ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ | বেটা ভার্সন

সাইবার নিরাপত্তা হুমকির মুখে

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম
সাইবার নিরাপত্তা হুমকির মুখে

ডিজিটালাইজেশনের গতিতে সমগ্র পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে, আমরাও তাতে পিছিয়ে নেই। অনলাইন ব্যাংকিং, ই-কমার্স, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বিনোদন সর্বত্র ইন্টারনেট ব্যবহারের পরিমাণ বাড়ছে। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধও লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে। যা শুধু ব্যক্তিগত বা প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বলতে কম্পিউটার, নেটওয়ার্ক, সার্ভার, মোবাইল ডিভাইস ও ডেটাকে অননুমোদিত প্রবেশ, চুরি, ক্ষতি বা ধ্বংসের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখাকে বোঝায়। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির কাছাকাছি। বর্তমানে হ্যাকিং, ফিশিং, র‍্যানসমওয়্যার, ডেটা লিক, পরিচয় চুরি ও ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন। ব্যাংকিং খাত, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি সরকারি দপ্তরও সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী দুর্বল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন, সন্দেহজনক লিংকে ক্লিক করেন বা সামাজিক মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেন। এসব কারণে সাইবার অপরাধীরা সহজেই সুযোগ পেয়ে যায়। বিশেষ করে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে প্রতারণার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর তথ্য দেখলে স্পষ্ট হয় সাইবার অপরাধের প্রবণতা কতটা উদ্বেগজনক।

গত পাঁচ বছরে প্রায় ১.৮ লাখেরও বেশি সাইবার অপরাধের অভিযোগ দায়ের হয়েছে বিভিন্ন দপ্তরে, যার মধ্যে ২০২৫ সালে প্রায় ৫,০০০টি মামলা তদন্তাধীন ছিল বলে জানায় ডিবি ও সিআইডি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে সাইবার অপরাধের শিকারদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ নারী এবং প্রায় ৭৮ শতাংশ ভুক্তভোগী যুবক (১৮-৩০)। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংই সবচেয়ে বেশি (২১.৬৫ শতাংশ) দেখা গেছে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপ ও সামাজিক অসম্মানও ভুক্তভোগীদের একটি বড় সমস্যা। সাইবার অপরাধ গোটা বিশ্বজুড়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং প্রচুর পরিমাণে আর্থিক ক্ষতি করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ঋইও-র একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২৪ সালে সাইবার অপরাধের কারণে ক্ষতির পরিমাণ ১৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ছাড়িয়েছে। বড় কোম্পানির ডেটা চুরি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে অর্থ হারাতে হচ্ছে। ফলে এই ফিনান্সিয়াল ইফেক্ট সাইবার নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তিগত ইস্যু না রেখে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটেই পরিণত করছে।

২০২১ সালের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল বাংলাদেশ সাইবার সিকিউরিটিতে সার্ক অঞ্চলে শীর্ষের দিকে ছিল এবং বিশ্ব ১৬০ দেশের মধ্যে ৩৮তম অবস্থান পেয়েছে। অন্য দিকে সাম্প্রতিক একটি সূচকে বলা হয়েছে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী ন্যাশনাল সাইবার সিকিউরিটি ইনডেক্সে ৭৩তম ও গ্লোবাল সাইবার সিকিউরিটি ইনডেক্সে ৫৩তম অবস্থানে আছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রস্তুতি, কৌশল এবং বাস্তবায়ন আরও জোরদার করতে হবে। সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন, জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা, ইএউ ব-এঙঠ ঈওজঞ এবং পুলিশের সাইবার ইউনিট গঠন করা হয়েছে সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য। কিন্তু এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য আরও প্রশিক্ষিত কর্মী ও আধুনিক প্রযুক্তি দরকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সফল করতে সাইবার নিরাপত্তার উন্নয়ন অপরিহার্য। প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, আইন বাস্তবায়ন, শিক্ষার প্রসার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চললে ব্যক্তিগত তথ্য ও আর্থিক নিরাপত্তা বিপন্ন হবে এবং সামাজিক আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে। তাই এখনই আমাদের সাইবার নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এসেছে। সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সঙ্গে মানবিক সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেট, দুই ধাপে যাচাইকরণ পদ্ধতি চালু করা এবং অচেনা ইমেইল বা লিংক এড়িয়ে চলা ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে উন্নত সাইবার সুরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তৈরি করা জরুরি।

এছাড়া কার্যকর সাইবার আইন প্রয়োগ ও অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা দেওয়া হয় না। ফলে তরুণ প্রজন্ম সহজেই সাইবার নিরাপত্তা হারাচ্ছে এবং ক্রাইমে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও সচেতন হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, নিয়মিত তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন ও সচেতনতামূলক লেখার মাধ্যমে।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর ইসলাম

শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত