ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই কি খুন হতে হলো লিমনকে

আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার কারণেই কি খুন হতে হলো লিমনকে

খুন হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে রুমমেট হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে ‘অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টের’ কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিলেন জামিল আহমেদ লিমন। সিএনএনকে এ কথা বলেছেন লিমনের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ। জুবায়ের সিএনএনকে বলেন, ‘আমার ভাই (লিমন) মাত্র দুই মাস আগে ওই অ্যাপার্টমেন্টে উঠেছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভাই প্রায়ই বলতেন, আবুঘরবেহ খুবই খারাপ, বিরক্তিকর এবং একজন অসামাজিক মানুষ।’ জুবায়ের আরও বলেন, তার ভাই লিমন খুন হওয়ার মাত্র সপ্তাহ দুই আগে আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে ‘অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্টের’ কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছিলেন বলেও তিনি শুনেছেন।

জুবায়েরের এ দাবি যাচাই করতে সিএনএন ওই আবাসিক কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতে যে নথিপত্র জমা দিয়েছেন, সেখানে আরও বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে আবুঘরবেহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) চ্যাটবট চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেছিলেন, কোনো ব্যক্তিকে যদি একটি কালো রঙের আবর্জনার ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়, তাহলে কী ঘটতে পারে?

১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৭) নিখোঁজ হন। পরদিন তাদের এক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গত শুক্রবার মার্কিন নাগরিক আবুঘরবেহকে তাঁর পারিবারিক বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে বলা হয়, আবুঘরবেহকে জিজ্ঞাসাবাদের পর শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগের মধ্যে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, লিমনের মরদেহে কোনো কাপড় ছিল না এবং মরদেহে একাধিক ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল।

এ ঘটনায় আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার (ফার্স্ট ডিগ্রি) হত্যার দুটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তার কাছ থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধারের কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত আরেক শিক্ষার্থী বৃষ্টির মৃতদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে যেখানে লিমনের মৃতদেহ পাওয়ার গেছে, সেখান থেকে কিছুটা দূরে একটি জলাশয়ে গত রোববার একটি মৃতদেহের খণ্ডিত অংশ পাওয়া গেছে। সেটি বৃষ্টির কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ দিয়ে ১৭ এপ্রিল দিবাগত রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে যাতায়াত করা যেকোনো প্রাইভেট কারের ড্যাশক্যাম ভিডিও খুঁজছেন।

হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এ কথা বলা হয়েছে। ওই পোস্টে সেতুর কাছে একটি নৌকায় থাকা ডেপুটিদের একটি ভিডিও- ও রয়েছে; যা দেখে মনে হচ্ছে, তাঁরা অনুসন্ধান অভিযান চালাচ্ছিলেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, ২৬ বছর বয়সী আবুঘরবেহকে গতকাল মঙ্গলবার শুনানির (স্ট্যাটাস হেয়ারিং) জন্য আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। এর আগে একটি ‘প্রিট্রায়াল ডিটেনশন’ শুনানিতে আবুঘরবেহকে উপস্থিত করার কথা ছিল, কিন্তু তা পরে স্থগিত হয়।

লিমনের মরদেহ উদ্ধারের পরদিন শনিবার হিলসবরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় থেকে আদালতে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। রোববার সেটি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিমনের মরদেহে ‘ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন’ দেখা গেছে। আদালতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, পরে মেডিক্যাল পরীক্ষার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লিমনের মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিমনের পিঠের নিচের অংশে একটি গভীর ছুরিকাঘাতের আঘাত ছিল, যা তার লিভার (যকৃৎ) ভেদ করে যায়। এ ছাড়া তার শরীরে আরও আঘাতের চিহ্ন ছিল। তদন্ত কর্মকর্তারা আদালতের কাছে করা আবেদনে আরও বলেছেন, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তির ভুক্তভোগীদের হত্যার এই নির্মম ও সহিংস প্রকৃতি প্রমাণ করে, তাকে ছেড়ে দিলে তা সমাজের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কোনো ধরনের শর্ত সাপেক্ষে মুক্তিও ওই এলাকার লোকজনকে শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকে যুক্তিসংগতভাবে রক্ষা করতে পারবে না।’

ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে আতঙ্কে সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা : ক্যাম্পাসের বাইরে একটি অ্যাপার্টমেন্টে দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী খুন হওয়ার পর ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। নিজেদের বসবাসের ব্যবস্থা নিয়ে তাঁরা নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। নিহত দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী বাংলাদেশের নাগরিক ছিলেন। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নিহত এক শিক্ষার্থীর রুমমেটকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিহত ওই শিক্ষার্থীর নাম জামিল আহমেদ লিমন। তিনি এবং সন্দেহভাজন হিসেবে আটক হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ ক্যাম্পাসের বাইরে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন।

নিহত অন্য শিক্ষার্থীর নাম নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি। লিমনের সঙ্গে বৃষ্টির প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তারা বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন বলে দাবি করেছেন লিমনের ভাই। সন্দেহভাজন আবুঘরবেহ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তিনি সাউথ ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষার্থী আলিসিয়া বলেন, ‘আমি বলব, এটা সত্যিই ভয়ানক! সাধারণত আমরা এসব ঘটনা অন্য জায়গায় ঘটতে দেখি। কিন্তু যখন খুব কাছাকাছি এমন কোনো ঘটনা ঘটে, যেমন নিজের স্কুলে বা এমন কোনো অ্যাপার্টমেন্টে, যেটার একদম পাশেই আপনি থাকেন, তখন সেটা বেশ ভয় ধরিয়ে দেয়।’ আলিসিয়া আরও বলেন, তার মা- বাবা বিদেশে থাকেন। এ ঘটনা শোনার পর তারা তাকে খুব সাবধানে থাকতে বলেছেন। এই তরুণী বলেন, এটা শিক্ষার্থীদের এবং তাদের পরিবারের জন্য খুবই দুঃখজনক; বিশেষ করে যেহেতু তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থী নাথান আরনান বলেন, এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে যেখান থেকে হিশাম সালেহ আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেখান থেকে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্বে তার অ্যাপার্টমেন্ট। তিনি ক্যাম্পাসের বাইরে বসবাসের জন্য আরও নিরাপত্তার শর্ত জারি এবং অতীত ইতিহাস যাচাই করার ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন। আরনান বলেন, ‘আমি মনে করি, কারও মাথার ওপর অপহরণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বা এ ধরনের কোনো ঝুঁকি থাকা উচিত নয়।’

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে সদ্য পড়তে আসা এভারেট বলেন, এ ঘটনা এখন পর্যন্ত রুমমেট বেছে নেওয়ার বিষয়ে তার চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেনি। তবে আগামী সেমিস্টারে ক্যাম্পাসের বাইরে বাসস্থানের খোঁজ করার সময় তিনি বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় রাখবেন। এভারেট বলেন, ‘সাধারণভাবে বলতে গেলে, ইউএসএফ একটি ভালো স্কুল এবং ভালো কমিউনিটি। আমার মনে হয় না, এখানে কোনো সমস্যা থাকার কথা।’

যুক্তরাষ্ট্রে নিহত ২ শিক্ষার্থীর দেহাবশেষ দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে- পররাষ্ট্রমন্ত্রী : যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় নির্মমভাবে নিহত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর দেহাবশেষ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গতকাল সোমবার সংসদে জামালপুর-২ আসনের সরকারি দলের সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবুর টেবিলে উত্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। ড. খলিলুর রহমান সংসদকে জানান, ওই দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর থেকেই ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ফ্লোরিডায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তারা নিহতদের শোকার্ত পরিবার, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নিহত শিক্ষার্থীদের দেহাবশেষ দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বর্তমানে সরকারের বিশেষ তদারকিতে রয়েছে। বিদেশে কর্মরত ও অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দূতাবাসগুলো যাতে প্রবাসীদের জন্য কেবল দাপ্তরিক ভবন না হয়ে ‘আস্থার ঠিকানা’ হিসেবে গড়ে ওঠে, সেই লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত