প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬
বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম- সবখানেই এখন তাকালে দেখা যায় ব্যাটারিচালিত তিন চাকার বাহন, যা আমাদের কাছে ‘অটোরিকশা’ বা ব্যাটারিচালিত রিকশা নামে পরিচিত। স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের জন্য এটি একসময় আশীর্বাদ হিসেবে এলেও, বর্তমানে এর অনিয়ন্ত্রিত ও বেপরোয়া বিস্তার জনজীবনের জন্য এক চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, মাত্রাতিরিক্ত যানজট এবং নিরাপত্তার অভাব আজ এই বাহনটিকে জনদুর্ভোগের সমার্থক করে তুলেছে।
দেশের ছোট-বড় প্রায় প্রতিটি শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত এখন অটোরিকশার দখলে। বিশেষ করে জেলা শহরগুলোতে এই সমস্যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মোড়ে মোড়ে স্ট্যান্ড বানিয়ে বা যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা এবং নামানোর কারণে স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মূল সড়কের অর্ধেকের বেশি অংশ দখল করে সারিবদ্ধভাবে অটোরিকশা দাঁড়িয়ে থাকে। এর ফলে ১০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সাধারণ মানুষকে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই বাহনগুলো অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় দ্রুতগামী যানবাহনের চলাচলেও বিঘ্ন ঘটায়, যা সার্বিক যানজটকে আরও ঘনীভূত করে।
অটোরিকশা নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাটি হলো নিরাপত্তা। বেশিরভাগ অটোরিকশার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি অনুমোদন নেই। এগুলো স্থানীয় ওয়ার্কশপে লোহার পাইপ ও পাত দিয়ে তৈরি করা হয়, যার ভারসাম্য অত্যন্ত দুর্বল। সামান্য আঘাতেই এগুলো উল্টে যায় এবং যাত্রীরা গুরুতর আহত হন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চালকদের অদক্ষতা। এই বাহন চালানোর জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয় না। ফলে কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ যে কেউ কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সড়কে নেমে পড়ছে। ট্রাফিক আইন সম্পর্কে নূন্যতম ধারণা না থাকায় এরা উল্টো পথে চলা (রং সাইড ড্রাইভিং), হুটহাট মোড় নেওয়া এবং যত্রতত্র ব্রেক করার মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। মহাসড়কে এই ধীরগতির বাহনগুলোর উপস্থিতির কারণে প্রতিনিয়ত প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।
অটোরিকশার দাপটের পেছনে একটি বড় অন্ধকার দিক হলো বিদ্যুৎ চুরি। দেশে এখন কয়েক লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। এগুলোর চার্জিংয়ের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তার একটি বড় অংশই আসে অবৈধ হুকিং বা অসাধু উপায়ে নেওয়া সংযোগ থেকে। যখন দেশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলছে, তখন এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় জাতীয় গ্রিডের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। অনেক গ্যারেজে গভীর রাতে বিদ্যুৎ চুরির মহোৎসব চলে, যা সরকারকে বড় ধরনের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে। অটোরিকশার এই বিশৃঙ্খলার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা টোকেন বা বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে এই অবৈধ বাহনগুলোকে সড়কে চলার অনুমতি দেয়। প্রশাসন মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধান আনতে পারছে না। কঠোর আইনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে এই বাহনগুলো দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
অটোরিকশা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের একটি মাধ্যম, এটি যেমন সত্য, তেমনি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলার অধিকার কারও নেই। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও কঠোর পরিকল্পনা-
ঢালাওভাবে সড়কে চলতে না দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক রুট পারমিট ও নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। প্রধান ও মহাসড়কে এদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। চালকদের জন্য নূন্যতম বয়সের সীমা নির্ধারণ এবং ট্রাফিক নিয়মাবলি সম্পর্কে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যত্রতত্র তৈরি রিকশা বন্ধ করে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি মানদ- অনুযায়ী নিরাপদ বাহন তৈরির নিয়ম করতে হবে। বিদ্যুৎ চুরি রোধে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে বৈধ চার্জিং স্টেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা ট্রাফিক আইন অমান্য করবে এবং উল্টো পথে চলবে, তাদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানাসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
উন্নয়নের মূল শর্ত হলো সুশৃঙ্খল যোগাযোগ ব্যবস্থা। আধুনিক স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে যত্রতত্র ও অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দাপট একটি বড় বাধা। আমরা কর্মসংস্থানের বিরোধী নই, কিন্তু সেই কর্মসংস্থান যদি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ায় এবং জনজীবনকে থমকে দেয়, তবে তা কাম্য হতে পারে না। সময় এসেছে নীতি-নির্ধারকদের এই বিষয়ে কঠোর হওয়ার। প্রশাসনের সদিচ্ছা এবং জনগণের সচেতনতাই পারে আমাদের সড়কগুলোকে আবার নিরাপদ ও যানজটমুক্ত করতে।