
চলতি মৌসুমে বর্ষাকালে তুলনামূলক কম ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত সত্ত্বেও সরকারি কৃষি প্রণোদনা ও কৃষি বিভাগের নানামুখী উদ্যোগে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় রোপা আমনের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এতে কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে আনন্দ ও উৎসাহ বিরাজ করছে। পোকামাকড় দমনে পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জমিতে সেচ দিয়েছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১ লাখ ৭ হাজার কৃষকের মধ্যে কৃষি প্রণোদনা বিতরণ করা হয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ২০ কেজি সার ও ৫ কেজি ধানের বীজ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর এ অঞ্চলে হাইব্রিড জাতের ৩ লাখ ১৪ হাজার ২২১ মেট্রিক টন, উফশী জাতের ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৭০ মেট্রিক টন এবং স্থানীয় জাতের ২০ হাজার ৭৩৭ মেট্রিক টনসহ মোট ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ মেট্রিক টন আমন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছর পাঁচ জেলায় উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ২ হাজার ৪৯৬ মেট্রিক টন। সে হিসাবে এবার গত বছরের তুলনায় ২ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন বেশি উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
জেলা ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৮৮৬ মেট্রিক টন, গাইবান্ধায় ৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৪৩ মেট্রিক টন, কুড়িগ্রামে ৩ লাখ ৮৯ হাজার ১০৪ মেট্রিক টন, লালমনিরহাটে ২ লাখ ৭০ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন এবং নীলফামারীতে ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯১ মেট্রিক টন রোপা আমন উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন ধানের চাষ হয়েছে। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধানের ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার জেলার খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মেট্রিক টনের বেশি চাল উদ্বৃত্ত থাকবে। এই চাল দিয়ে অন্য জেলার চাহিদাও মেটানো সম্ভব হবে।
রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল আলম জানান, চলতি বছর রংপুর জেলায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা মোট রোপা আমন আবাদি জমির প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ১৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে লাইভ পার্চিং বা ধইঞ্চা গাছের মাধ্যমে এবং ১ লাখ ৩১ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমিতে ডেড পার্চিং বা গাছের ডাল, বাঁশের কঞ্চি ও বাঁশের বাতা ব্যবহার করে পাখি বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ড. এস এম আবু বকর সরিফুল জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে আমন ধানের বাম্পার ফলনের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংস্থার সহায়তায় কৃষকরা প্রয়োজনে আমন খেতে সেচ দিয়েছেন। ফলে ধানের চারাগুলো ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পেরেছে। এ ছাড়া পুরো মৌসুমে মাঝেমধ্যে হওয়া বৃষ্টিপাত আমন ধানের চারা বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে টনিকের মতো কাজ করেছে।
তিনি বলেন, মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকায় আমন ধানের চারাগুলো বর্তমানে বেশ ভালোভাবে বেড়ে উঠেছে। ফসল কাটার আগ পর্যন্ত আর বৃষ্টি না হলেও এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শিগগির বৃষ্টিপাত হলে অথবা অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে দেরিতে রোপণ করা আমন খেতে কৃষকরা আরও এক-দুবার সেচ দিতে পারলে সেখানেও ফলন বেশি হবে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে আমন ধানের বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্যে ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ জমিতে ছড়া বের হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়, ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশে থোড় আসা বা বুটিং পর্যায়, ৩৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে ফুল আসার পর্যায়, ১৬ দশমিক ২৬ শতাংশে দানা গঠনের প্রাথমিক পর্যায় বা মিল্কিং স্টেজ এবং ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশে দানা শক্ত হওয়ার পর্যায় বা ডাফ স্টেজ রয়েছে। এ ছাড়া ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির ধান পাকার পর্যায়ে রয়েছে এবং ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে।
এর আগে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে চলতি বছর এ অঞ্চলে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে ২০ লাখ ৫ হাজার ২৮ মেট্রিক টন পরিষ্কার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ধানের হিসাবে এর পরিমাণ ৩০ লাখ ৭ হাজার ৫৪২ মেট্রিক টন। প্রাথমিক পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার কারণে পানির সংকটসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলের কৃষকরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমনের চারা রোপণ করেছেন, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪০ হেক্টর বেশি।
চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলে ১ লাখ ১৩ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে স্বল্পমেয়াদি আমন ধানের চাষ হয়েছে। বর্তমানে এসব ধান কাটার কাজ চলছে, যা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত এ অঞ্চলে কৃষকরা ২২ হাজার ৪৩৬ হেক্টর জমির স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কেটেছেন।
ভালো ফলনের পাশাপাশি নতুন মৌসুমের আমন ধানের অনুকূল বাজারমূল্য গ্রামীণ এলাকার কৃষকদের মধ্যে আনন্দ বয়ে এনেছে। রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলার কৃষক পরিবারগুলোতে এখন ঐতিহ্যবাহী নবান্ন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
সম্প্রতি রংপুরের বিভিন্ন এলাকার আমন ধানের মাঠ পরিদর্শন শেষে অতিরিক্ত পরিচালক আরও জানান, কৃষকরা এবার আমন ধানের বাম্পার ফলনের অপেক্ষায় রয়েছেন। আগামী মাস থেকেই ধান কাটার কাজ পুরোদমে শুরু হবে। এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা, আবার কোথাও বেড়ে ওঠা ধানগাছ মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার কৃষক মফিজার রহমান, বাবুল হোসেন, সোলায়মান আলী ও বদিউল ইসলাম জানান, স্বল্পমেয়াদি আমন ধান চাষ করে তারা ভালো ফলন পাচ্ছেন। রংপুর সদর উপজেলার কাঠিহারা গ্রামের কৃষক আলহাজ ইসহাক আলী পাশাপ জানান, আগামী মাস থেকে তার জমিতে লাগানো স্বল্পমেয়াদি আমন ধান কাটা শুরু করবেন। তিনি বলেন, তাদের এলাকার কৃষকরা এবার প্রতি একর জমিতে ৫০ মণ পর্যন্ত আমন ধান পাওয়ার আশা করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ ড. এস এম আবু বকর সরিফুল আরও বলেন, বর্তমান সরকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছেন, যাতে পুরো অঞ্চলে আমন ধানের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়।
এ মৌসুমে আমন ধান চাষের সময় কৃষকরা জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি পোকামাকড় দমন ও ভালো ফলন নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি এবং অর্গানিক লাইট ট্র্যাপ বা আলোর ফাঁদ ব্যবহার করেছেন।