ঢাকা শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

ছোটগল্প

অভিমানের দরজা

পঙ্কজ শীল
অভিমানের দরজা

ঢাকার মোহাম্মদপুরে পুরনো একতলা বাড়ির জানালার ধারে বসে আছেন সরোজিনী। বয়স পঁচাত্তর ছুঁইছুঁই, কিন্তু শরীরটাকে এখনও যত্নে রেখেছেন। সাদা শাড়ি, হাতে কাঁপা কাঁপা চুড়ি, চুলে হালকা পাক ধরা। জানালার ওপাশে স্কুলছুট ছেলেমেয়েরা ঝগড়া করছে- কেউ বল কাড়ছে, কেউ কারো ঠোঁট বাঁকিয়ে তাকাচ্ছে। অথচ এই ছোট ছোট ঝগড়ার মধ্যেই আছে মিষ্টি মিষ্টি মান-অভিমান, অভিমানের দরজা খোলার জন্য কারো মুখ থুবড়ে কান্না বা কারো চুপিচুপি ক্ষমা চাওয়া।

কিন্তু সরোজিনীর অভিমানের দরজা যেন অনেক বছর ধরেই বন্ধ।

তার স্বামী বিমলেশ মারা গেছেন বছর দশেক আগে। ছেলেমেয়ে তিনজন সবাই বিদেশে। ফোন করে, ভিডিও কলে কথা বলে, মাঝেমধ্যে টাকা পাঠায়। কিন্তু বাড়িতে কেউ আসে না।

ছোট ছেলে অভিজিৎ ছিল একসময় মায়ের সবচেয়ে প্রিয়। স্কুল থেকে ফিরেই বলত, ‘মা, আজ তো অঙ্কে ফুল মার্কস পেয়েছি!’

মা আদরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, পিঠ চাপড়াতেন।

বড় হয়ে সেই অভিজিৎই একদিন বলেছিল, ‘মা, তুমি শুধু আমাদের ছোটবেলার কথা ভাবো। আমরা এখন আমাদের মতো করে বাঁচতে চাই।’

কথাটা সরোজিনীর বুকে বিঁধেছিল।

আজ তিন বছর হয়ে গেল সরোজিনী শেষবার ওদের কাউকে সরাসরি দেখেননি। পূজায় এসেছিল অভিজিৎ, স্ত্রী মধুরিমা আর তাদের সন্তান রুহিত। একরাশ উপহার, একগাদা গল্প আর ব্যস্ততার চেহারা নিয়ে হাজির হয়েছিল।

তিনদিনেই ফিরে গিয়েছিল।

তবু সে-সময় মায়ের বুকটা উষ্ণ হয়েছিল। তারপর আর আসেনি কেউ।

আজকের সকালের চিঠিটা যেন একটু আলাদা।

সাদা খামে ইংরেজিতে ঠিকানা লেখা। অভিজিতের হাতের লেখা নয়, কিন্তু খামের কোণে ওর নাম- Dr. Abhijit Sen, Toronto General Hospital, Canada.

চিঠি খুলতেই এক পাতার মলিন কাগজে মধুরিমার লেখা :

মা, অভিজিৎ এখন আর আগের মতো নেই। শরীর খারাপ, চিকিৎসা চলছে, মনে অনেক কথা জমে আছে। আপনি কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবেন?

চিঠিটা বুকের ওপর চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন সরোজিনী। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু কাকে বলবেন?

পেছনের বারান্দায় ছাদে ওঠার সিঁড়ি। সেখানে একটি চেয়ার পড়ে থাকে, যেটা সারাবছরে একবারই ব্যবহার হয়- বিজয়ার দিন। বাড়ির পুরনো চাকর মনু থাকে এখানে। বয়স ষাট পেরিয়েছে, কিন্তু মা-ছেলের সম্পর্ক যা হওয়ার কথা ছিল, তার ছায়া ছুঁয়ে আছে মনু আর সরোজিনীর মধ্যে।

মনু এসে বলল, ‘মা, দুপুরে কিছু খাবেন না?’

সরোজিনী কিছু বললেন না। শুধু মৃদু মাথা নাড়লেন।

মনু বোঝে, মায়ের অভিমান আবার ফিরে এসেছে। অভিজিৎ, অনিমেষ আর শালিনী- তিন সন্তান যেন যার যার মতো দূরের কোনো জাহাজ হয়ে গেছে। একসময়ের আলো-ঝলমলে সংসার আজ একলা একটা ঘর।

একসময় এই ঘরে কত হইচই ছিল!

অনিমেষ পড়ত বুয়েটে, ছুটিতে এসে পড়ার টেবিল ঘিরে কফির মগ আর বইয়ের স্তূপ।

শালিনী গানের অনুশীলনে দুপুর গড়িয়ে বিকেল করত।

আর অভিজিৎ তো মায়ের বুকের ছেলে।

আজ সেই ঘরে সময় পড়ে থাকে ঘড়ির টিকটিক শব্দের মতো।

রাতে আবার একটা ফোন আসে। কানাডা থেকে।

এই প্রথমবার অভিজিৎ নিজে।

‘মা... আমি অভিজিৎ। কী খবর তোমার?’

স্বাভাবিক জবাব দিতে পারতেন। দিতে পারলেন না।

‘খবর? আমার খবর আর কারো দরকার আছে রে?’

ওপাশে নীরবতা।

‘তুই তো খুব ব্যস্ত, তাই না? ব্যস্ত জীবন, ব্যস্ত স্ত্রী, ব্যস্ত সন্তান... মায়ের জন্য সময় কোথায়?’

অভিজিৎ একটু থেমে বলল, ‘আমি ভীষণ ভুল করেছি মা... আমি জানি। কিন্তু আজ আমি ভেঙে পড়েছি। শরীরটা... মা, আমার কিডনি দুইটাই ড্যামেজ হয়ে গেছে। ডায়ালিসিস চলছে। মধু খুঁজছে ডোনার। কিন্তু... তোমার কথা বারবার মনে পড়ছে। মা, আমি আর পারছি না...’

এতদিনের অভিমান যেন একমুহূর্তে গলে পড়ল।

‘তুই দেশে আয়, অভি। ফিরে আয়। আমি তোকে কিছু বলব না।’

‘তুমি কি তোমার অভিমান ভাঙলে মা?’

‘না রে... অভিমানের দরজাটা খোলা থাকেই, তুই-ই তো ফিরে আসিস না।’

ওপাশ থেকে গলাটা কেঁপে উঠল। কান্নার শব্দ। অনেক বছর পর মা-ছেলের কান্না একসঙ্গে মিশে গেল।

আকাশ আজ কেমন কুয়াশাচ্ছন্ন। ঢাকা শহর ঘুম থেকে উঠেছে, মোহাম্মদপুরের পুরনো বাড়িটা যেন নতুন করে জেগে উঠেছে। মনু ঘরদোর ঝাড়ছে, রান্নাঘরে কিছু একটা গন্ধ ছড়াচ্ছে- অনেকদিন পর।

কানাডা থেকে মধুরিমা জানাল, তারা আসছে। অভিজিতের চিকিৎসার ব্যবস্থা ঢাকায় করাতে চায়। মায়ের পাশে থাকতে চায়।

এই কথাগুলো শুনে সরোজিনী আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছেন। চোখে কাজলের রেখা, ঠোঁটে হালকা একটা হাসি।

সেই অভিমান- যে অভিমান তাকে রাতের পর রাত বিছানায় চোখ মুছতে বাধ্য করত, যে অভিমান তাকে সন্তানদের জন্মদিনেও ফোন না করতে বাধ্য করত- সেই অভিমানকে আজ সরোজিনী দরজা দেখিয়ে দিয়েছেন।

বিমানবন্দরে অভিজিৎকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেননি সরোজিনী। শুকিয়ে যাওয়া গাল, ক্লান্ত চোখ। হাত ধরে হাঁটছে মধুরিমা। পাশে ছোট রুহিত। কিন্তু অচেনা মুখের ভেতরে চেনা মানুষটা এখনও আছে।

‘মা...’

একটা শব্দ।

আর কিছু বলার দরকার ছিল না।

সরোজিনী ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে।

রুহিত বলল, ‘দিদা, বাবাকে তুমি ভালো করে দাও। আমি বাবার জন্য প্রার্থনা করি প্রতিদিন।’ মায়ের অভিমান গলে জল হয়ে গেল।

এটাই তো চেয়েছিলেন সবসময়- সন্তান ফিরে আসুক। শুধু ফিরে এসে চোখে চোখ রেখে বলুক, ‘ভুল করেছি মা।’

বাড়ি ফিরে নতুন একটা রুটিন শুরু হলো। অভিজিৎকে সপ্তাহে দুবার হাসপাতালে নিতে হয়। মধুরিমা মায়ের সঙ্গে সময় কাটায়, রান্না করে, গল্প করে। রুহিত স্কুলে ভর্তি হয়েছে কাছেই।

ঘরে আবার হাসি ফিরে এসেছে।

এক সন্ধ্যায় সরোজিনী বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন। অভিজিৎ এসে পাশে বসে বলল, ‘মা, জানো? এখানে ফিরে আসার পর আমি যেন আবার বেঁচে উঠেছি।’

‘কিন্তু তোকে হারাতে হারাতে আমি অনেক কিছু শিখে গেছি, রে।’

‘তুমি এখনও আমাকে মাফ করোনি, তাই না?’

‘মা কখনও পুরোপুরি অভিমান ভোলে না। কিন্তু মা কখনও অভিমানকে জয়ী হতে দেয় না।’

অভিজিৎ হাত ধরে বলল, ‘তোমার অভিমানের দরজা কি আবার বন্ধ হয়ে যাবে কখনও?’

মা হাসলেন।

‘না রে... এখন দরজাটা খোলা রেখেছি। তুই যদি আবার দূরে চলে যাস, দরজা খোলা থাকবে। কারণ এখন জানি- তুই ফিরে আসবি।’ আকাশে তখন একফালি চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোতে অভিমানের পুরনো ঘরটা যেন নতুন করে জেগে উঠেছে।

(কৃতজ্ঞতা : কালি ও কলম)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত