প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১৪ জুলাই, ২০২৬
প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষা লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে নতুন স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেয়। এই পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ, ভবিষ্যৎ পেশাজীবনের ভিত্তি এবং জীবনের পরবর্তী পথচলা। তাই এইচএসসি পরীক্ষাকে শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বলা হয়। কিন্তু এ বছরের পরীক্ষা এমন এক বাস্তবতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ৫১ জন মানুষ। অসংখ্য পরিবারের ঘরবাড়ি, ফসলের খেত, মাছের ঘের ও সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু মানুষ এখনও পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
কোথাও কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরীক্ষা কেন্দ্রের আশপাশও জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকাতেও সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা, যা জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল সোমবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষা। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী নৌকা, ভেলা কিংবা কোমরসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। কেউ ভেজা পোশাকে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছেন, কেউ আবার দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কেন্দ্রে পৌঁছেছেন। এমন দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারক নয়, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটেরও একটি প্রতীক।
একজন পরীক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার নিরাপত্তা, শারীরিক সুস্থতা এবং মানসিক স্থিতি। যে শিক্ষার্থী কয়েক ঘণ্টা ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে, ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছায়, সে কতটা স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারে- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা জরুরি। পরীক্ষার হলে বসার আগে যদি একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় চিন্তা হয় নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে কি না, তাহলে সেই পরীক্ষাকে কতটা ন্যায্য বলা যায়?
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবন তার চেয়েও মূল্যবান। দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের বাস্তবতা বিবেচনা করে পরীক্ষা স্থগিত রাখা, বিকল্প সময় নির্ধারণ করা অথবা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত ছিল বলে অনেকের মত।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন মহল থেকে পরীক্ষা নিয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছিল। অনেক অভিভাবকও সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কারণ একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকলে ভবিষ্যতে বিকল্প সুযোগ পাওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু একটি দুর্ঘটনা বা প্রাণহানি কখনোই পূরণ করা যায় না। তাই দুর্যোগের সময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, পাহাড়ধস কিংবা জলাবদ্ধতা- এসব নতুন কোনো ঘটনা নয়। ফলে জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর জন্য আগাম দুর্যোগ-পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কোন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা স্থগিত হবে, কোথায় বিকল্প কেন্দ্র হবে, কীভাবে দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে পৌঁছানো হবে- এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমে যেত।
একই সঙ্গে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের বাস্তবতা রাজধানী বা শহুরে এলাকার সঙ্গে এক করে দেখাও ঠিক নয়। কোনো এলাকায় যদি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য হয়, যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে কেন্দ্রে যেতে হয়, তাহলে সেই এলাকার জন্য আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়া অযৌক্তিক নয়। সমতা মানে সবাইকে একই নিয়মে বিচার করা নয়; বরং সবার বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে ন্যায্য সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রকৃত সমতা। শিক্ষার্থীরা কোনো রাষ্ট্রের বোঝা নয়; তারা দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। পরীক্ষার সময় যদি একজন শিক্ষার্থী নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, রাষ্ট্রের জন্যও আত্মসমালোচনার বিষয়।
এই ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তির এই যুগে বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে নমনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণই হতে পারে সবচেয়ে মানবিক ও কার্যকর পথ। ১৩ জুলাইয়ে এইচএসসি পরিক্ষার্থীদের করুন অবস্থা দেখে অনেকেই শিক্ষামন্ত্রীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আসলেই কি মিলন সাহেব শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতা রাখেন? এই পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষার্থীদের নৌকায়, ভেলায় কিংবা বুকসমান পানি পেরিয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার দৃশ্য কোনো জাতির জন্য গৌরবের নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্যোগের সময় মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষা কখনোই মানবিকতার বিপরীতে দাঁড়াতে পারে না। তাই ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, মানসিক সুস্থতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। কারণ একটি পরীক্ষা পরে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু হারিয়ে যাওয়া জীবন আর কখনও ফিরে আসে না।
আবদুল কাদের জীবন
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়