
দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষে রাজস্ব আয়ের সব মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এই বছর ৫,৪৬০.১৮ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করেছে বন্দর। যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৭.৫৫ শতাংশ বেশি। গাণিতিক এই সাফল্যকে বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক অটোমেশন এর সাফল্য হিসেবে দেখলেও বিশ্লেষকরা বলছেন মুদ্রার অবমূল্যায়ন, ট্যারিফ বৃদ্ধি এবং আমদানি বৃদ্ধি হলেও রপ্তানির চাপ কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো এই রেকর্ড আয়ের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। এটিকে সাফল্য হিসেবে দেখছেন না জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে জরুরি, যেখানে বড় রকমের ঘাটতি দেখছেন তারা। বহির্নোঙরে জাহাজের দীর্ঘ জট এবং লাইটারেজ সংকট আসন্ন রমজানের আগে সরবরাহ চেইনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মোট রাজস্ব আয় ৫,৪৬০.১৮ কোটি টাকা, মোট রাজস্ব ব্যয় ২,৩১৭.৫০ কোটি, রাজস্ব উদ্বৃত্ত (লাভ) ৩,১৪২.৬৮ কোটি টাকা। এখান থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১,৮০৪.৪৭ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের মোট রাজস্ব আয় ছিল ৫,০৭৬.৭৫ কোটি, মোট রাজস্ব ব্যয় ২,১৫৩.৫৮ কোটি, রাজস্ব উদ্বৃত্ত (লাভ) ২,৯২৩.১৭ কোটি, সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ১,৭১১.৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই বছর আয় বেড়েছে ৩৮৩.৪৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যয় কমেছে ১৬৩.৯২ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে বন্দর আগের বছরের তুলনায় ৩৮৪ কোটি টাকা বেশি আয় করেছে। সরকারি কোষাগারে জমা টাকার পরিমাণ বেড়েছে গতবারের তুলনায় মাত্র ৯২.৭২ কোটি টাকা। বন্দরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মতে, ‘ই-মুট পাস’ এবং অনলাইন পেমেন্ট সিস্টেমের মতো ডিজিটালাইজেশন কার্যক্রম ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এই প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে। তবে তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, বন্দরের এই দাবি সত্য নয়। বন্দরের আয় আসে ডলারে। ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণেই আয়ের টাকার পরিমাণ বেড়েছে। এটি না হলে প্রকৃত আয় কমারও আশঙ্কা ছিল।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ডলারের দাম ছিল ১১০ টাকা, বছর শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দাম ১২২ টাকা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ গড় ডলার রেট ছিল ১১৫ টাকা। ২০২৫ সালে বছরের বেশিরভাগ সময় ডলারের দাম ১১৯-১২২ টাকার মধ্যে ওঠাণ্ডনামা করেছে। বছরের শেষ দিকে ডলারের দাম ১২২.৩৮ টাকা থেকে ১২৩ টাকার আশপাশে অবস্থান করছিল। এই বছর গড় ডলার রেট ছিল ১২২ টাকা। এ হিসাবে বন্দরে এক বছরে টাকার অঙ্কে ৩৮৩.৪৩ কোটি আয় বাড়লেও ডলারের অঙ্কে আয় বেড়েছে প্রায় ৬.১ মিলিয়ন ডলার। এর বাইরে দীর্ঘ ৩৯ বছর পর (১৯৮৬ সালের পর প্রথম) বন্দরের ৫৬টি সেবার মাশুল পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ১৫ অক্টোবর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়। এই বছরের প্রথম ৯ মাসে বন্দরের গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৪০ কোটি টাকা। ১৫ অক্টোবরের পর থেকে মাসিক আয় একলাফে ৫৫০-৬০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। হিসেব ও বিশ্লেষণ বলছে, মাসে অতিরিক্ত ১০০-১৫০ কোটি টাকা বেশি আয় শুরু হওয়া, এটাই বছরের শেষ দিকে এসে বন্দরের আর্থিক পোর্টফোলিওকে শক্তিশালী করেছে। এটি না থাকলে ২০২৫ সালে বন্দর হয়তো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারতো না বা প্রবৃদ্ধি অনেক নগণ্য হতো। এই আড়াই মাসের সাফল্যই এখন ২০২৬ সালে বন্দরের আয়কে রেকর্ড সংখ্যায় নিয়ে যাওয়ার মজবুত ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে।
বন্দর ব্যবহার করা ব্যবসায়ীরা বন্দরের এই সাফল্যকে ‘খণ্ডিত সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, গত দেড় বছরে ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কমে যাওয়ায় বন্দরের কার্যক্রম বর্তমানে স্মুথ মনে হচ্ছে। তাদের মতে বন্দর অনেকাংশে উন্নতি করলেও এর কোনো ধারাবাহিকতা নেই এবং আউটার অ্যাঙ্করেজে লাইটারেজ জাহাজ না পাওয়ায় মাদার ভেসেলগুলোকে দিনের পর দিন বসে থাকতে হচ্ছে। ডেমারেজ বাবদ বিপুল পরিমাণ ডলার ‘সাগরে ফেলে দেওয়া হচ্ছে’ যা আল্টিমেটলি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, লাভজনক এনসিটি (ঘঈঞ) টার্মিনাল বিদেশি অপারেটরদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যবসায়ীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রেকর্ড রাজস্ব আয়ের খবরের মধ্যেই জানুয়ারি ২০২৬-এর মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অর্ধশতাধিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এরমধ্যে ১৭টি জাহাজে ১২ লাখ টন গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো রমজানের নিত্যপণ্য রয়েছে। ঘন কুয়াশা, শ্রমিক সংকট এবং লাইটারেজ জাহাজের স্বল্পতার কারণে পণ্য খালাসে যেখানে ৭-১০ দিন লাগার কথা, সেখানে ২০-৩০ দিন সময় লাগছে।
এর ফলে আমদানিকারকদের প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬-২০ লাখ মার্কিন ডলার ডেমারেজ বা জরিমানা গুণতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, লাইটারেজ সংকটের কারণে আমদানিকৃত পণ্যের দাম প্রতি কেজিতে অন্তত ১ টাকা বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত বোঝা চাপে সাধারণ ভোক্তার ওপর। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক এসএম আবু তৈয়ব জানান, রাজস্ব বৃদ্ধি নিয়ে যে আলাপ হচ্ছে এটাকে স্বাগত জানাই। কিন্তু এটা নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ আছে বলে মনে করি না। ডলারের দাম বেড়েছে, ট্যারিফ বেড়েছে এ কারণে টাকার অংকে আয় বেড়েছে। বন্দর দেশের ব্যবসার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এটার সাফল্য বিবেচনা করা হবে তার সার্ভিসের ধারাবাহিকতা দিয়ে। সেই সার্ভিসকে গড় ধরার সুযোগ নেই। ৯ মাস ভালো সার্ভিস দিলেন তিন মাস একদম যা তা। এটাকে ভালো সার্ভিস বলে না। সাফল্য হলো নিরবচ্ছিন্নভাবে ভালো সার্ভিস দেওয়া। বন্দরকে এই সাফল্যের লক্ষমাত্রা অর্জন করতে হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের সাফল্যকে মূলত আর্থিক স্থিতিশীলতা ও ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করছে। তাদের হিসেবে অপ্রয়োজনীয় প্রজেক্ট বন্ধ করে বন্দর প্রায় ২৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। অপারেশনাল সংকট নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেন, এটি বন্দরের একক ব্যর্থতা নয়। আমদানিকারকরা অনেক সময় লাইটারেজ জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে বাজারে পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেন। আর সাফল্যকে কখনও আমরা আর্থিক হিসেবে কখনও অপারেশনাল দক্ষতার জায়গা থেকে দেখি। ডলারের দাম বৃদ্ধি ও ট্যারিফের যে কথা বলছেন এটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের কনটেইনার হ্যান্ডেলিং বৃদ্ধি পেয়েছে আর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব ব্যয়ের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এ ছাড়া ভ্যাট, ট্যাক্স ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব (এনটিআর) হিসেবে গত পাঁচ বছরে বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারের কোষাগারে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। গত পাঁচ বছরের আয়-ব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা এবং ব্যয় ছিল ২ হাজার ৩১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ফলে ওই বছরে রাজস্ব উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় ছিল ৫ হাজার ৭৬ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ব্যয় ছিল ২ হাজার ১৫৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয় ২ হাজার ৯২৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা। তার আগের বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সালে ২ হাজার ১৪৩ কোটি ১১ লাখ টাকা, ২০২২ সালে ১ হাজার ৭৩৪ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৬৩৩ কোটি ২৬ লাখ টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত হয়েছিল চট্টগ্রাম বন্দরের।
বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে কঠোর নীতি অনুসরণের ফলে গত দুই বছর রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব ব্যয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে তা ছিল ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। তবে ২০২৩ সালে ব্যয় প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে ছিল ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত পাঁচ পঞ্জিকাবর্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরকারি কোষাগারে ৭ হাজার ৫৮০ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর হিসেবে ৩ হাজার ৫৫৩ কোটি ৮ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) হিসেবে ৩ হাজার ৪২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা টাকা, কর-বহির্ভূত আয় (এনটিআর) হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।