প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
জীবন উপলব্ধির সঙ্গা কখনও কখনও বিস্মৃতির অতলে নির্দ্বিধায় হারিয়ে যেতে থাকে হিসেবের খাতার প্রতিটি পাতাকে পাশ কাটিয়ে। তবুও চেনা-অচেনার সারল্যের হাসিতে পাহাড় সমান ভালোবাসা মিশে থাকে কিছু কথায়। সেসব কথায় গাঁথা শব্দগুলো নিঃশব্দ হয়ে আসে আপন মমতায়। পারা না পারার সক্ষমতা এখানে তখন তুচ্ছ!
সময়কাল-১৯৮৯ সালের কোনো এক মাসের কোনো একদিন। রহমান মিয়া বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে কেরানীর চাকরি করেন। তার একমাত্র ৫ বছরের ছোট্ট শিশু বাচ্চা তুর্য প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত। বাচ্চার জ্বর হলেই তার মনে অজানা ভয় কাজ করে। একটি প্রশ্নবোধক প্রশ্নে, উদ্বাস্তু মন ভেঙে পড়ে অন্ধকারের গভীরে। এসময় চোখের অতলের মানসপটে ধরা দেয় চিন্তা ও ভয়ের ভাঁজ। ছেলেবেলায় তার আপন ছোটভাই মারা গেছে সামান্য সেই জ্বরে! তাই জ্বর মানেই তার কাছে ভয়ের নাম, চোখে-মুখে আতঙ্কের চিহ্ন।
মানুষ আসলে জীবনের কঠিন প্রস্ফুটিত সত্যগুলো কখনও এড়াতে পারে না। বাঁধা পড়ে থাকে আজীবন, জীবনের রুটিনে সঙ্গী করে। তেমন ভয়কে সঙ্গী করেই আছেন রহমান মিয়া। যাপিত জীবনে প্রতিনিয়ত সেই ছোট্ট মুখ শান্ত পুকুরের স্বচ্ছ জলের মধ্যে মিশে যাচ্ছে বিস্মৃতির অতলে। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক বিশ্বাসের মানচিত্রে টিকে থাকে নিঃশব্দ বিভ্রম হয়ে। চেনা-অচেনার শিকড়ের খোঁজে পদচিহ্ন মিশে যায়, একসময়। অকালে অবিনেশ্বরের পথে হারিয়ে ছোট ভাইটির মুখ তার কাছে তেমনই।
দুই.
আব্বা, আমি নাশপাতি খাব- প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত পাঁচ বছরের শিশু বাচ্চা তুর্যের আবছা কণ্ঠে উচ্চারণ।
রহমান মিয়া শুনেই চমকে উঠল। গত ২৪ ঘণ্টায় বাচ্চাকে জোর করেও কিছু খাওয়াতে পারেনি সে। শুধু সামান্য ওষুধ ছাড়া।
জ্বর হলে কারো কিছুই ভালো লাগে না খেতে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। তুর্যের ক্ষেত্রেও হয়েছে তাই।
বাবা তুমি কি খেতে চাও। কি খেতে ইচ্ছে করে তোমার। ছেলের প্রতি বাবার আদর মাখানো জিজ্ঞাসা।
যেনো কোনো কিছু খেতে চাইলে তার সামথ্যের সবটুকু উজার করে দেবেন। ছেলে কিছুই বলে না।
অবশেষে বাবা-মা অনেক বলার পর- আব্বা, আমি নাসপাতি খাব এই ছিল তুর্যের উচ্চারণ।
নাশপাতি! তুর্যের মুখে এমন ফলের নাম শুনে বাবা-মা একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। নাশপাতি- ফল তো কোনো দিন বাসায় আনা হয়নি। তবে তুর্য কীভাবে জানল এমন ফলের নাম। সে যাই হোক আদরের সন্তান খেতে চেয়েছে এটাই বড় কথা।
এখন ঘর থেকে বের হলেই ফলের দোকান, অলিতে গলিতে। কিন্তু আজ থেকে ৩৭ বছর আগে প্রেক্ষাপট এমন ছিল না। বর্তমানে বাহারি ফলের পসরা বসিয়ে বসেন দোকানিরা, আগে এমনটা ছিল না। বড় বড় বাজারে পাওয়া যেতে ফল, তাও নিদিষ্ট কিছু দোকানে। তবে সব ফল পাওয়া যেতো না। নিদিষ্ট কিছু ফল মিলতে সেখানে।
বাচ্চার মুখে নাশপাতি ফলের নাম শুনে চিন্তার ভাঁজও চোখে-মুখে। নাশপাতি পাবেন তো!
তিন.
তুর্যর ঘুড়ি ওড়ানো খুব পছন্দ। বাবা যখন খোলা মাঠে নাটাই হাতে ঘুড়ি উড়ায় চিৎকার করে লাফিয়ে লাফিয়ে আনন্দ করে সে। যেন আকাশের মেঘভাঙা সাদা রঙের ভেলায় তুর্য ভেসে বেড়ায়।
কোথায় নাশপাতি পাওয়া যেতে পারে। পরিচিতজনদের কাছে জানতে চায় রহমান মিয়া। সামান্য বেতন পেলেও নাশাপাতি কিনতে তার ব্যতিব্যস্ততা। প্রিয় ছেলে চেয়েছে এটাই বড় কথা। কিন্তু কেউ সঠিক সন্ধান দিতে পারে না, কোথায় পাওয়া যেতে পারে নাশপাতি! অবশেষে গ্রাম শহরের সীমানা ছাড়িয়ে নারায়ণগঞ্জের ব্যস্ত বাজারে খুঁজে পায় সেই নাশপাতি। যেনো কাঙ্খিত কিছু পাওয়ার শুভ্র ঘ্রাণ তার দৃষ্টিতে। কষ্টের পটভূমি মুছে জানান দেয়- আনন্দ, সেকি সীমাহীন আনন্দ। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে ছেলের চাওয়া নাশাপাতি পাওয়া গেছে। যেনো চিৎকার করে তাই বলতে চায় সে।
দুই কেজি নাশাপাতির প্যাকেট হাতে বাড়ি ফিরছে রহমান মিয়া। কিন্তু হঠাৎ দ্রুত গতির একটি বাস তাকে বহন করা রিকশাকে সজোরে ধাক্কা দেয়। বিকট শব্দে রহমান মিয়ার শরীর আছড়ে পড়ে ব্যস্ত রাস্তায়। রক্তে লাল হয়ে যায়- পিচঢালা পথটুকু। আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।
চার.
চেনা পথ ধরে সময় গড়িয়ে যায়। জীবন গল্পের আয়নায় দেখা মেলে না কোনো পুরোনো মুখ। এভাবেই ছোট্ট তুর্য বড় হতে থাকে। এক সময় বড় হয়ে মার কাছে শুনে তার ছোটবেলায় বাবার কাছে সেই অদ্ভুত আবদারের কথা। যে আবদার মেটাতে গিয়ে প্রিয় বাবার অপমৃত্যু!
সত্যিই এরপর আর কখনও তুর্য কারও কাছে কিছু আবদার করেনি। আর কখনও নাশপাতি নামের সেই ফলটি স্পর্শও করেনি। দূর থেকে যখনই দোকানে দেখেছে নাশপাতি নামের ফল, তখনই শত্রু মনে হয়েছে, প্রবল শক্র।
তুর্য এখন শুধু তার বাবাকে হৃদয় দিয়ে খোঁজে অন্তর্লীন পথে পথে।