ঢাকা বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

লোডশেডিং : বিদ্যুৎবৈষম্য যৌক্তিকভাবে কমাতে হবে

লোডশেডিং : বিদ্যুৎবৈষম্য যৌক্তিকভাবে কমাতে হবে

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং মৌলিক অধিকারের সমতুল্য একটি অপরিহার্য সেবা। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনই এখন বিদ্যুৎনির্ভর। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের তীব্রতা জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা এবং বড় শহরগুলোর তুলনায় মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের যে চরম বৈষম্য পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা শুধু অনভিপ্রেতই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় অন্তরায়। এই বিদ্যুৎবৈষম্য নিরসনে এখন একটি যৌক্তিক ও সুষম বণ্টন নীতি প্রণয়ন সময়ের দাবি।

গত এক দশকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণাও এসেছে ঘটা করে। কিন্তু উৎপাদন ক্ষমতা বাড়লেও জ্বালানি সংকটের কারণে সেই ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। কয়লা, গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ ঘাটতির ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। যখন চাহিদার তুলনায় যোগান কম থাকে, তখন লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এই লোডশেডিংয়ের ভার সব এলাকায় সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না- এটাই হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট।

পরিসংখ্যান ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে যেখানে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়, সেখানে জেলা শহর বা গ্রামাঞ্চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। এই বৈষম্য কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। গ্রাম মানেই যে সেখানে বিদ্যুতের চাহিদা কম বা তারা লোডশেডিং সহ্য করতে পারবে- এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কৃষি প্রধান এই দেশে সেচ কাজের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা শহরের এসি ব্যবহারের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে বিদ্যুতের ভূমিকা এখন অনেক বেশি।

বিদ্যুতের এই অসম বণ্টনের ফলে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (ঝগঊ) চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পোল্ট্রি খামার, ডেইরি শিল্প এবং ছোট ছোট কলকারখানাগুলো বিদ্যুতের অভাবে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি সেচ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ছে, যা সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, শহরের কলকারখানাগুলো ব্যাকআপ পাওয়ার বা জেনারেটর ব্যবহার করতে পারলেও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের সেই সক্ষমতা নেই। ফলে এই বৈষম্য ডিজিটাল ডিভাইডের মতো একটি ‘বিদ্যুৎ বিভাজন’ তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও প্রকট করবে। বিদ্যুৎবৈষম্য কমাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর বণ্টন ব্যবস্থা। লোডশেডিং যদি করতেই হয়, তবে তা হতে হবে এলাকাভিত্তিক সমানুপাতিক হারে।

একটি নির্দিষ্ট এলাকাকে দীর্ঘক্ষণ অন্ধকারে রেখে অন্য এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসতে হবে। ডিজিটাল মিটারিং ও স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি ফিডারে বিদ্যুতের সমবণ্টন নিশ্চিত করা সম্ভব। হাসপাতাল, জীবনরক্ষাকারী শিল্প এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বাকি বিদ্যুৎ সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ভিআইপি এলাকার সংস্কৃতি বন্ধ করা প্রয়োজন। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য শক্তির (সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ) ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে অপচয় রোধে কঠোর তদারকি প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিদ্যুৎ খাতের এই বৈষম্য দূর করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও স্বচ্ছ হতে হবে। লোডশেডিংয়ের আগাম সূচি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে তা কার্যকরভাবে পালন করতে হবে এবং গ্রামীণ এলাকাগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বা ট্রান্সফরমারের সমস্যার কারণেও লোডশেডিং হয়, যা গ্রামীণ এলাকায় মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগে। এই কারিগরি ত্রুটিগুলো দ্রুত সমাধানের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

উন্নয়নের মহাসড়কে থাকা বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ হলো প্রধান চালিকাশক্তি। এই শক্তি যদি শুধু নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা যখন স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন বিদ্যুৎ বিতরণে এই আদিম বৈষম্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হয়তো রাতারাতি সম্ভব নয়, কিন্তু বিদ্যমান বিদ্যুতের যৌক্তিক ও সুষম বণ্টন অবশ্যই সম্ভব। শহর ও গ্রামের মধ্যবর্তী এই অন্ধকার দেয়াল ভেঙে ফেলে আলোর সমবণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। তবেই দেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষ উন্নয়নের সুফল সমানভাবে ভোগ করতে পারবে। বিদ্যুৎবৈষম্য দূর করা শুধু একটি কারিগরি সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত