ঢাকা রোববার, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৮ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

আধুনিক পদ্ধতিতে টমেটো চাষে সচ্ছলতা ফিরছে

আধুনিক পদ্ধতিতে টমেটো চাষে সচ্ছলতা ফিরছে

চান্দিনার উর্বর পলিমাটিতে এখন সবুজের সমারোহ ছাপিয়ে উঁকি দিচ্ছে টকটকে লাল টমেটো। এক সময়ের সাধারণ চাষাবাদ পদ্ধতিকে পেছনে ফেলে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় এখন টমেটো চাষে এক অভাবনীয় বিপ্লব সাধিত হয়েছে। এই কৃষি বিপ্লবের মূলে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া, উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন এবং একদল পরিশ্রমী কৃষকের নিরলস প্রচেষ্টা।

বিশেষ করে উপজেলার চিলোড়া ব্লকের কৃষকরা এবার শুধু স্থানীয় বাজারে নয়, বরং বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশের টমেটোর স্বাদ পৌঁছে দিয়ে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। এই মহাযজ্ঞের সফল রূপকার হিসেবে নাম উঠে এসেছে কৃষক আক্তার হোসেনের। তার দূরদর্শী চিন্তা ও সাহসী উদ্যোগ এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। আক্তার হোসেন শুধু প্রথাগত চাষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সরাসরি আমদানিকারক বা এক্সপোর্টারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পথ তৈরি করেছেন। এ বছর তিনি ১২০ শতক জমিতে ‘বাহুবলী’ জাতের টমেটো চাষ করে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছেন। এরমধ্যে তিনি ৪৫ টাকা দরে ৬৭ হাজার টাকার পাকা টমেটো বিক্রি করেছেন এবং একদিনেই ১ লাখ ৩ হাজার টাকার আধাপাকা টমেটো বিক্রি করে সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আক্তার হোসেনের এই সাফল্য একা নয়; তার অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে কৃষক মো. মোস্তফা, মো. শরিফ, আনোয়ার হোসেন, মোবারক হোসেন ও দীপক সরকারসহ প্রায় ২০-২৫ জন কৃষক এই বাণিজ্যিক ধারায় শামিল হয়েছেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২৫ মেট্রিক টন আধাপাকা টমেটো সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। বাজারে টমেটোর বর্তমান দামে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে।

কৃষকদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য, আধাপাকা অবস্থায় টমেটো সংগ্রহ করলে গাছ দীর্ঘদিন সতেজ থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদী ফলনে সহায়ক। এর ফলে গাছের উপরের দিকের ছোট ফলগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং অল্প সময়ে অধিক পরিমাণ ফসল বাজারজাত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি আধাপাকা টমেটো পরিবহনে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বা অপচয় অনেক কম থাকে, যা কৃষকের মুনাফার হার বৃদ্ধি করে।

চান্দিনা উপজেলার এই অভাবনীয় সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগের দক্ষ তদারকি ও পরামর্শ। উপ-সহকারী কৃষি অফিসার কনক সরকারের দেওয়া তথ্যমতে, এ বছর চিলোড়া ব্লকেই ২৮ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ হয়েছে। এর সিংহভাগ অর্থাৎ ২২ হেক্টর জমিতেই চাষ করা হয়েছে মালিক সিডসের ‘বাহুবলী’ জাতের টমেটো। এই জাতটির বিশেষত্ব হলো এর আকৃতি ও গুণগত মান। মাত্র ৭-৮টি টমেটোতেই এক কেজি ওজন পূর্ণ হয়ে যায়। গোলাকার গঠন, টকটকে লাল রঙ এবং শক্ত আবরণের কারণে এই টমেটো ক্রেতাদের দৃষ্টি কাড়ছে অনায়াসেই। সবচাইতে বড় সুখবর হলো, এই টমেটোর গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানদ- উত্তীর্ণ হওয়ায় এবার প্রথমবারের মতো মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মুহাম্মদ মোরশেদ আলমের নির্দেশনায় ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে চান্দিনার কৃষকরা এখন রপ্তানিমুখী কৃষির দিকে ঝুঁকছেন। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে এই সবজি রপ্তানি হওয়া আমাদের জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বড় অর্জন। আধুনিক কৃষির এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং উন্নত জাতের ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য বদলানো সময়ের ব্যাপার মাত্র। চিলোড়া ব্লকের কৃষকদের এই সাফল্য এখন পুরো উপজেলার জন্য মডেল হিসেবে কাজ করছে। আগামীতে টমেটো সংরক্ষণের সুব্যবস্থা এবং বাজারজাতকরণের এই ধারা অব্যাহত থাকলে চান্দিনা হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম প্রধান সবজি রপ্তানি কেন্দ্র, যা কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে আমূল পরিবর্তন আনবে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত