প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূগোল, ইতিহাস ও রাষ্ট্রচিন্তার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাহাড়, বন, নদী আর বহুজাতিক সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা পর্যটন সম্ভাবনার প্রতীক নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় সংহতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই সম্ভাবনাময় অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে অবিশ্বাস, বিভাজনমূলক রাজনীতি, উন্নয়ন বৈষম্য, সহিংসতা এবং দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের পরিকল্পিত তৎপরতার মধ্য দিয়ে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংকট বহন করে চলেছে। এই বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আবেগনির্ভর বক্তব্য, একপাক্ষিক দোষারোপ বা বিদ্বেষমূলক রাজনৈতিক অবস্থান কোনো সমাধান দিতে পারেনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সময়ের দাবি হলো, আবেগ নয় বরং বাস্তবভিত্তিক, সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, সম্প্রীতি, উন্নয়ন ও সহাবস্থানের পথ নির্মাণ করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম সংকট নিরসনে রাষ্ট্রের ভূমিকা কেন্দ্রীয় ও নির্ধারক। এটি কোনো একক মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রশাসনিক কাঠামোর একক দায়িত্ব নয়। এখানে প্রয়োজন সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বাঙ্গীণ রাষ্ট্রীয় কৌশল। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সত্য যেমন অস্বীকারযোগ্য নয়, তেমনি এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সকল নাগরিকের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার রক্ষা করাও সংবিধানস্বীকৃত রাষ্ট্রীয় দায়। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো পক্ষকে খুশি করার রাজনীতি নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও নাগরিক অধিকারের সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়া উচিত নীতির ভিত্তি।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ ছিল। তবে দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও এর বহু ধারা বাস্তবায়নে জটিলতা, মতবিরোধ ও কাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে। এ বাস্তবতায় চুক্তিকে ‘ট্যাবু’ বানানো বা অন্ধ সমর্থন, বিরোধের বাইরে গিয়ে সময়োপযোগী পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। কোন ধারা বাস্তবায়নযোগ্য, কোনটি সংশোধনযোগ্য, আর কোন ক্ষেত্রে নতুন আইনগত বা প্রশাসনিক কাঠামো দরকার, তা নিয়ে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। উন্নয়নকে হতে হবে আস্থাভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন টেকসই হয় না। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও হতে হবে পেশাদার, মানবিক ও আস্থাবান্ধব।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধনের ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থ, সংকীর্ণ রাজনৈতিক হিসাব কিংবা পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি তাদের কার্যকর ভূমিকা সীমিত করে ফেলে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের করণীয় হলো- সকল জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের স্বার্থ সমান গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা, উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিভাজনমূলক রাজনীতি পরিহার করা, ভূমি বিরোধ, সম্পদ বণ্টন ও সামাজিক দ্বন্দ্বে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া নয়, বরং সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সাংবাদিকতা অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দায়িত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। ভুল তথ্য, যাচাইহীন অভিযোগ বা একপাক্ষিক প্রতিবেদন পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। সেক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজন- ফ্যাক্টচেক ও মাঠভিত্তিক অনুসন্ধানী রিপোর্টিং, বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সামগ্রিক বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন না করা, সহিংসতা, সন্ত্রাস বা উসকানিকে গ্লোরিফাই না করা, উন্নয়ন, শান্তি ও সহাবস্থানের ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকেও গুরুত্ব দেওয়া। সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতা পার্বত্য চট্টগ্রামে আস্থার সংকট কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সুশীল সমাজ পার্বত্য চট্টগ্রামে সংলাপ ও আস্থার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, কিছু এনজিও ও তথাকথিত নাগরিক প্ল্যাটফর্ম কখনো কখনও অজান্তেই বা সচেতনভাবে নির্দিষ্ট দেশি-বিদেশি এজেন্ডার বাহক হয়ে ওঠে। সুশীল সমাজের দায়িত্ব হলো- স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সমস্যা ও চাহিদা তুলে ধরা, বিদেশি দাতার শর্ত নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা, সহিংসতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা। সুশীল সমাজ যদি নিরপেক্ষ থাকে, তবে তারা সংঘাত নয়, সমাধানের অংশ হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি শুধু রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা নীতির মাধ্যমে আসবে না। সাধারণ মানুষের আচরণ, মনোভাব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই সহাবস্থানের ভিত্তি। এক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের করণীয় হলো- ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা থেকে দূরে থাকা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা ও স্থানীয় বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া। সহাবস্থান কোনো স্লোগান নয়, এটি প্রতিদিনের আচরণ ও চর্চার বিষয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চায়। আবার কিছু বিদেশি লবি মানবাধিকার বা ‘আদিবাসী’ ইস্যুকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন- রাষ্ট্রের দৃঢ় কিন্তু সংযত অবস্থান, নিরাপত্তা বাহিনীর পেশাদার ও মানবিক কার্যক্রম আরও বাড়ানো, অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, বিদেশি অর্থায়ন ও কার্যক্রমের স্বচ্ছ তদারকি। নিরাপত্তা বাহিনীকে দমনমূলক নয়, বরং স্থিতিশীলতা ও আস্থার রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করাও জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট কোনো একপক্ষের দোষারোপে বা আবেগনির্ভর রাজনীতিতে সমাধান হবে না। এটি ইতিহাস, রাজনীতি, উন্নয়ন ও আস্থার এক জটিল সমন্বিত সংকট। এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত, পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি। বিদ্বেষ নয়, চাই দায়িত্বশীল রাজনীতি। উসকানি নয়, চাই তথ্যভিত্তিক আলোচনা। বিভাজন নয়, চাই সহাবস্থান। রাষ্ট্র যদি সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করে, জনপ্রতিনিধি যদি দায়িত্বশীল হন, সাংবাদিকতা যদি নৈতিক হয়, সুশীল সমাজ যদি নিরপেক্ষ থাকে এবং সাধারণ মানুষ যদি সহাবস্থানের সংস্কৃতি ধারণ করে, তবেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের পথে এগোবে। এই পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, দূরদৃষ্টি এবং পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত।
এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা