ঢাকা মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

চান্দিনায় মিষ্টি আলুর ফলনে কৃষক খুশি

চান্দিনায় মিষ্টি আলুর ফলনে কৃষক খুশি

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ। লতানো পাতার চাদরে ঢাকা পড়েছে মাঠের পর মাঠ। মাটির নিচে যত্নে বাড়ছে পুষ্টিগুণে ভরপুর মিষ্টি আলু। এক সময় অবহেলিত এই ফসলটি এখন স্থানীয় কৃষকদের মুখে হাসির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উপজেলার কৃষি অফিসের সাম্প্রতিক তথ্য এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের উৎসাহ বলে দিচ্ছে, চান্দিনায় মিষ্টি আলু চাষে এক নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চান্দিনায় মিষ্টি আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ হেক্টর জমি। কিন্তু কৃষকদের প্রবল আগ্রহ আর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে প্রায় ৫০ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি জমিতে এবার মিষ্টি আলুর আবাদ হয়েছে।

শুধু আবাদি জমির পরিমাণই বাড়েনি, ফলনের লক্ষ্যমাত্রাও ধরা হয়েছে আশাব্যঞ্জক। কৃষি বিভাগ আশা করছে, প্রতি হেক্টরে গড়ে ১৮ মেট্রিক টন আলুর ফলন পাওয়া যাবে। যদি আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত অনুকূলে থাকে, তবে এবার উপজেলায় মিষ্টি আলুর বাম্পার ফলন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকরা গভীর মমতায় খেত পরিচর্যা করছেন। এমনই একজন কৃষক মেহার গ্রামের মো. আলী আজম। তিনি তার ১২ শতক জমিতে এবার ‘চায়না’ জাতের মিষ্টি আলুর চাষ করেছেন। আলীর চোখে-মুখে এখন সাফল্যের স্বপ্ন। গত বছরের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, গত বছরও তিনি মিষ্টি আলুর চাষ করে অভাবনীয় ফলন পেয়েছিলেন। বাজারে দাম ভালো থাকায় লাভের অংকটাও ছিল বেশ মোটা। সেই সফলতাই তাকে এবার আরও বেশি উদ্যমে কাজে নামিয়েছে। আলীর মতে, মিষ্টি আলু চাষে খরচ তুলনামূলক কম কিন্তু ফলন পাওয়া যায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, অন্যান্য ফসলের চেয়ে এতে পোকাণ্ডমাকড়ের আক্রমণ কম হয় এবং সারের প্রয়োজনও খুব বেশি পড়ে না। তাই কম পুঁজিতে বেশি লাভের আশায় তিনি এবারও এই ফসলে বুক বেঁধেছেন। একই কথা বলেন মেহার গ্রামের আব্দুল বারী নামের এক কৃষক। তিনি বলেন- চান্দিনার এই উর্বর মাটিতে মিষ্টি আলু চাষের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এখানকার কৃষকরা মূলত দেশি জাতের পাশাপাশি উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের আলুর দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে ‘চায়না’ জাতের আলু তার আকার, স্বাদ এবং দ্রুত বর্ধনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই জাতের আলুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এবং এটি স্বল্প সময়েই পরিপক্ক হয়। ফলে কৃষকরা দ্রুত ফসল ঘরে তুলে পরবর্তী চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করতে পারেন। চান্দিনার কৃষি ব্যবস্থার এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে কৃষি বিভাগের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠ পর্যায়ের তদারকি বড় ভূমিকা রাখছে। কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, সঠিক সময়ে সেচ প্রদান এবং সুষম সার ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এবার চান্দিনার মিষ্টি আলু স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। মিষ্টি আলু শুধু একটি সবজি বা খাদ্য নয়, এটি পুষ্টিরও এক বিশাল আধার। বিশেষ করে ভিটামিন এ এবং শর্করার চাহিদা পূরণে মিষ্টি আলুর জুড়ি মেলা ভার। স্বল্প খরচে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে এর ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকায় এটি কৃষকদের জন্য এখন একটি ‘ক্যাশ ক্রপ’ বা অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। বাজারে দাম ভালো থাকার কারণে কৃষকরা এখন ধান বা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি মিষ্টি আলুর দিকে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন। চান্দিনার মাঠগুলোতে যখন বিকেলের সূর্য হেলে পড়ে, তখন বাতাসের ঝাপটায় মিষ্টি আলুর সবুজ পাতাগুলো যেন ঢেউ খেলে যায়। সেই ঢেউয়ের সাথে মিশে থাকে কৃষকের হাজারো স্বপ্ন। গত বছরের লাভ আর এ বছরের বাম্পার ফলনের আশা কৃষকদের মনে যে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে, তা আগামীতে চান্দিনাকে মিষ্টি আলু চাষের একটি মডেল হিসেবে পরিচিতি দেবে বলে বিশ্বাস করা যায়। কৃষকদের এই পরিশ্রম আর সরকারের সঠিক দিকনির্দেশনা বজায় থাকলে মিষ্টি আলু চাষে চান্দিনা জেলা তথা সারা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত