প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
বাংলাদেশে ধর্ষণ নারী ও শিশু নির্যাতনের এক ভয়াবহ রূপ, যা বর্তমানে চরম জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপরীতে সামাজিক অবক্ষয় ও নারীর নিরাপত্তাহীনতা আজ এক প্রকট বৈপরীত্য তৈরি করেছে। ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো এবং আইনি সীমাবদ্ধতার এক সমন্বিত ফল। বর্তমান পরিসংখ্যান ও ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও এই অপরাধের মাত্রা ও ধরন ক্রমাগত আরও জটিল হচ্ছে।
দেশে ধর্ষণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভয়াবহ ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯৫ সালের ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের তনু বা ২০১৯ সালের নুসরাত হত্যাকাণ্ড অপরাধীদের বেপরোয়া রূপকেই তুলে ধরে। এমনকি ২০২৬ সালে সীতাকুণ্ডে শিশু ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা কিংবা টাঙ্গাইলে অন্তঃসত্ত্বা মাকে ধর্ষণের পর মাটিচাপা দেওয়ার মতো অমানবিক ঘটনাগুলো দেশবাসীকে স্তব্ধ করেছে। বড় কোনো ঘটনার পর সাময়িক প্রতিবাদ হলেও বিচারহীনতার কারণে অচিরেই তা থেমে যায় এবং নতুন কোনো নিষ্ঠুরতা সামনে আসে। বর্তমানে ধর্ষণ পরিস্থিতি এক উদ্বেগজনক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ২৫ শতাংশ বেড়ে ২১,৯৩৯টিতে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে শুধু ধর্ষণের মামলাই ৭,০৬৮টি। প্রতিদিন গড়ে ১২ জনেরও বেশি কোমলমতি শিশু ও নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আইনের দুর্বল প্রয়োগের কারণে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের দলবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য নৃশংসতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা সমাজের চরম নৈতিক অবক্ষয়েরই প্রমাণ।
একটি ধর্ষণ শুধু শরীরেই ক্ষত সৃষ্টি করে না, ভুক্তভোগীর মনন, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎও চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। ভুক্তভোগী নারী পিটিএসডি (পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার), চরম হতাশা ও আতঙ্কে ভোগেন। পরিবার ও সমাজ অনেক সময় তাকে একঘরে করে রাখে, যার সামাজিক গ্লানি সইতে না পেরে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এই আতঙ্কের পরিবেশে অনেক অভিভাবক মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে অল্প বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। কর্মজীবী নারীরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও সার্বিক উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
ধর্ষণ বিস্তারের প্রধান কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা। আইনে কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়, আর এই দীর্ঘ সময়ে ভুক্তভোগীকে চরম সামাজিক হেনস্তা ও আদালতে অবমাননাকর প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। ফলে অর্থ ও ক্ষমতার জোরে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। অন্যদিকে, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় ধর্ষকের বদলে নারীর পোশাক বা চলাফেরাকে দোষারোপ করার নোংরা সংস্কৃতি এই অপরাধকে আরও উসকে দিচ্ছে।
বর্তমানে সাইবার সহিংসতা ও ব্ল্যাকমেইলিং নারী নির্যাতনের আরেকটি ভয়াবহ রূপ। এর নেপথ্যে রয়েছে সামাজিক অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং নারীকে শুধু ভোগ্যবস্তু ভাবার বিকৃত মানসিকতা। সাইবার হয়রানির শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ৯৭ শতাংশই নারী ও শিশু। পরিচিত ব্যক্তিরাই অনেক সময় ব্যক্তিগত ছবি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি নগ্ন ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছে এবং বারবার ধর্ষণ করছে। এর ফলে কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে বিষণ্ণতা এবং আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সুস্থ যৌনশিক্ষার অভাব ও পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিকে এমনভাবে বিকৃত করছে যে, তারা বাস্তব জীবনেও নারীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। মূলত নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার অক্ষমতা, অশিক্ষা এবং এই বিকৃত মনস্তত্ত্বের কারণেই সমাজে আজ শিশু থেকে বৃদ্ধা- কেউই নিরাপদ নন। এসব জঘন্য অপরাধ প্রমাণ করে যে, ভুক্তভোগীর বয়স বা পোশাক নয়, বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে প্রধান সমস্যা। ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হলেও অপরাধবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুধু সাজার কঠোরতা দিয়ে অপরাধ কমানো যায় না, সাজার নিশ্চয়তাও প্রয়োজন। মৃত্যুদণ্ডের কারণে বিচারকদের মধ্যে রায় প্রদানে অতিরিক্ত সতর্কতা দেখা যায়; কারণ অকাট্য প্রমাণের অভাবে তারা মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত রায় দিতে দ্বিধা বোধ করেন। ফলে আসামিদের খালাস পাওয়ার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। আসক-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোও মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচারব্যবস্থার সার্বিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে।
ধর্ষণ রোধে সরকার, এনজিও এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন উদ্যোগ চলমান।
আমানুর রহমান
শিক্ষার্থী, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজ