
মসজিদের মিনার ছাপিয়ে আকাশে ডানা মেলছে সবুজ পাতার ভেলা। চারপাশ আলো করে ঝুলছে থোকা থোকা ফল আর রকমারি ফুল। কোনোটি চেনা, কোনোটি আবার একেবারেই অচেনা, বিদেশি জাতের। কোনো গ্রামীণ বাগান কিংবা শৌখিন ফলচাষির আঙিনা নয় এটি, কুমিল্লার চান্দিনা সাব রেজিস্ট্রি জামে মসজিদের ছাদের এক চোখ জুড়ানো দৃশ্য। মসজিদের খতিব কিংবা কমিটির প্রথাগত কাজের বাইরে গিয়ে, সম্পূর্ণ নিজস্ব তাড়না থেকে এক অনন্য সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছেন মসজিদের খাদেম জনাব নাছির উদ্দীন দুলাল হোসেন। তার হাতের ছোঁয়ায় আজ মসজিদের ছাদ পরিণত হয়েছে দেশি-বিদেশি ফলের এক মহাসমাবেশে, যা একইসঙ্গে মুসল্লিদের প্রশান্তি আর পরম তৃপ্তির কারণ।
এই অনন্য উদ্যোগের গল্পটা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। গাছ আর প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেম থেকেই খাদেম দুলাল হোসেন সিদ্ধান্ত নেন মসজিদের ফাঁকা ছাদটিকে কাজে লাগানোর। যেমন ভাবনা, তেমন কাজ। তবে পথটা খুব সহজ ছিল না। ছাদবাগানের উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি, মাটির সংস্থান এবং চারা সংগ্রহের জন্য প্রয়োজন ছিল মোটা অঙ্কের অর্থ। কোনো সরকারি অনুদান কিংবা মসজিদ ফান্ডের টাকার দিকে না তাকিয়ে, তিনি নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করেন। নিজ অর্থায়নে তিল তিল করে গড়ে তোলেন এই স্বপ্নের বাগান। আজ প্রায় আট বছর পর তার সেই শ্রম আর নিষ্ঠার ফসল বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদের ছাদে। বর্তমানে এই ছাদবাগানে প্রায় ৩০০টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যে দেশি ফলের পাশাপাশি রয়েছে চোখ ধাঁধানো সব বিদেশি জাতের ফলের সমাহার। এই বাগানের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো অত্যন্ত মূল্যবান ও দুর্লভ জাতের জাপানি ‘মিয়াজাকি’ আম গাছ, যার সংখ্যা প্রায় ২০টি। এ ছাড়াও রয়েছে আমেরিকান পালমার আম, জাপানি সাদা জাম, থাইল্যান্ডের লাল বেল এবং ওষুধি গুণসম্পন্ন মিরাক্কেল ফল। চিরচেনা ডালিম, সফেদা, করমচা, আনার, লিচু, কদবেল, জাম্বুরা, জলপাই, এলাচ, লবঙ্গ এবং টিস্যু কলার মতো প্রায় ২০ থেকে ৩০ প্রকারের ফল ও ফুলের গাছ এই বাগানকে করেছে অনন্য। ঋতুভেদে যখন গাছগুলো ফলে ফলে ভরে ওঠে, তখন পুরো ছাদ এক স্বর্গীয় রূপ ধারণ করে। এই বাগানের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি হলো এর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যহীনতা। বর্তমান যুগে যেখানে প্রতিটি কাজের পেছনে আর্থিক লাভের হিসাব খোঁজা হয়, সেখানে দুলাল হোসেন এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিটি ফলের মৌসুমে যখন গাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল ধরে, তিনি তার একটিও বাজারে বিক্রি করেন না। পরম যত্নে উৎপাদিত এই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফলগুলো তিনি বিলিয়ে দেন মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে। নামাজ শেষে মুসল্লিরা যখন এই বিষমুক্ত টাটকা ফল মুখে তোলেন, তখন তাদের চোখে-মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফোটে, সেটাই দুলাল হোসেনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। মসজিদের স্থানীয় মুসল্লিরা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাদের অনেকেই জানান, দুলাল হোসেন শুধু একজন খাদেম নন, তিনি এই মসজিদের প্রাণ। ছাদবাগান ছাড়াও মসজিদের যাবতীয় উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্নতার কাজ তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করেন। স্থানীয়রা সাধ্যমতো তাকে সহযোগিতা করলেও, এই বাগানের পুরো কৃতিত্বই তার। অনেক মুসল্লি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, এই বাগানে এমন কিছু দুর্লভ বিদেশি ফল রয়েছে যা জীবনে তারা কখনও দেখেননি, খাওয়া তো দূরের কথা। দুলাল হোসেনের কল্যাণে তারা সেসব ফল দেখতে ও আস্বাদন করতে পারছেন, যা তাদের আত্মাকে এক পরম শান্তি দেয়। চান্দিনা সাব-রেজিস্ট্রি জামে মসজিদের এই ছাদবাগান শুধু একটি সুন্দর দৃশ্যই নয়, এটি সমাজ ও প্রকৃতির প্রতি এক গভীর দায়িত্ববোধের প্রতীক। শহরের কংক্রিটের ভিড়ে কীভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছাদকে পরিবেশবান্ধব এবং জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা যায়, দুলাল হোসেন তা হাতেনাতে দেখিয়ে দিয়েছেন। তার এই নিঃস্বার্থ উদ্যোগ ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা নিঃসন্দেহে সমাজের অন্য সবার জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণা