ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

দখল-ভরাটে বিলুপ্তির পথে আলীয়াবাদ খাল

দখল-ভরাটে বিলুপ্তির পথে আলীয়াবাদ খাল

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার আলীয়াবাদ বিলের খাল দখল ও খননের অভাবে ড্রেনে পরিণত হয়েছে।

বিলের পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে তলিয়ে যায় ইরি-বোরো ধানের ফসলি জমি। শুকনো মৌসুমে পানি না থাকায় সেচকাজে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এ এলাকার শত শত কৃষককে। উপজেলার শ্রীরামপুর মৌজার ২৪৫ দাগের ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত খালটি জেলা এলএ শাখায় ‘কুট্টাপাড়া ফিসারি জলমহাল’ হিসেবে পরিচিত। ম্যাপে ২ হাজার ৪০০ ফুট দৈর্ঘ্য এবং ৬০ থেকে ১০০ ফুট প্রস্থ থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে তিন-চার ফুটের একটি ড্রেনের নমুনা দেখা গেছে। জানা যায়, বুড়ি নদী থেকে শুরু হয়ে মাঝিকাড়া ও আলীয়াবাদ গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে খালটি ভাটা নদীতে গিয়ে মিশেছে। ১৯৭৯ সালে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালের পাড় দিয়ে হেঁটে গিয়ে ভাটা নদী খননকাজের উদ্বোধন করেছিলেন। এ সময় তিনি এই খালের পাড়ে বসে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন।

স্থানীয় সার্ভেয়ার দিয়ে ম্যাপ পরিমাপ করে দেখা যায়, শত বছরের পুরোনো খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৪০০ ফুট, প্রস্থ ৬০ থেকে ৮০ ফুট, কোনো কোনো জায়গায় ১০০ ফুট। গত কয়েক যুগ ধরে এ খালের খননকাজ না হওয়ার সুযোগে অবাধে দখল হয়েছে, জমির সমান্তরাল করে ভরাট করা হয়েছে। ফলে খালটি তার নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে পানি চলাচল। সামান্য বৃষ্টিতেই বিলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে নষ্ট হয়ে যায় ফসল। বর্ষাকালে স্রোত না থাকায় বিলের পানি বিষাক্ত হয়ে ওঠে। জমে থাকে কচুরিপানা। পানিতে নামতে গেলেই চুলকানিসহ বিভিন্ন রোগজীবাণুর সংক্রমণ দেখা দেয়। মরে যায় বিলের মাছসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী। স্থানীয় জেলেরা জানান, বর্ষা ও শুকনো- উভয় মৌসুমেই এই খালে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। মাছ বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। খালটি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় এখন সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান বলেন, আমার বাবা বারো মাস এই খাল থেকে মাছ ধরতেন। ছোটবেলায় আমরাও মাছ ধরতে যেতাম, সাঁতার কাটতাম। খালটি মাছে ভরপুর থাকত। বিলের সব মাছ এই খাল দিয়ে নামানো হতো। খালের পাড়ে অনেকে গরু চরাতেন, গোসল করাতেন। আবার কেউ কেউ খালের পাড়ে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করতেন। বর্ষাকালে চলত পালতোলা নৌকা, শোনা যেত মাঝিমাল্লাদের গান। এই খালকে ঘিরে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এখন দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানে একসময় খরস্রোতা খাল ছিল। আলীয়াবাদ গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ জহিরুল হক সর্দার বলেন, আলীয়াবাদ, মাঝিকাড়া ও নবীনগর শহরের বেশির ভাগ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই খাল। স্বাধীনতার আগে করিম চেয়ারম্যানের মাধ্যমে একবার খননকাজ হয়েছিল। তারপর তেমনভাবে আর খনন না হওয়ায় যে যার মতো করে খালের পাড় কেটে ভরাট করে জমির সমান্তরাল করে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সময় শুনতে পাই, কেউ কেউ নাকি খালের জায়গা লিজ নিয়েছে। আলীয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস আলী, ইকবাল হোসেন বসু ও হুমায়ুন কবির বলেন, চলতি মাসের কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টির সময় খাল দিয়ে পানি নিষ্কাশন হতে না পেরে অসংখ্য জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তারা আরও বলেন, শুকনো মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের পানির একমাত্র মাধ্যম ছিল এই খাল। বর্তমানে খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে সেচের পানির অভাবে অনেক জমি অনাবাদি পড়ে থাকে। আবার সামান্য বৃষ্টিতেই ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। উর্বরতার জন্য জমিতে দেওয়া সার ও কীটনাশক পানির সঙ্গে ভেসে যায়। অন্যদিকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বাসাবাড়ি ও নর্দমা থেকে আসা ময়লা-আবর্জনা জমিতে গিয়ে ফসল নষ্ট করে। এমন পরিস্থিতিতে সীমানা নির্ধারণ ও পুনঃখননের মাধ্যমে খালের প্রাণ ফিরিয়ে এনে বিল ও আশপাশের গ্রামের বৃষ্টির পানি অবাধে নিষ্কাশন এবং শুকনো মৌসুমে সেচকাজের জন্য খালে পানি সংরক্ষণের উপযোগী করে তোলার জন্য এমপি ও উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন স্থানীয়রা। নবীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, আলীয়াবাদ বিলের খাল খননের অভাবে দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে- তথ্যটি আপনার মাধ্যমে প্রথম জানলাম। এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে এমপির সঙ্গে পরামর্শ করে জনগুরুত্বপূর্ণ এই খালটি চলমান খাল খনন কর্মসূচির তালিকায় অন্তর্ভুক্তিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নবীনগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর বলেন, খালের জায়গা লিজ দেওয়ার কোনো বিধান নেই।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত