ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

রাজনীতি যদি হয় জনগণের কল্যাণে তবে নির্বাচন করতে টাকা লাগবে কেন

ওসমান গনি
রাজনীতি যদি হয় জনগণের কল্যাণে তবে নির্বাচন করতে টাকা লাগবে কেন

রাজনীতি শব্দের আভিধানিক অর্থ যা-ই হোক না কেন, এর প্রকৃত নির্যাস হলো- জনসেবা এবং আর্তমানবতার কল্যাণ। একটি আদর্শিক রাষ্ট্রে রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল সবচেয়ে পবিত্র মাধ্যম, যেখানে ত্যাগ আর মমতা হবে মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন জনমনে বারবার উঁকি দিচ্ছে- রাজনীতি যদি সত্যিই দেশ ও জনগণের মঙ্গলের জন্য হয়, তবে সেই সেবার সুযোগ পাওয়ার জন্য অর্থাৎ নির্বাচন করার জন্য কেন কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে? কেন অর্থের মাপকাঠিতে একজন নেতার যোগ্যতা নির্ধারিত হবে? এই প্রশ্নটি আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যদি আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের নেতাদের মূল উদ্দেশ্যই হয় দেশ ও মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন, তবে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মানুষের সঙ্গে আত্মার আত্মীয়তা গড়ে তোলা। কারণ, মানুষের মনস্তত্ত্ব হলো, মানুষ কখও তার আপন মানুষের কাছ থেকে বৈষয়িক সুবিধা বা টাকা নিতে চায় না। বরং আপনজনের জন্য মানুষ নিঃস্বার্থভাবে নিজের শ্রম ও মেধা বিলিয়ে দেয়। রাজনীতির মাঠে যখন অর্থের লেনদেন মুখ্য হয়ে ওঠে, তখনই বুঝতে হবে সেখানে ‘আপন’ হওয়ার এবং মানুষের বিশ্বাস অর্জনের বড় অভাব রয়েছে।

একজন রাজনীতিবিদ যখন নিজেকে সাধারণ মানুষের কাছে একজন স্বচ্ছ ও সৎ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, তখন তাকে আর প্রচারণার পেছনে অঢেল টাকা ঢালতে হয় না। মানুষের বিশ্বাস এক বিশাল অলৌকিক শক্তি। কাজে-কর্মে এবং আচরণে যদি একবার মানুষকে বিশ্বাস করানো যায় যে, ‘এই মানুষটি আমাদেরই একজন এবং তিনি আমাদের বিপদে ছায়া হয়ে থাকবেন’, তবে সেই মানুষ কখনওই তার নেতার কাছ থেকে নগদ টাকা দাবি করবে না। বরং নির্বাচনের সময় তারাই বিনাপয়সায় নেতার হয়ে মাঠে নামবে। আপন মানুষের জন্য মানুষ যা কিছু করে, তা মন ও হৃদয়ের গভীর থেকে ‘ফিসাবিলিল্লাহ’ বা একনিষ্ঠ চিত্তে করে থাকে। এই যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার টান, এটাই হতে পারে একজন সত্যিকারের জননেতার সবচেয়ে বড় নির্বাচনি তহবিল। জননেতা যদি সাধারণ মানুষের মন একবার জয় করতে পারেন, তবে ভোটের জন্য তাকে টাকার পাহাড় গড়তে হয় না, বরং জনগণই নিজেদের সাধ্যমতো নেতার নির্বাচনি খরচ জোগাড় করতে এগিয়ে আসে। নেতার জন্য মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই হলো সার্থক ও আদর্শ রাজনীতির আসল পরিচয়।

একজন এমপি, মন্ত্রী বা প্রভাবশালী নেতার কাছ থেকে এদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আসলে কতটুকু? তারা কি নেতার সিন্দুক থেকে অঢেল সম্পদ চায়? না, তারা তা চায় না। এদেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া অত্যন্ত সীমিত এবং খুবই মানবিক। তারা শুধু চায় নির্বাচনের জয়ী হওয়ার পর নেতা যেন তাদের সুখে-দুখে একটু পাশে থাকেন, মাথায় একটু স্নেহের হাত বুলিয়ে দেন। রাস্তাঘাটে দেখা হলে নেতা যেন ক্ষমতার দাপটে মুখ ফিরিয়ে না নিয়ে একটু হাসিমুখে কথা বলেন, সামান্য কুশল বিনিময় করেন। এই যে সামান্য একটু ‘ভালো আছেন?’ জিজ্ঞাসা করা, এটুকুই একজন সাধারণ মানুষের কাছে পরম পাওয়া। তারা কখনো কোনো নেতার কাছে থেকে ব্যক্তিগত বড় বড় বৈষয়িক সুবিধা নেওয়ার জন্য হাহাকার করে না। বরং তারা চায় নেতার সান্নিধ্য, একটু মানসিক সান্ত¡না এবং আন্তরিকতা। একজন রাজনীতিবিদ যদি নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়মিত তার নির্বাচনি এলাকায় ঘুরে বেড়ান, মানুষের অভাব-অভিযোগ সরাসরি শোনেন এবং তাদের ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজখবর নেন, তবে সেই মানুষটি সেই নেতাকে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। এদেশের মানুষের হৃদয় মাটি ও জলের মতো অতিনরম ও কোমল। তারা যাকে একবার আপন বলে হৃদয়ে ঠাঁই দেয়, তাকে পর ভাবা তাদের স্বভাবে নেই।

কিন্তু আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক ভয়াবহ অবক্ষয় লক্ষ্য করা যায়। একবার ক্ষমতার মসনদে বসলে, অনেক নেতা সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যান। যে মানুষের ভোটে তিনি নির্বাচিত হলেন, তাদের সঙ্গেই তার দূরত্ব তৈরি হয় যোজন যোজন। তার মধ্যে এক প্রকারের কৃত্রিম আভিজাত্য, গাম্ভীর্য ও অহংকার দানা বাঁধে। তিনি ভুলে যান যে, এই ক্ষমতার উৎস কোনো দৈব শক্তি নয়, বরং সাধারণ মানুষই। এই অহংকারী অভ্যাসটি একজন রাজনীতিকের জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী। মানুষের আপন হতে না পারলে কখনোই মানুষের প্রকৃত কল্যাণ করা সম্ভব নয়। আর মানুষের ব্যক্তিগত ও আত্মিক কল্যাণ করতে না পারলে রাষ্ট্র বা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়ন করাও আকাশকুসুম কল্পনা মাত্র। জনবিচ্ছিন্ন নেতা যখন মানুষের চোখের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হন, তখন মানুষও তার প্রতি ধীরে ধীরে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে যা হয় তা আরও ভয়াবহ- নির্বাচন এলে মানুষ তখন আর নেতার প্রতি ভালোবাসা বা টান অনুভব করে না।

মানুষ তখন সুযোগ খোঁজে নেতার ক্ষতি করার, তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। তখন নেতাকে ভোট পাওয়ার জন্য ভালোবাসার বদলে টাকার আশ্রয় নিতে হয়, পেশ পেশিশক্তি ব্যবহার করতে হয়। এই দুষ্টচক্রটি ভাঙা আজ সময়ের দাবি।

একজন নেতার মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধাগুলোর সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। একটি নির্বাচনি এলাকার সব মানুষ; কিন্তু সমান অভাবী নয়, আবার সবাই রাষ্ট্রের দয়া বা সাহায্য নিতে ইচ্ছুকও নয়। সমাজের একটি বিশাল অংশ খুব সামান্য সংস্থান নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে চায়। তাদের বড় কোনো বৈষয়িক চাহিদা থাকে না। তাদের একমাত্র আকুতি হলো স্থানীয় নেতার একটু ন্যায়বিচার, একটু স্নেহ এবং বিপদে পড়লে সঠিক দিকনির্দেশনা। অথচ দেখা যায়, সুষম বণ্টনের অভাবে এবং স্বজনপ্রীতির কারণে সেই রাষ্ট্রীয় সেবাগুলোও সাধারণের কাছে পৌঁছায় না। যদি একজন নেতা স্বচ্ছতার সঙ্গে এই বণ্টন নিশ্চিত করতে পারেন এবং বৈষম্য দূর করেন, তবে মানুষ তার নাম হৃদয়ে আজীবনের জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখবে। রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক গড়ে তোলা। যে নেতা তার এলাকার মাটি ও মানুষের দীর্ঘশ্বাস অনুভব করতে পেরেছেন, তার জীবন সবখানেই ধন্য। তাকে নির্বাচনের সময় দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোটের ভিক্ষা করতে হবে না বা টাকার লোভ দেখাতে হবে না। বরং তার সততা, যোগ্যতা এবং মানুষের প্রতি অগাধ মমত্ববোধের কারণে মানুষই তাকে খুঁজে বের করবে। তাকেই প্রতিনিধি বানাতে মরিয়া হয়ে উঠবে সমাজ।

বর্তমান আধুনিক যুগে আমরা তথাকথিত ‘স্মার্ট’ রাজনীতির কথা বলি, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে না পারলে কোনো প্রযুক্তিই আপনাকে জনপ্রিয় করতে পারবে না। তৃণমূলের সাধারণ মানুষ চায় এমন একজন নেতা, যাকে তারা নিজের আপন বড় ভাই বা বাবার মতো শ্রদ্ধা করতে পারে। নেতা যখন জনগণের সেবক না হয়ে ‘প্রভু’ হয়ে ওঠেন, তখনই রাজনীতিতে টাকার প্রয়োজন পড়ে। কারণ ভীতি বা টাকার লোভ দিয়ে সাময়িক আনুগত্য পাওয়া গেলেও ভালোবাসা পাওয়া যায় না। একজন নেতার আসল পরীক্ষা হয় তখনই, যখন তিনি ক্ষমতায় থাকেন না। যদি ক্ষমতায় না থেকেও মানুষ আপনাকে ভালোবেসে পাশে দাঁড়ায়, তবেই আপনি সফল রাজনীতিক। তাই রাজনীতির চিরাচরিত এই নেতিবাচক ধারা পরিবর্তন করতে হবে। ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন করা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজ ও স্বাভাবিক মেলামেশাই পারে এই পরিবর্তন আনতে।

পরিশেষে বলতে হয়, রাজনীতির সংস্কার শুরু হওয়া উচিত ব্যক্তিগত আচরণ, চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং প্রশ্নাতীত সততা থেকে। টাকা দিয়ে সাময়িক ভোট কেনা সম্ভব হলেও মানুষের চিরস্থায়ী দোয়া ও ভালোবাসা কেনা যায় না। যদি রাজনীতি হয় মানুষের জন্য, তবে সেই রাজনীতিতে অর্থের চেয়ে ত্যাগের মহিমা এবং নৈতিকতা অনেক বেশি হওয়া প্রয়োজন। আমাদের নেতাদের উচিত অহংকার বিসর্জন দিয়ে সাধারণ মানুষের সারিতে এসে দাঁড়ানো। তাদের চোখের জল মোছানো এবং তাদের দুঃখগুলোকে নিজের মনে করা। যেদিন এদেশের রাজনীতিতে টাকার দাপট পুরোপুরি বন্ধ হবে এবং মানুষের প্রতি নিরেট মমত্ববোধের জয় হবে, সেদিনই সত্যিকারের কল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারাই হলো সফল রাজনীতির একমাত্র চাবিকাঠি। তাই আসুন, আমরা অর্থের নোংরা রাজনীতি ত্যাগ করে মানুষের হৃদস্পন্দন বোঝার রাজনীতি শুরু করি। যেখানে নেতা হবেন জনগণের পরম নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, আর জনগণ হবে নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি ও সম্পদ।

ওসমান গনি

সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত