেছেন এই জগত। মওলানা তার সঙ্গে প্রেমের বন্ধন গড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু তা কি সম্ভব আমাদের মতো সাধারণ লোকের পক্ষে? সে কথা কি কেউ চিন্তা করারও সাহস করতে পারে? মওলানা তার জবাব দিয়ে বলেছেন, তিনিই যদি তোমাকে চান তাহলে অসম্ভব কিসের? বলছেন :

তো মগো মা'রা' বেদা'ন শাহ্‌ বা'র নীস্ত

বা' করীমা'ন কা'রহা' দুশওয়া'র নীস্ত

তুমি বলো না, সে বাদশাহর দরবারে যাবার আমার সাধ্য নাই।

কারণ, যারা মহৎ প্রাণ তাদের জন্য কঠিন কিছুই নাই।

তিনিই তোমার যাবার ব্যবস্থা করে দেবেন। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ পাক বলেন, 'যে আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ অগ্রসর হবে, আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হব। যে আমার প্রতি এক হাত অগ্রসর হবে, আমি তার প্রতি এক বাঁও (প্রসারিত দুই হাত পরিমাণ) অগ্রসর হব। যে আমার প্রতি স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে আসবে, আমি তার প্রতি দ্রুতগতিতে আসব। যে আমার প্রতি দ্রুতগতিতে আসবে আমি তার প্রতি দৌড়ে আসব। যে আমার নিকট জগতভর্তি গুনাহ (-র বোঝা মাথায়) নিয়ে আমার সাথে শরীক করা ছাড়া (তওবার জন্য) আসবে, আমিও তার প্রতি ওই পরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে আসব...।' (মুসলিমের বরাতে মিশ্‌কাত; আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা অধ্যায়।)

(ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী রচিত মসনবি শরিফের গল্প ১-৬ খণ্ড প্রকাশ করেছে, ছায়াপথ প্রকাশনী ৩১/১, পুরানা পল্টন, (শরিফ কমপ্লেক্স) লিফট-৪, ঢাকা-১০০০। ফোন ০১৭১১১১৫৮২৯। মসনবির গল্পভিত্তিক আলোচনা শুনতে ইউটিউবে ভিজিট করুন— CHAYAPATH PROKASHONI)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত