ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

গবেষণায় বিনিয়োগই হোক আগামীর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি

প্রজ্ঞা দাস
গবেষণায় বিনিয়োগই হোক আগামীর মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি

‘মার্কেটিং’ বর্তমানের আধুনিক মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্ম। মার্কেটিংকে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং গ্রাহকের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার প্রধান হাতিয়ারও বলা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মার্কেটিংয়ের ধারণাটি এখনও মূলত পণ্য প্রদর্শন, গ্ল্যামারনির্ভর বিজ্ঞাপন এবং সস্তা প্রচারণায় বন্দি রয়েছে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক কর্পোরেট সংস্কৃতিতে মার্কেটিং এখন আর শুধু বিক্রয় বৃদ্ধির কৌশল নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগ। মূলত উন্নত বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের মার্কেটিং বাজেটের একটি বিশাল অংশ ব্যয় করে মৌলিক গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের উদ্ভাবন এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তারা জানে আজকের গবেষকই আগামী দিনের প্রযুক্তি নির্মাতা, এবং সেই প্রযুক্তিই ভবিষ্যতের বাজার তৈরি করবে। শুধু সেটাই নয় বরং বাজার ব্যবস্থাকে উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে আমূল পরিবর্তন আনবে। এই ভাবধারা থেকেই মার্কেটিং ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি রূপান্তরিত হয় জ্ঞান বিনিয়োগে। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশে এই গবেষণায় সাহায্যের মার্কেটিং সংস্কৃতির অনুপস্থিতি শুধু মেধাসম্পদকে দেশের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর পথ কঠিন করছে সেটাই নয়, বরং সস্তা মার্কেটিং স্ট্রেটেজির জন্য প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে অর্থ জাতীয় অর্থনীতি থেকে নষ্ট হচ্ছে। ফলে যেহেতু নতুন কিছু উদ্ভাবন হচ্ছে না, তাই দীর্ঘমেয়াদিভাবে কর্পোরেট ও শিল্প খাত পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যা অদূর ভবিষ্যতে জাতির জন্য লজ্জাজনক হয়ে উঠবে। গবেষণার সাহায্যের মাধ্যমে মার্কেটিং ধারাটি শুধু কর্পোরেট দায়বদ্ধতার আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। বহির্বিশ্বে বড় বড় উন্নত গবেষণার পিছনে রয়েছে কর্পোরেট সেক্টরে অবদান। এই অবদানের ফলশ্রুতিতেই এ সব উন্নত দেশগুলো শিল্পখাতের তহবিল গবেষণাকে বাজারোপযোগী উদ্ভাবনে রূপান্তরিত করেছে। কর্পোরেট ব্র্যান্ড সেখানে নিজেই গবেষণার টেবিলে বসে এবং কোন নির্ভরশীলতা ছাড়াই তারা একটু একটু করে তৈরি করে আগামী দিনের উন্নয়নের সেতু। কিন্তু বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরগুলো গবেষণায় বিনিয়োগকে মার্কেটিং লেভেলের নিয়ে যেতে পুরোপুরী অনুৎসাহী। মূলত এর পেছনে রয়েছে গভীর চিন্তাগত দৈনতা। আমাদের দেশের বড় বড় ব্রান্ড এবং কোম্পানিগুলো মনে করেন, সরাসরি বিজ্ঞাপনে টাকা ঢাললে তাৎক্ষণিক বিক্রয় বাড়ে। কিন্তু তারা এটা ভেবেই দেখেন না যে, বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগের মাধ্যমে যে ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়, তা কোনো সেলিব্রিটি এন্ডোর্সমেন্ট দিয়ে সম্ভব নয়। একজন মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থী যখন কোনো কোম্পানির স্কলারশিপে বা ল্যাব সাপোর্ট নিয়ে বিশ্বমানের কোনো সমাধান বের করে, তখন সারা বিশ্ব সেই প্রতিষ্ঠানের কথা জানতে পারে। তখন মার্কেটিং হয় দেশ ছাপিয়ে বৈশিক ভাবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও ওই কোম্পানির প্রতি এক ধরনের মানবীয় শ্রদ্ধা ও আস্থা তৈরি হয়, তা কয়েক হাজার বিলবোর্ড দিয়েও অর্জন করা অসম্ভব। বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো যদি মার্কেটিং বাজেটের মাত্র ২০ শতাংশও গবেষণায় বরাদ্দ করে, তবে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর শত শত পেটেন্ট এবং উদ্ভাবন বেরিয়ে আসতো। বাংলাদেশেও প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু সঠিক সুযোগ আর অর্থের অভাবে তাদের ভেতরের উদ্ভাবনী শক্তি সারা পৃথিবীর সামনে আসে না। মূলত বাংলাদেশে বর্তমানের মার্কেটিং সিস্টেম হল কনজাম্পশন ড্রাইভেন বা ভোগবাদী। এটি মানুষকে শুধু খরচ করতে শেখায়। কিন্তু সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন নলেজ ড্রাইভেন বা জ্ঞানভিত্তিক মার্কেটিং। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো আজ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যখন গবেষণার অর্থের অভাবে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমাচ্ছে, তখন আমাদের দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো দেশের ভেতরেই কোটি কোটি টাকা খরচ করছে অর্থহীন মার্কেটিং এর পিছনে। অথচ ক্যাম্পাস টু কর্পোরেট মডেলের মাধ্যমে এই অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা হতে পারত। এক্ষেত্রে যেকোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের বার্ষিক প্রচারণার অংশ হিসেবে দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয়েকটি উন্নত ল্যাব স্থাপন করে দিত, তবে সেটি হতো বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিপণন কৌশল। কারণ সেই ল্যাবে তৈরি হওয়া প্রতিটি উদ্ভাবনের সঙ্গে ওই কোম্পানির নাম আজীবন জড়িয়ে থাকত। সবচেয়ে বড় কথা এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকতে চাইলে কোনভাবেই সম্ভব নয় বরং ছিটকে পরা অবধারিত। কেননা আন্তর্জাতিক বাজারে যখন একটি ব্র্যান্ড নিজের অবস্থান তৈরি করতে চায়, তখন তার পরিচয় শুধু তার পণ্য দিয়ে হয় না, বরং হয় তার উদ্ভাবনী সক্ষমতা দিয়ে। তবে এই ধারণা কখনোই পোষণ করা যাবে না যে মেধাবী শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সাহায্য করা মানে শুধু তাদের প্রতি দয়া করা হচ্ছে। বরং দক্ষ জনবল তৈরি করার পথ শুগম করা হচ্ছে। যে শিক্ষার্থী আজ কোনো কোম্পানির স্পন্সরশিপে গবেষণা করছে, সে ভবিষ্যতে সেই ইন্ডাস্ট্রিরই নেতৃত্ব দেবে। এটি একটি চক্রাকার লাভজনক প্রক্রিয়া, যেটা নিয়ে দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা এখনও উদাসীন। বর্তমানে সস্তা মার্কেটিং স্ট্র্যাটিজি থেকে বেরিয়ে এসে উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণা নির্ভর মার্কেটিং স্ট্রাটেজি গ্রহণ না করলে সামনে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বড়সড় ধাক্কা খেতে চলেছে। যা কোনভাবেই বাংলাদেশের জন্য কল্যাণকর হবে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের মানসিকতায়। মার্কেটিং মানেই শুধু রঙিন পর্দার জৌলুস নয়, বরং ভবিষ্যতের দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশের মার্কেটিং স্ট্র্যাটিজিকে ঢেলে সাজাতে হবে। অর্থহীন প্রচারণার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং গবেষণা সহায়ক মার্কেটিং কাঠামো তৈরি করতে হবে। এতে মার্কেটিং ও হবে ,পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও উদ্ভাবনী ক্ষেত্র তৈরির পথ প্রশস্ত হবে। এই মার্কেটিং স্ট্যাটিজি ক্যাম্পাস টু কর্পোরেট মডেলের করা গেলে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডগুলো ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন মোর নেবে এবং আরও উন্নত হবে, যা দেশকে পুরো পৃথিবীর সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সহায়তা করবে।

প্রজ্ঞা দাস

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত